ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

হরতাল মূলত একটা গুজরাটি শব্দ। যা সর্বাত্মক ধর্মঘটের প্রকাশক। অন্যভাবে বললে এটি একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা। মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন। জন গুরুত্বপূর্ণ কোন ইস্যুতে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক দল বা সংগঠন হরতাল আহবান করতে পারে। এই প্রথাটি শুধুমাত্র এই উপমহাদেশেই প্রচলিত।

গাড়ী ভাংচুর, জান-মালে অগ্নিসংযোগ, অরাজকতা সৃষ্টি এসবের নাম হরতাল নয়। যে কোন দল বা সংগঠন হরতাল আহবান করতে পারে, কিন্তু মানা না মানা জনগণের ব্যাপার। মানুষ মেরে, ভাংচুর করে, আগুন দিয়ে হরতাল মানতে বাধ্য করাটা অন্যায়, অন্যায্য এবং অগণতান্ত্রিক।

বাংলার ইতিহাসে একটি মাত্র হরতালের আহবানই ন্যায্য ও জনগুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৭১ সালে সেই হরতালের আহবান করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ৭ই মার্চের ভাষণে। ঐতিহাসিক সেই ভাষণে হরতাল সম্পর্কিত উক্তিগুলো দেখুন,” — আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারী, আদালত-ফৌজদারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে সেজন্য যে সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলো আছে সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, ঘোড়ারগাড়ি, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে- শুধু… সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোন কিছু চলবে না। — জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু – আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। — আর এই সাত দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছে, প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছে দেবেন। সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে, খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো- কেউ দেবে না। — মনে রাখবেন, রেডিও-টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনে তাহলে কোন বাঙালী রেডিও স্টেশনে যাবে না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। ২ ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মায়না-পত্র নেবার পারে।”
বাংলার জনগণ স্বতস্ফুর্তভাবে সেই হরতাল পালনও করেছিল। সেই হরতালের সমর্থনে এক বাবুর্চি রান্না পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল!

বাংলার ইতিহাসে এরপর শত শত দিন হরতাল হয়েছে। দু-একটি ছাড়া প্রায় প্রতিটি হরতালই ছিল অন্যায্য, অজনগুরুত্বপূর্ণ, দলীয় স্বার্থবাদী এবং সহিংসতাপূর্ণ। প্রতিটি হরতালেই ভাংচুর অগ্নসংযোগ করে জনগণের জান-মালের ক্ষতি সাধন করা হয়েছে। এসব হরতালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ অনেক সাধারণ মানুষও হত্যা করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রতিটি হরতালেই দুই পক্ষ সারাদিন হরতালের পক্ষে ও বিপক্ষে মিছিল মিটিং করে শেষে আহবানকারীরা বলে, ‘দেশের জনগণ হরতাল স্বতস্ফুর্তভাবে পালন করেছে’ আবার; সরকারি দল বলে, ‘দেশের মানুষ হরতাল প্রত্যাখান করেছে’!
আসলে কিন্তু দেশের প্রকৃত জনগণ কেউই হরতাল পালন করেনা এবং মিছিল মিটিং করে প্রত্যাখানও করে না। হরতাল পালন করে আহবানকারী দলের লোকেরা আবার; হাউকাউ করে প্রত্যাখান করে সরকারী দলের লোকেরা। এরা দেশের জনগণ ঠিক, তবে সাধারণ নয়। সাধারণ জনতা কখনো হরতাল পালন তো দূরের কথা, সহিংসতাপূর্ণ যে কোন রাজনৈতিক কর্মসূচিকেই ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করে।

আজ (সোমবার ২৯ডিসেঃ ২০১৪) দেশের বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল হরতাল আহবান করেছে। তাদের দাবী… দেশে গণতন্ত্র নাই, অধিকার নাই, নিরাপত্তা নাই। তারা হরতালের মাধ্যমে গণতন্ত্র, অধিকার এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে চায় অথবা প্রতিষ্টার জন্য সরকারকে বাধ্য করতে চায়! কিন্তু এই কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নমুনা? হরতালের মাধ্যমে মানুষ খুন, সম্পদের ক্ষতি সাধন, যানবাহনে অগ্নসংযোগ করে কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়, নিরাপত্তা বিধান করা যায়?
সরকারী দল বলছে, রাজাকার বাঁচাতেই বিরোধী জোট হরতাল আহবান করে মানুষ খুন ও জান-মালের ক্ষতি সাধন করছে! বিরোধী জোটের হাতে নিজেরা ইস্যু তুলে দিয়ে বলছে, এই অরাজকতা কঠোরভাবে দমন করা হবে!
বিরোধী জোট যখন রাজাকার বাঁচাতে একের পর এক হরতাল আহবান করে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে তখন ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধাপরাধ বিচারে দীর্ঘসূত্রিতার সৃষ্টি করে কেন এই ইস্যুটিকে বছরের পর বছর জিইয়ে রাখা হয়েছে? কেন জেনেও না জানার ভান করে তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দূর্বল না করে রাষ্ট্রের কাজে আরো সম্পৃক্ত করা হচ্ছে? কেন যুদ্ধাপরাধের বিচার চেয়ে একসময় যারা আন্দোলন করেছিল, সরকারের পাশে থেকেছিল তাদেরকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও তাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে?

জানি এসবের কোন উত্তর নেই। আসলে গণতন্ত্র আর রাজাকার দুটোই ট্রাম্পকার্ড। এই ট্রাম্পকার্ড ব্যবহার করে বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়। একপক্ষ গণতন্ত্র রক্ষার নামে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে ক্ষমতায় যেতে চায়; আরেক পক্ষ বিরোধী জোটের দাবীকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে, যুদ্ধাপরাধ ইস্যু জিইয়ে রেখে নিজেদের ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। দুই পক্ষের উদ্দেশ্যই কোন না কোন দিক দিয়ে অসৎ। তারা কেউই আন্তরিকভাবে যুদ্ধাপরাদের বিচার কিংবা মুক্তি কোনটাই চায় না; তারা চায় ক্ষমতা। তাদের কাছে জনসার্থ নয়, ক্ষমতাই মূখ্য বিষয়।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুজনেই সরকারে থাকতে হরতালকে ঘৃণার চোখে দেখেন, কিন্তু বিরোধী দলে গেলে হরতালকেই আন্দোলনের একমাত্র ভাষা হিসেবে বেছে নেন। শত দাবী-দাওয়া সত্ত্বেও তারা দুজনেই সরকারে থাকতে হরতালবিরোধী কোন আইন করতে আগ্রহী নন। উনাদের কাছে ক্ষমতায় থাকতে যা তেঁতো, ক্ষমতা হারালে তা চরম মিষ্টি!

হরতাল নিষিদ্ধ করা যদি একান্ত অসম্ভব হয়, তবে হরতালে সহিংসতা রোধে একটা কঠোর আইন করার দাবী জানাই। আইনে কোন কোন দিন হরতাল আহবান করা যাবেনা, কোন কোন সেক্টর হরতালের আওতামুক্ত থাকবে, সহিংসতার দায় কার উপর বর্তাবে, সহিংসতার শাস্তি কি হবে, জান-মালের ক্ষতি করলে তা কে এবং কিভাবে পুষিয়ে দেবে তা নির্দিষ্ট করে দেয়া হোক।

জনগণ প্রতিবাদ সমর্থন করে, তবে হরতাল কিংবা কোন ধরণের সহিংসতাকে নয়।