ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, শিল্প-সংস্কৃতি

পহেলা বৈশাখ। সারা বছর ফাস্টফুড আর চাইনিজ খেয়ে নিজেদেরকে স্মার্ট হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করলেও এই দিন আমাদের পান্তা ইলিশ খেতে হবে। সারা বছর পান্তার ধারে কাছেও যাই না। কিন্তু এই দিন যদি পান্তা না খাই, তাহলে বোধহয় বুঝি বাঙালি তকমাটাই উবে যাবে!

তাই রান্না করা গরম ভাতে পানি দিয়ে পান্তা ভাত বানাতে হবে। সাথে থাকতে হবে ভাজা ইলিশ। জীবনে বাজার করি নাই। ইলিশ মাছ তো চিনি না। মাছ বিক্রেতা যদি ইলিশ বলে অন্য মাছ দিয়ে দেয়। তাই কোনো ঝুঁকি নেয়া যাবে না। টাই স্যুট পরে, লেক্সাস গাড়িতে চড়ে, সুপারশপে গিয়ে ইলিশ কিনতে হবে। দাম যাই হোক- এটা কোন ব্যাপার না। কাবুলি কার্ড অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডে পরিশোধ করে দিব। তারপরেও ইলিশ খেতে হবে। তা না হলে বাঙালিত্ব আর থাকবে না।

এই হলো এক শ্রেণির মানুষের পহেলা বৈশাখ। পান্তা ইলিশের সাথে পহেলা বৈশাখের যে কোন সম্পর্ক নাই- এ কথা তাদেরকে বুঝানোর উপায় নেই। নতুন পয়সা হলে যা হয়, এখানেও তাই হয়েছে। তাদেরকে নিয়ে আমাদের কোন মাথাব্যাথা নেই। কেননা তারা ইংরেজি বুলি আওড়ানো একদিনের বাঙালি। সমস্যা হচ্ছে আমাদের মতো হুজুগে বাঙালিদের নিয়ে। যারা না বুঝে, না শুনে তাদেরকে অনুকরণ করি। নিজের বুদ্ধিটাকে একটু খাটানোর চেষ্টা করি না।

ইলিশ অবশ্যই আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। তবে পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশ বাঙালি সংস্কৃতি নয়। গ্রামবাংলার পহেলা বৈশাখে কোথাও পান্তা ইলিশের প্রচলন ছিল না। বাঙালির বর্ষবরণের দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে পান্তা ইলিশের কোন সম্পর্ক নেই। এটি হচ্ছে হাল আমলে চালু হওয়া উদ্ভট শহুরে ফ্যাশন। আত্মঘাতি তো বটেই। যতদূর জানা যায়, ষাটের দশকে ছায়ানট আনুষ্ঠানিকভাবে রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করেন। পহেলা বৈশাখ যে এত দ্রুত বাঙালির প্রধান উৎসব হয়ে উঠবে, এই বিষয়টি তখন কেউ বুঝতে পারেনি।

ছায়ানটের ঐ উৎসবে পান্তা ইলিশের কোন রেওয়াজ ছিল না। খাবার তালিকায় ছিল মুড়ি, মুড়কি ও মিষ্টি জাতীয় খাদ্য। ১৯৮৩ সালে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে প্রথম পান্তা ইলিশের সংযোজন ঘটে। এবং প্রথমবারের মতো রমনা এলাকায় বানিজ্যিক ভাবে পান্তা ভাতের দোকান দেয়া হয়। নতুনত্ব আর নাগরিক আভিজাত্য আনতে তার সাথে সংযোজন ঘটে ভাজা ইলিশ। প্রতিবছর জনসমাবেশ বাড়তে থাকায় এই ব্যবসা লাভের মুখ দেখল। এক দশকের মধ্যে পান্তা ইলিশের দোকানের  সংখ্যা ব্যাঙের ছাতার মতো বাড়তে লাগল। পত্রপত্রিকায় ফলাও করে এই বিষয়টি প্রচার পেল। এরপর থেকে হুজুগে বাঙালি পান্তা-ইলিশকেই সংস্কৃতি বানিয়ে ফেলল। এখন সবাই মনে করে- পহেলা বৈশাখ মানে পান্তা ইলিশ।

এই হুজুগকে মুনাখোর ব্যবসায়ীরা চমৎকারভাবে কাজে লাগিয়েছে। শুরু হলো পান্তা ইলিশের জমজমাট ব্যবসা। নগরের নামিদামি রেস্টুরেন্ট যেখানে সারা বছর ফাস্টফুড আর চাইনিজ খাওয়ানো হয়, সেখানেও পান্তা ইলিশের পরিবেশন শুরু হলো।

অথচ পান্তা ইলিশের এই বাজে সংস্কৃতি যে কতটা ভয়ংকর ও আত্মঘাতী, তা আমরা একবারও ভেবে দেখলাম না। বিশেষজ্ঞদের অভিমত- সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাস ইলিশের প্রজনন মৌসুম। এই সময়ে মা ইলিশ কমপক্ষে ১০ লাখ ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে যে ইলিশ উৎপাদন হয়, মার্চ-এপ্রিল মাসে তা জাটকা অবস্থায় থাকে। পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশ উৎসবের নামে যখন নির্বিচারে জাটকা নিধন করা হয়, সারা বছরের ইলিশ উৎপাদনে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। অর্থনৈতিক ক্ষতি তো আছেই।

এমনিতেই নদ-নদীর নাব্যতা দিন দিন কমে যাচ্ছে, দখল-দূষণ তো আছেই। যার ফলে নদীতে ইলিশের উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। এই মৌসুমে নির্বিচারে জাটকা নিধন করা হলে, সাগরেও ইলিশের সংখ্যা কমে যাবে। এই সময়ে একটি জাটকা ধরা মানে একটি পরিপূর্ণ ইলিশের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করা অথবা ১০ লাখ ভবিষ্যত ইলিশের সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করা। এছাড়াও ইলিশ হচ্ছে অভিপ্রায়ণকারী মাছ। এই মাছ একবার অভয়ারণ্য বা প্রজনন ক্ষেত্র পরিবর্তন করলে সেখানে পুনরায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বাংলাদেশের জলসীমা থেকে এই মাছ যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে আমাদের কী অবস্থা হবে- তা সহজেই অনুমেয়।

আরেকটি দিক হচ্ছে উৎসবের সার্বজনীনতা। পহেলা বৈশাখ এখন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। উৎসব এমন হওয়া উচিত যাতে ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সব মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারে। যেহেতু ইলিশের দাম ও চাহিদা দুটোই বেশি, তাই পান্তা ইলিশ উৎসবে নিম্ন আয়ের মানুষের অংশগ্রহণ কষ্টকর। এক শ্রেণির মানুষের কাছে পান্তা ইলিশ হচ্ছে অর্থ-বিত্ত প্রকাশের উপলক্ষ্য, অন্য শ্রেণির কাছে সেটা মনঃকষ্টের কারণ।

যে উৎসবে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে না, সে উৎসব কখনও অর্থবহ হয় না। তাই ইলিশ মাছ বাদ দিয়ে এমন কিছু সংযোজন করা উচিত, যাতে সব শ্রেণির মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারে। তেলাপিয়া মাছ যেহেতু সব মানুষের সাধ্যের নাগালে, এই মাছকেও পহেলা বৈশাখের অনুষঙ্গ করা যেতে পারে। নাম হতে পারে- “পান্তাপিয়া”। যাই হোক, এটি একটি প্রস্তাবনা মাত্র।

সবশেষে একটি কথাই বলতে চাই- আমরা বছরের একদিন ইলিশ খেতে চাই না, (কিছু নির্দিষ্ট সময় ব্যতিত) সারা বছর ইলিশ খেতে চাই। তাই দেশপ্রেমিক সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, বৈশাখের খাবার তালিকা থেকে ইলিশ বাদ দেয়া। আর বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তোলা উচিত- “পান্তা ইলিশের নামে জাটকা নিধন নয়”।