ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

বেঁচে থাকলে আজ তিনি পঁচাশি বছরে পা দিতেন।

তখন কেমন দেখাতো তাঁকে?

তিনি কী বুড়ো হয়ে যেতেন? চুলে পাক ধরতো? শরীরে মেদের উপস্থিতি নিয়েও পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে নিরন্তর আওড়াতেন নায়ক কিংবা নায়িকার পিতার সংলাপ?

তারপর স্যুটিং ফ্লোরের ব্যস্ততা সেরে বাড়ি ফিরতেন। ক্লান্তি-শ্রান্তি নিয়ে শরীর এলিয়ে দিতেন শোবার ঘরের ইজি চেয়ারে। চোখ আলতো বুজে আসতো- অমনি স্মৃতির দরজায় দেবেশ ঘোষ কড়া নাড়তেন, বলতেন- এইটুকুতেই ক্লান্ত? আর কী সব ছাইপাশ করিস এখন? ওগুলো তোকে মানায়? টালিগঞ্জের মূর্তিটা একবার দেখে আয় তো। বিমর্ষ বদনে মাথা নিচু করতেই সিগেরেট এগিয়ে দিতেন সলিল দত্ত। গৌতম পিঠ চাপড়ে বলতেন- কই রে, স্ক্রিপ্টটা আবার দেখে নে- প্রোডাকশন ইজ অলমোস্ট রেডি। তারপর আবার ব্যস্ততা, ব্যবস্ততার শেষ, আবার বাড়ি ফেরা, শোবার ঘরের বিষন্ন ইজি চেয়ার- ঘুমের ভেতরে স্যুটিং স্পট, স্পট লাইট নিভে গেলে অজয় দা’র পরিচিত কণ্ঠে ‘প্যাক আপ’।

বেঁচে থাকলে এইগুলোই ঘুরে ফিরে তাঁর জীবনে আসতো। বেঁচে থাকলে.. ..

কথাটা শেষ করতে পারলাম না, জোর দেয়ার জন্যে, দুবার বলতে চেয়েছিলাম- কিন্তু দ্বিতীয়বার এসে আটকে গেলাম। না, তিনি যে মাত্রার খেয়ালি ছিলেন, সে মাত্রার খেয়ালিরা একই কাজের পুনরাবৃত্তি করেন বটে, কিন্তু তাতে বিরক্তি জাগে না মোটেও।

ছেলেবেলায় তাঁর মা তাঁকে নিয়ে বড্ডো বিপদে পড়েছিলেন। আর বড়ো বেলায় তাঁর কারণেই বহু মায়েরা বিপদ থেকে বেঁচে গেছেন।

তখন তিনি সবে পৃথিবীতে এসেছেন, একেবারে নবজাতক। জন্ম নেবার পর সবাই তো থ। গাট্টা-গোট্টা ফর্সা বটে, চোখ দুটোও টানা টানা- কিন্তু মণিজোড়া যে সামান্য ট্যারা। লক্ষ্মীট্যারা। সে-ই নিয়ে তখন কতো কথা। শুধু তখন কেনো? এখনও তো হয়, আজও যে কয়জন লক্ষ্মীট্যারা বাঙালি পুরুষ আছেন, তাদের ভরসা তো তিনিই।

তো আজকের দিনটাতেই তিনি জন্মেছিলেন। সালটা অবশ্য ১৯২৬। পারিবারিকভাবে তাঁর রাশ নাম রাখা হয় হেরম্ব চট্টোপাধ্যায়। জন্ম এবং প্রাথমিক কৈশোর বলতে যা বোঝায়- হেরম্ব চট্টোপাধ্যায় সেটা মামাবাড়িতেই সেরে এসেছিলেন। এরপর এলেন সম্পূর্ণ এক নূতন জায়গায়। উত্তর থেকে দক্ষিণে। ৫১ নং আহিরীটোলা স্ট্রিট থেকে একেবারে ভবানীপুর। সেটা কিন্তু ১৯৪৬ সালের কথা- আমাদের হেরম্ব চট্টোপাধ্যায়ের বয়স তখন পাক্কা কুড়ি।

মহাপুরুষরা পড়াশুনায় ভালো হন না- কারণ পেটের কাছে এঁদের দায় কম। যাঁদের দায়টা প্রাণের কাছে- এরা সাধারণত প্রাণের দাবিটাই মেটায় সবার আগে। আমাদের আলোচ্য হেরম্ব চট্টোপাধ্যায়ও খুব একটা মনোযোগী ছিলেন না পড়াশুনার বিষয়ে।

কোলকাতার সাউথ সাবারবান স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন এবং পরে গোয়েন্কা কলেজে ভর্তি হন। কোলকাতার পোর্টে চাকরি নিয়েই শুরু করেন কর্মজীবন। ফলে গ্র্যাজুয়েশন আর করা হয়নি তাঁর। কোনো রকমে বি.কম পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তাতে সমস্যা কী? কতো কতো গ্র্যাজুয়েটরা পড়ে আছে- নিরন্তর নয়টা পাঁচটা কেরানিগিরি করে যাচ্ছেন, তারপর মৃত্যুর আগে বিছানায় শুয়ে ভাবছেন- লাইফ ইজ নাথিং। হেরম্ব চট্টোপাধ্যায়ের আর যাই হোক এই হীনমন্যতায় ভুগতে হয়নি। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন অন্য এক জগতে। একেবারে ভিন্ন এক মলাটে, উপস্থাপিত হলেন তিনি।

সিগেরেট খাবার অভ্যেসটা একেবারেই ছেলেবেলা খুব সাধনা করে গড়ে তুলেন। সাধনা করে। ঠিক- যে কোনো মহৎ কাজের জন্যে চাই নিরন্তর সাধনা। এটা কিন্তু আমার বক্তব্য নয়। ব্রজের কানাই নাটকে বলরামের ভূমিকায় অভিনয় করার সময় থিয়েটারের পেছনে দাঁড়িয়ে এ কথা তিনিই বলেছিলেন প্রথম। অতোটুকু কিশোরের মুখে এ কথা শুনে ফণী রায় অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কিঞ্চিৎ খুশিও হয়েছিলেন বটে।

ডানপিটে ছেলে আর হলে গিয়ে লুকিয়ে সিনেমা দেখবে না- সে কি হয়? হয় না। হেরম্ব চট্টোপাধ্যায়ও দেখতেন। বিজলী সিনেমায় কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ‘ঠিকাদার’ সিনেমাটি দেখতে যান প্রথম। জ্যোৎস্না গুপ্তা আর দূর্গাদাসের ছবি। সঙ্গে ক্যাপস্টান ম্যাগনাম সিগেরেট।

এরপর ১৯৩৯ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো ইউরোপে। ভারতের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা ব্রিটিশ সরকারের কাছে স্পষ্টভাবে জানতে চাইলেন- কেনো এ যুদ্ধ? তাঁরা বজ্রকণ্ঠে দাবি জানালেন- ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার অধিকার ব্রিটিশকে মেনে নিতেই হবে। ব্রিটিশ সরকার সে-ই দাবি অগ্রাহ্য করলো। এদিকে কংগ্রেসও তাদের প্রতিজ্ঞাতে অটল-অবিচল। সে-ই পাহাড়সম অবিচলতার মৃন্ময়ী ক্যানভাসে তিনি হঠাৎই হয়ে গেলেন এক ক্ল্যাসিক এপিক।

১৯৪১ সাল। ঐতিহাসিক ৭ আগস্ট, বাঙলা ২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮। দিনটি ছিলো রাখীপূর্ণিমা। সেদিন চলে গেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- আমাদের সবচেয়ে বড়ো সৌভ্রাতৃত্বের রাখী ছিলেন যে মানুষটি। সেদিনের সে-ই শোক মিছিলে আমাদের হেরম্ব চট্টোপাধ্যায়ও ছুটে গিয়েছিলেন। সে-ই যে মিছিলে গেলেন, শোক মিছিল থেকে সৃজনের মিছিলে সে-ই তাঁর এক মহাযাত্রার পদক্ষেপ।

‘নারী’ শব্দটির মাঝে যে এক ধরণের অনুপ্রেরণা আছে- সেটা আমাদের হেরম্ব চট্টোপাধ্যায় খুব করে বুঝেছিলেন। তাঁর এক বান্ধবী-ই তাঁকে বলেছিলো, তুমি সিনেমায় নামলে আমি খুশি হবো বেশি।

এই কথার পরই ভারতলক্ষ্মী স্টুডিওর নূতন আঙিনায় পা রাখলেন তিনি। তারপরেই কথা হলো গণেশ দা’র সাথে। তাঁর হাত ধরেই স্যুটিং ফ্লোরে প্রবেশ। এই তাঁর অচেনাকে চেনা, এই তাঁর অজানাকে জানা- এই তাঁর মিহিন তীর্থ দর্শন। এক্সট্রার মর্যাদা সম্পন্ন একজন অভিনেতার পারিশ্রমিক নিয়ে সে-ই তাঁর পথচলা।

তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ছিলো ‘দৃষ্টিদান’। এই ছবির পরিচালক ছিলেন নিতীন বসু। এর আগে তিনি ‘মায়াডোর’ নামে একটি চলচ্চিত্রে কাজ করেছিলেন কিন্তু সেটি মুক্তিলাভ করেনি। ‘বসু পরিবার’ চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম দৃষ্টি আকর্ষন করেন। এরপর সাড়ে চুয়াত্তর মুক্তি পাবার পরে তিনি চলচ্চিত্র জগতে স্থায়ী আসন লাভ করেন। সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতেই তিনি প্রথম নান্দনিক ফ্রেমে ধরা পড়েন। এই ছবির মাধ্যমেই বাঙলা সেলুলয়েডটি হঠাৎ ভ্যান্ গগের ক্যানভাস হয়ে যায়। আকাশের নীল আর শস্যের সোনালী- যে ক্যানভাসের প্রাণ।

আবার একটু পেছনে ফিরে যাই। ১৯৪৬ সালে। ভারত তখন উত্তপ্ত সর্বগ্রাসী দাঙ্গায়। আজকে যাঁর জন্মদিন, সেদিন তিনি গানটি লিখেছিলেন। বাঙলায় নয়, হিন্দিতে। তারপর নিজেই সুরারোপ করে বিভিন্ন জায়গায় গেয়েছেন।

হিন্দুস্তান মে কেয়া হ্যায় তুমারা
ও বৃটিশ বেচারা
আভি চলি যাও ইংল্যাণ্ড বাজা কর ব্যাণ্ড
মন্দির মসজিদ মে পূজা আরতি
মসজিদ মে শুনো আজান পূকার্তি
দিলকে দিলাও মিল হিন্দু মুসলমান
সারি হিন্দুস্তান মে আয়ি তুফান
গরিবো কে দুখো কি হোগি আসান।

চলচ্চিত্র জগতে বহু সফল বাঙলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি হিন্দি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন তিনি। তাঁর অভিনীত হিন্দি চলচ্চিত্রের মধ্যে ছোটিসি মুলাকাত, অমানুষ এবং আনন্দ আশ্রম অন্যতম। তিনি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় দু’টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। প্রথমটি নায়ক এবং দ্বিতীয়টি চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানা চলচ্চিত্রে তিনি শরবিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

পাড়ার অভিনেতা থেকেই তিনি হলেন বাঙলা সেলুলয়েডের কিংবদন্তী। কিন্তু এর মাঝে তিনি কিন্তু অরিন্দমও ছিলেন। এই হেরম্ব চট্টোপাধ্যায় আর অরিন্দম নামগুলো পেরিয়ে কী আশ্চর্য উপমায় কাব্য হয়েছিলেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ যতোবার পড়েছি- মনে মনে আমি অমিত রায়কে খুঁজেছি। তাঁকে আমার অমিত রায়ই মনে হতো। যাঁর জন্য অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছিলেন,

তোমাকে দেখবার জন্যে যখন জনতা উদ্বেল হয়ে ওঠে
গাড়ী ঘোড়া ট্রাম বাস বন্ধ করে দেয়,
পথে অবরোধ সৃষ্টি করে,
ভেবো না, তারা কোন মুহূর্তের
খেলাওয়ালা অভিনেতাকে দেখতে চায়।
তারা পরোক্ষে দেখতে চায় সেই
মৃত্যুহীন মহান প্রণেতাকে
যাঁর করুণায় তোমার সমস্ত কৃতিত্ব
যাঁর করুণায় জ্যোতিতে তোমার
কান্তি-কীর্তি-স্মৃতি-মেধা
তোমার সমস্ত রসানুভূতি, রসচেতনা
তারা দেখতে চায় সেই
মধুমত্তম পুরুষোত্তমকে,
যাঁর দানের তুমি অগাধ ভা-ার,
যাঁর অমৃতের তুমি বার্তাবহ
যাঁর তুমি .. .. ..

শেষবিচারে আসলে তিনি একা ছিলেন না। অমিত রায়ের মতো তাঁরও ছিলো মনোবহ্নির ভালোবাসা আর চোখবহ্নির প্রেম। আজ তাঁর জন্মদিন। শুভেচ্ছা জানাতে হয়তো দেরি হয়ে গেলো, তা হোক। এইটুকু দেরি আমি ইচ্ছে করেই করলাম। কারণ আমি তো জানি তাঁর জীবনের উঠোনে নিত্য দুটি শাড়ির আঁচল ভালোবাসার রোদে শুকায়, নিত্য দু’জোড়া চোখ উপমা উৎপ্রেক্ষায় তাঁর জন্মদিনের শুভেচ্ছা সাজায়। এই পঁয়ত্রিশ মিলিমিটারের ক্যানভাসে পঁয়ত্রিশ হাজার রঙের মাঝে কেবল দুইটি রঙই চির নূতনত্বে, চির ভাস্বরতায় ভরিয়ে রেখেছে জন্মদিনের ছবিটি।

প্রগাঢ় রঙে কেতকী যেখানে গৌরী চট্টোপাধ্যায়, ঠিক সেইখানে লাবণ্য হয়ে জেগে আছেন সুচিত্রা সেন। আবার ফিরে যান অচিন্ত্যকুমারের কবিতার শেষ লাইনে, ডটেড জায়গাগুলোতে বসবে লাবণ্য-কেতকীর প্রাণময় ক্যানভাস।

শুভ জন্মদিন উত্তম কুমার।

১৯ ভাদ্র, ১৪১৮