ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

শিরোনামে কাশ্মীর ফিলিস্তিন নাম থাকলেও আমার লেখাটি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে। শিরোনাম নিয়ে হয়ত অনেকের আপত্তি থাকতে পারে কিন্তু এটাই বাস্তবতা। পড়া শেষে হয়ত আপনিও একমত হতে পারবেন।

আমি চট্টগ্রামের ছেলে, জন্ম থেকে রোহিঙ্গা শব্দটির সাথে পরিচিত। আমার পূর্বপুরুষ আরকানের সাথে ব্যবসা করেছে দীর্ঘদিন। চট্টগ্রাম ও আরকানের সাথে বেশ সমৃদ্ধ ব্যবসায়িক, সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল। চট্টগ্রামের হাজার মানুষ আরকানে ব্যবসা করতে যেতেন। তার অন্যতম কারণ ছিল ভাষাগত মিল ও আরকানের কাপড় ও স্বর্ণের খ্যাতি আর আরকানের সাথে চট্টগ্রামের সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা।

নিকট অতীতেও (১৯৬০-১৯৭০) অনেক বাংলাদেশী ব্যবসায়ী আরকানের মেয়ে বিয়ে করে আরকানে সেটেল হয়েছেন। প্রচলিত আছে আরকানের মেয়েরা খুব ই রূপবতী ছিল। চট্টগ্রাম থেকে যারা ব্যবসা করত তারা সেই নারীদের প্রেমের পড়ার প্রচলিত কাহিনী চট্টগ্রামে গান ও সাহিত্যে স্থান পেয়েছে।

চট্টগ্রামের তুমুল জনপ্রিয় শিল্পী ‘শেফালী ঘোষ’ এর বহুগান ও চট্টগ্রাম ভাষায় রচিত অনেক সাহিত্যে এই ব্যবসায়িক যোগাযোগ, প্রেম, দেশান্তরের কাহিনী উল্লেখ আছে। শেফালী ঘোষের গানের একটি লাইন এরকম.. .. ..“ও বানু,বানুরে অ্যাইঁ যাইয়ুম রেঙুন শহর তোয়ারলাই আইন্নম কি!! শাড়ী-চুড়ির আশা গরি রেঙুন যাইত দি যদি সোনার যৌবন হদি রাইক্কম গামছা দি বাধিঁ !! চাই ও ও তোয়ারে বার্মার মাইয়া ফাদঁত ফেলাইব” .. .. .. ..। (গানটিতে আরকানে ব্যবসা করতে যাওয়া স্বামী স্ত্রীর জন্য কি লাগবে জিজ্ঞেস করলে স্ত্রী শাড়ী-চুড়ির চাহিদা নেই বলে স্বামীর রোহিঙ্গা নারীর প্রেমে পড়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে)।

কিন্তু একসময়ের, কাপড় ও কাঠের ব্যবসার জন্য বিখ্যাত আরকানের আদি বাসিন্দারা আজ সহায়-সম্বল হারিয়ে আহত নিহত নিপীড়িত হয়ে আশ্রয়ের খোঁজে নাফ নদীর তীরে কাঁদছে।

আরকানে রোহিঙ্গাদের বসবাসের ইতিহাসঃ

বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাংশের সাথে ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে আরাকানের সঙ্গে বাংলার রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ক্ষমতার রদবদল বা উঠানামার সাথে দু দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। সুদীর্ঘকাল ধরে আরকান ছিল  স্বাধীন অঞ্চল। ১৪৩০ সাল থেকে প্রায় ২০০ বছর আরকান অঞ্চল মুসলিমরা শাসন করে। ১৬৩১-১৬৩৫ সালের দুর্ভিক্ষে মুসলমান শাসনের পতন ঘটে।

বেশ অনেকদিন মুসলিম শাসনাধীন থাকায় মুসলমান সংস্কৃতি আরাকানের জনগণের জীবন এবং আরাকানের ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মুসলিম শাসনের পতনের পরও অনেক বাঙালি মুসলমান কবি আরাকান রাজসভায় অংশগ্রহণ করেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায, কবি আশরাফ খান বৌদ্ধ রাজা থাদোমেন্তরের (১৬৪৫-১৬৬৬) সময় যুদ্ধমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। আশরাফ খান ‘উজির লস্কর’ নামে সুপরিচিত ছিলেন। পাঠান সুলতানের মতো আরাকানের রাজারা বাংলা সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক মেধাবী কবিকে আরাকান রাজসভায জায়গা করে দেন। এদের মধ্যে মহাকবি আলাওল, দৌলত কাজী, মাগন ঠাকুর অন্যতম। ১৬৬৬ সালের আগ পর্যন্ত আরাকান বাংলার চট্টগ্রামের অংশ ছিল। ১৬৬৬ সালে মুগলদের দ্বারা বিতাড়িত না হওয়া পর্যন্ত প্রায় দুইশত কাল ধরে আরাকানিরাই এখানে রাজত্ব করে।

১৬৬৬ সালে চট্টগ্রামের পতনের পর আরাকান রাজ্য সংকুচিত হয়ে একটি ছোট্ট অঞ্চলে পরিণত হয়ে এবং রাজনৈতিকভাবে বেশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ১৭৩১ থেকে ১৭৮৪ সালের মধ্যে আরাকান রাজ্যকে ১৩ জন রাজা শাসন করেন এবং এ রাজাদের গড় শাসনকাল দু বছরের বেশি ছিল না। ১৭৮৫’তে বর্মি রাজা বোডপোয়া যুদ্ধে আরাকান দখল করে নেয়। এর আগ পর্যন্ত আরকান ছিল স্বাধীন দেশ।

১৮২৬ সালে প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের পরে আরাকান প্রদেশকে ব্রিটিশরা ভারতের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়। তখন ব্রিটিশদের উৎসাহে বাংলার বহু মানুষ সেখানে গিয়ে খামার-শ্রমিক হিসাবে কাজ শুরু করে। কৃষিকাজে দক্ষতা আর কর্মকুশলতার ফলে আরাকান প্রদেশে বাঙালি রোহিঙ্গাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছিল। কোনও নির্দিষ্ট সীমানা না থাকায় আদি আরকানীদের সাথে ভাষাগত মিল থাকায় চিটাগঙ্গের বাঙালি হাজারে হাজারে আরাকানে চলে যায়। ধান চাষে সস্তায় মজুর পাওয়ার তাগিদে আরাকান-সহ বর্মার আদি বাসিন্দারাও বাঙালিদের উৎসাহিত করত। অন্যদিকে তখন বহু রাখাইন আরকান থেকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বসতি গড়েন।

১৯৩৫ সালে আরকানকে দেয়া হয় স্বতন্ত্র রাজ্যের মর্যাদা। কিন্তু ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে বার্মা দখল করে নেয় জাপান। তখন বৃটিশদের সাথে হাত মিলায় রোহিঙ্গারা। বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের স্বাধীন ভূমি দেয়ার একটি গোপন চুক্তি হয় বৃটিশদের সাথে, কিন্তু কথা রাখেনি বৃটিশরা। উল্টো বার্মা ও জাপানীর হাতে গণহত্যার শিকার হন রোহিঙ্গারা, তখন প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা চট্টগ্রামে আশ্রয় নেয়। নানা চরাই উৎরাই পেরিয়ে জল ঘোলা করে ১৯৪৭ সালে বার্মার অস্থায়ী সরকার গঠনে জেনারেল অং সান কে সমর্থন দেয় রোহিঙ্গারা। এমন কি অং সানের সরকারে ছিল রোহিঙা প্রতিনিধি। অং সানের পরে সরকার প্রধান হয় উ নু। তিনিও রোহিঙ্গাদের তার দেশের নাগরিক বলে স্বীকৃতি দেন।

১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন সামরিক জান্তা। শুরু হয়ে যায় রোহিঙ্গাদের জীবনের করুণ মহাকাব্য। হাজার বছরের আরকানের নাম হয়ে যায় রাখাইন।

রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত হওয়ার ইতিহাসঃ

১৭৮৫ সালে বাডপোয়া রাজার আরকান দখলের সহিংসতার পর বেশ কিছুদিন শান্ত ছিল আরকান। এর পরে প্রথম সহিংসতা শুরু হয় ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। জাপানের পক্ষে না আসায় বার্মিজরা রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার শুরু করে।  ১৯৪২ সালের সহিংসতায় অনেক মুসলমানকে হত্যা ও উচ্ছেদ করা হয়। তৎকালীন বৃটিশ সরকার বর্তমান গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ থানার সুবিরাননগরে ও কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূলে শরণার্থী ক্যাম্প করে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে। ১৯৪৮ সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধে বার্মিজদের নির্যাতনের মুখে পড়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।

সামরিক জান্তা সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ১৯৭৬ সালে বার্মা সরকার কিং ড্রাগন অপারেশন ইন আরকান নামে এক অপারেশনের মাধ্যমে প্রথম সশস্ত্রভাবে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ণ শুরু করে বার্মিজ সেনাবাহিনী।। তখন প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্তের এপারে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ১৯৭৬-১৯৭৮ সালে যারা এসেছিল তাদেরকে ওআইসি ও মধ্যপ্রাচ্যের মাধ্যমে চাপ দিয়ে ফেরত নিতে বাধ্য করে বাংলাদেশ সরকার। যদিও বা শেষ পর্যন্ত থেকে যায় প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা।

১৯৮২ সালে বার্মা নাম পরিবর্তন করে হয় মায়ানমার, আরকান হয় রাখাইন রাজ্য, সংশোধন করা হয় নাগরিকত্ব আইন। আর সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার  হয়। কেড়ে নেয়া হয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার মত নাগরিক অধিকার। শুরু হয় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত অভিযান। নতুন নাম নেয়া মায়ানমার সেনা সরকার ও স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইনরা রোহিঙ্গাদের আবার উচ্ছেদ করতে শুরু করেন।

২য় দফায় রোহিঙ্গারা ১৯৮০-৮২ এবং তৃতীয় দফায় ১৯৯০-১৯৯২ সালে ব্যাপক হারে (প্রায় ২ লক্ষাধিক) রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে, পাকিস্তানে ভারতের কাশ্মীরে আশ্রয় নেয়। এদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ হয়ে পাড়ি জমায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে। ২০০১ সালে পেঙ্গু প্রদেশে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গায় প্রাণ হারায় আরও শত শত রোহিঙ্গা, জ্বালিয়ে দেয়া হয় রোহিঙ্গা বাড়ি ও উপসানলয়।

এরপর বেশ কিছুদিন মোটামুটি শান্ত ছিল রাখাইন (আরকান) প্রদেশ। কিন্তু ২০১২ সালের জুন মাসে এক এক রাখাইন তরুণীকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে ১০ জন রোহিঙ্গা মুসলিমকে পিটিয়ে হত্যা করে রাখাইন বৌদ্ধরা। এই ঘটনায় পুরা রাজ্যে জাতিগত সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনা সরকার ১০ জুন রাজ্য জুড়ে জরুরী অবস্থা জারি করে এবং রাজ্যের শাসন সরাসরি সেনাবিাহিনী গ্রহণ করে। অক্টোবর জুড়ে চলা এই দাঙ্গায় সরকারী হিসেবে ৮৮ জন নিহত হয়। প্রায় লক্ষাধিক লোক বাস্তুচ্যুত হয় এবং ২৫০০ বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয় যার অধিকাংশই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর। বাস্তুচ্যুত লোকজন পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে এবং নৌপথে মালেশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাড়ি জমায়। ২০১২ সালের এই সহিংসতায় রাখাইন প্রদেশে বসবাসরত মুসলিম অন্য জাতিগোষ্ঠীও (কামান জাতিগোষ্ঠী) ক্ষতিগস্ত হয়। যদিওবা কামান মুসলিমরা শারীরিক গঠনের দিক দিয়ে রোহিঙ্গাদের চেয়ে ভিন্ন এবং তারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন না।

এরপরে ২০১৩ সালে কামান মুসলিম পার্টির প্রধান কিয়াও জান লা তার বাড়ির সামনে এক রাখাইন বৌদ্ধকে মোটর সাইকেল রাখতে নিষেধ করাকে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠে রাখাইন রাজ্য। মূলত ২০১২ সালের দাঙ্গার পর রাখাইন-রোহিঙ্গার দীর্ঘসময়ের এই সংঘাত বৌদ্ধ-মুসলিম সংঘাতে রূপ নেয়।

ধীরে ধীরে রোহিঙ্গারাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় বেশ কিছু অমানবিক সরকারী সিদ্ধান্ত। তারা সরকারের অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবে না, তাদেরকে উচ্চ শিক্ষা ও সরকারী চাকরিতে নেয়া হয় না। রোহিঙ্গা পুরুষকে সপ্তাহে একদিন সামরিক বাহিনী বা সরকারী কাজে শ্রম দিতে বাধ্য করা হয়। তাছাড়া দম্পত্তিদের দুইয়ের অধিক সন্তান না দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। সর্বশেষ ২০১৫ সালে তাদের সমস্ত ভোটাধিকার বাতিল করা হয়।

২০১৫ সালের দেশের ভোটার হিসেবে অস্বীকার করায় আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠে রাখাইন (আরকান) প্রদেশ। সেনাবহিনীর দমন পীড়নে দেশ পালাতে থাকে রোহিঙ্গারা। ২০১৫ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তোলা স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায় গ্রামের গ্রাম রোহিঙ্গা বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তবে রাখাইন প্রদেশে আদতে কি হচ্ছে তা যাচাই করা মুশকিল। কারণ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কর্মী ও মানবধিকার কর্মীদের প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ ছিল সংঘাতপূর্ণ এই অঞ্চলে।

২০১৬ সালে সীমান্তবর্তী তিনটি চেকপোস্টে রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সে বছরের ৯ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সামরিক বাহিনীর অভিযানের মুখে বাংলাদেশ অভিমুখে শরণার্থীদের ঢল নামে। সেই ঢল ঠোকতে সীমান্তে নজরদারী বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজায় বাংলাদেশ সরকার। বিজিবির পাশাপাশি সীমান্তে পুলিশ ও কোস্টগার্ড নিয়োগ করা হয়। তবু রাতের বেলা রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকানো যায়নি।

নাফনদীতে ভীড় করা শরণার্থী নৌকাগুলোকে মানবিক ও চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে মায়ানমারে পুশব্যাক করে বিজিবি। বাধ্য হয়ে নাফ নদীতে ভাসতে থাকা নৌকাগুলো মালেশিয়া ও থাইল্যান্ড উপকূলে ভীড়ে। যাদের অনেকের দালালের খপ্পরে পড়ে মৃত্যু হয়। সেই বছরই থাইল্যান্ডে রোহিঙ্গাদের গণকবরের সন্ধান মেলে। বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ২৩ নভেম্বর বিজিবি-বিজিপি পতাকা বৈঠক হয়। বৈঠকে সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকানো, ইয়াবা সহ মাদক দ্রব্য পাচার বন্ধে সমঝোতা হয়। ২৪ নভেম্বর মায়ানমার রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বাংলাদেশ রাখােইন প্রদেশের চলমান সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে।

রয়টার্সের মতে, ২০১৬ সালের সহিংসতায় ৬৯ জন রোহিঙ্গা ও ১৭ জন নিরাপত্তা বাহিনী মিলিয়ে ৮৬ জন নিহত হয়। আর বাস্তুচ্যূত হয় প্রায় ৩০ হাজার লোক।

মায়ানমার সরকার কেন রোহিঙ্গাদের নিজ দেশের বলে মানতে চায় না:

মায়ানমারের ইসলাম ধর্মাবলম্বী আরও জনগোষ্ঠী থাকলেও শুধুমাত্র রোহিঙ্গাদেরই সরকার নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে মানেন না। মায়ানমারের লোকজন রোহিঙ্গাদের বাঙালি ও বিদেশী বলেই মনে করে। তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মায়ানমারের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রোহিঙ্গা ও বার্মা দুই দিকে যাওয়ার প্রেক্ষিতে পাকিস্তান আন্দোলনের সময় রোহিঙ্গারা নিজেদের পূর্ব-পাকিস্তানভুক্তির জন্য দাবি জানায়। রোহিঙ্গা নেতারা মোহম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে দেখা করে আরকানকে পূর্ব-পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত করার অনুরোধ করেন। কিন্তু জিন্নাহ সাহেব তাদের মায়ানমারের সাথে থাকার পরামর্শ দেন। ফলে কিছু রোহিঙ্গা বিদ্রোহী হয়ে উঠল এবং স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেন।

১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে বার্মার স্বাধীনতার পরেও তাদের সে প্রয়াস অব্যাহত ছিল, এই কারণে বার্মার মিলিটারি তাদের দমন করার জন্য সক্রিয় হয়ে উঠে। স্বাধীনতা লাভের পরপর ১৯৪৮ সালে বার্মায় আরাকানি বৌদ্ধ এবং মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা তৃতীয় দফায় কক্সবাজার এ শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র্য অবস্থান ও পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্তির চেষ্টার কারণে বার্মিজ সরকার ও  রোহিঙ্গাদের মধ্যে একটি আস্থার ঘাটতি তৈরী হয়ে রয়েছে যুগ যুগ ধরে।

আরকান (রাখাইন) প্রদেশের ইতিবৃত্ত ও রাখাইন বৌদ্ধদের দৃষ্টিতে রোহিঙ্গা

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তবর্তী অঞ্চল আরকান (রাখাইন)। এর উত্তরে চীন ও ভারত, দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর ও উত্তর-পশ্চিমে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম। আর পূর্ব পাশে মায়ানমারের সুদীর্ঘ, দূর্গম ও সুউচ্চ ইয়োমা পর্বতমালা। যে পর্বতমালা আরকানকে যুগের পর যুগ বার্মার কাছে থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।

আরকানের পরিবহন ও যোগাযোগের জন্য নদীপথই ভরসা। কোন ধরনের রেলপথ তো নেই, সড়ক পথে চলাচলের উপযোগী রাস্তা আছে মাত্র ২ টি। মূল মায়ানমারের সাথে যোগাযোগ একটি রাস্তা যেটি দুর্গম এবং বছরের বেশিরভাগ সময় চলাচলের অনুপযোগী থাকে। এই রাস্তার নড়বড়ে সেতুর কোন একটি ভেঙ্গে পড়লে মূল বার্মার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে আরকানের। আরকানের প্রায় ৭০ শতাংশ অঞ্চল ই বনাঞ্চলে ঘেরা। এই বনাঞ্চলের কাঠ ও মধু খুবই প্রসিদ্ধ। আরকানের ভুমি খুবই উর্বর। এর প্রধান আমদানি পণ্য চাল।

আরকানের আয়তন অনেকবার পরিবর্তন হয়েছে। বৃটিশ শাসিত আরকানের আয়তন ছিল প্রায় ৩২ হাজার বর্গকিলোমিটার। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে  স্বাধীনতাত্তোর আরকানের আয়তন হয় ২২,৭০০ বর্গকিলোমিটার। মূলত আরকানের উত্তরাঞ্চেলে রোহিঙ্গাদের বাস। রাখাইনে (আরকান) বর্তমান জনসংখ্যা সরকারি হিসেবে প্রায় ৩০ লক্ষ। তবে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা ও রোহিঙ্গা মুসলিম নেতাদের ভাষ্য মতে, আরকানের জনসংখ্যা ৫০ লক্ষ, যার মধ্যে ৩০ লাখ বৌদ্ধ, ১৪ লাখ রোহিঙ্গা (সাম্প্রতিক নিপীড়নে সে সংখ্যা এখন ৫/৬ লক্ষে নেমে এসছে), সর্বপ্রাণবাদী ২ লক্ষ ও হিন্দু ২ লক্ষ। সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, তাই তাদের কোন সরকারি পরিসংখ্যানও নেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর পাকিস্তান আন্দোলনের মত পার্থক্য ছাড়া আরও কিছু মনস্তাত্বিক দ্বন্দও রয়েছে রোহিঙ্গা মুসলিম আর রাখাইন বৌদ্ধদের মধ্যে। রাখাইন বৌদ্ধরা রোহিঙ্গাদের বেশি সন্তান নেয়াটাকে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। অনেক রাখাইন যুবক বিয়ে না করে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করে অন্যদিকে রোহিঙ্গারা একধিক বিয়ে ও অধিক সন্তান গ্রহণ করে। তাছাড়া রোহিঙ্গা মুসলিমদের তাবলীগ জামাতের দাওয়াতে অনেক রাখাইন বৌদ্ধ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে। এসব কারণে বৌদ্ধ নেতারা মনে করে এভাবে চলতে দিলে আরকান খুব শীঘ্রই ইন্দোনেশিয়া হয়ে যাবে।

সরকার রোহিঙ্গাদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। নিজেদের উদ্যোগে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ ছাড়া তাদের আর কোন শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ নেই। রাখাইনরা রোহিঙ্গাদের ‘আনসিবিলাইজড’ বলে অবহিত করে। তাদের সাথে একত্রে বাস করার কারণে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ও ‘আনসিবিলাইজড’ হয়ে যাবে বলে আশংকা প্রকাশ। আল-জাজিরা, বিবিসি সহ বেশ কিছু গণমাধ্যমে বৌদ্ধ নেতারা রোহিঙ্গা নিপীড়নের এই যুক্তিই তুলে ধরে।

কোন দেশে কত রোহিঙ্গা

মূলত ১৯৭০ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের উপর মোটা দাগে নির্যাতন শুরু করে বার্মিজ সামরিক জান্তা। গত চার দশকে প্রায় ১৭ লাখ রোহিঙ্গা নিজ ভূমি থেকে বিভিন্ন দেশে বিতাড়িত হয়েছেন। জাতিসংঘ মতে রোহিঙ্গা রা বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত, নিপীড়িত ও ভাগ্যহত ও বন্ধুহীন জাতিগোষ্ঠী।

২০১৫-২০১৬ সালের সহিংসতায় বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ের মতে, এই বছরের ২৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া জাতিগত নির্মূল অভিযানের আগে বাংলাদেশে অনুমোদিত ও অনুমোদিত মিলিয়ে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। তবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবনে স্থানীয়দের সাথে মিশে রয়েছে প্রায় আরও ২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) মতে, সাম্প্রতিক সহিংসতায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। আশঙ্কা করা হচ্ছে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে ও বেশি। কারণ রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের উপর কার্যত কারো নজরদারি নাই। সব মিলিয়ে ধারণা করা হচ্ছে বাংলদেশে বর্তমানে প্রায় ১০-১২ লক্ষ রোহিঙ্গা রয়েছে। ২০১৬ সালের হিসাবে আরকানে ছিল ১১-১৩ লক্ষ রোহিঙ্গা বাস করতেন। বর্তমানে সে সংখ্যা ৫-৬ লক্ষ।

আল-জাজিরার হিসাবে পাকিস্তানে ৩ লাখ ৫০ হাজার, সৌদি আরবে ২ লাখ, ভারতে ৪০ হাজার ও সংযুক্ত আরব-আমিরাতে ১০ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। তাছাড়া সৌদি আরবে অবৈধ হিসেবে রয়েছে আরও ১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

২০১২ সালের পর থেকে রোহিঙ্গারা রাখাইন উপকূল ও আন্দামান দীপপুঞ্জ হয়ে পাড়ি জমায় মালেশিয়ায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রায় মালেশিয়ায় আশ্রয় নেয় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী। এছাড়া থাইল্যান্ডে আর ৫ হাজার ও ইন্দোনেশিয়ায় ১ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী মর্যাদায় রয়েছে। সে হিসেবে মোট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ১৫-১৬% বর্তমানে রাখাইনে রয়েছে। সে হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশ ও রাখাইনে প্রায় ১৫-১৭ লাখ রোহিঙ্গা ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আর ১০ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছে, যে সংখ্যা কুয়েতের জনসংখ্যার প্রায় সমান। বিশ্বের ৮৯ টি   স্বাধীন দেশের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি।

সাম্প্রতিক সংকটের সূচনা:

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর বহুদিন ধরে চলমান সংঘর্ষ-সহিংসতা সঙ্কট সমাধানে ২০১৬ সালের আগস্টে গঠিত হয় অ্যাডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেট। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে ওই কমিশন এক বছরের তদন্তের পর চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিয়ানমারের  ক্ষমতাসীন দলের প্রধান অং সান সু চির কাছে জমা দেয় চলতি বছরের ২৪ আগস্ট।

৬৩ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন জমা দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই ২৪ আগস্ট দিবাগত রাতে ত্রিশটি পুলিশ ও সেনাচৌকিতে রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় নিহত হয় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য। তারপরই হামলার জন্য রোহিঙ্গা ‘জঙ্গি’দের দায়ী করে জবাব হিসেবে সেনাবাহিনী পুরো অঞ্চলে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।

দ্য আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) নামের একটি সংগঠন ২৪ তারিখের হামলার দায় স্বীকার করেছে এবং আরও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে এক টুইটার বার্তায় বলা হয়েছে, ‘আমরা বার্মিজ বাহিনীর বিরুদ্ধে এই এলাকার ২৫টির বেশি স্থানে আমাদের প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম গ্রহণ শুরু করেছি, সামনে আরও হবে।’ সংগঠনটি আগে হারাকাহ আল-ইয়াকিন নামে পরিচিত ছিল।

Mayanmar-Rohingya

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মায়ের পাশে তার সন্তান। ছবি: বাংলাদেশ পোস্ট

নাফ নদীর তীরে হেরে যাচ্ছে মানবতা

আরসার হামলার পেক্ষিতে ২৪ আগস্ট থেকে জঙ্গি দমনের নামে মায়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের জাতিগত উৎখাতে নামে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়, ধরে নিয়ে যাওয়া হয় যুবকদের, হত্হযা করা হয় নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধা নির্বিশেষে। ফলে বাংলাদেশ অভিমুখে আবার ঢল নামে রোহিঙ্গা শরণার্থীর। সহিংসতার মুখে এই পাাড়ে আশ্রয় প্রার্থীদের শুরুতে পুশব্যাক করার চেষ্টা করে বাংলাদেশ সরকার। মায়ানমান সরকারকে অনুপ্রবেশ ঠেকানো ও মাদক চোরাচলান রোধে যৌথ অভিযানের প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ।

মায়ানমার সেনাবহিনী সে প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে বরং রোহিঙ্গাদের হত্যা, লুটপাট ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে স্থানীয় বৌদ্ধ যুবকদের উদ্বুদ্ধ করে। শুরু হয় সামরিক বেসামরিক নিধনযজ্ঞ। মাইকিং করে রোহিঙ্গাদের বসতভিড়া ছেড়ে যেতে বলা হয়। বাবার সামনে মেয়েকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হয়। শিশু সন্তানদের সামনে কেটে ফেলা হচ্ছে বাবা-মাকে। বাবা-মা’র সামনে শিশুকে শুন্যে ছুটছে সেনারা। বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হাত কেটে ফেলছে কারো, সেনাবাহিনীর গুলিতে পা উড়ে গেছে কোন শিশুর। পাহাড় বেয়ে এপারেও আসতে থাকতে গুলি ও বিস্ফোরকের শব্দ। আগুনের ধোয়া এসে মিশতে থাকে মৌসুমী বাতাসে।

ধর্ষিত, গুলিবিদ্ধ, আতংকিত সে মানুষগুলো উপায় না পেয়ে ছুটে আসে প্রাণ ভয়ে, ভাসতে থাকে নাফ নদীর তীরে। মানবতার এই অসহায়ত্ব দেখে এক সময় বাংলাদেশ সরকারের মানচিত্রের জাতীয়তাবোধ হার মানে। জান নিয়ে ছুটে হাজার হাজার দিকপালহীন এই মানুষ গুলোকে আশ্রয় দেয় বাংলাদেশে।

বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে চার বছরের শাকের, পাচঁ বছরের রোজিনা, এগার বছরের সুমাইয়া সহ অসংখ্য শিশু নারী সহ ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে। আশ্রয় না দিয়ে উপায় ও নেই। চার বছরের শাকেরকে প্রশ্ন করা হয় কেন এসেছে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে, অশ্রু ছেড়ে দিয়ে একটাই উত্তর “প্রাণ বাচাঁতে ছুটে আসছি। এই উত্তরের কোন পাল্টা প্রশ্ন জানা নেই বাংলাদেশের। পাচঁ বছরের রোজিনা জানায়, তার বাবা-মা’কে মেরে ফেলে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে সেনারা তাই সে ছুটে এসেছে এইপারে। এমন অসংখ্য নিষ্ঠুর বাস্তবতার সাক্ষী হয়ে প্রাণ বাচাঁতে নাফ নদীর তীরে ডুকরে কাদঁছে মানুষ। যে কান্না মানবতাকে ফেলে দিচ্ছে লজ্জায়, বিশ্ব বিবেককে দাঁড় করাচ্ছে অপরাধীর কাঠগড়ায়। যারা পালিয়ে আসছেন সবার চোখে মুখে আতংক। তারা দাউ দাউ আগুন, অগ্নিকুন্ডে শিশুর আর্তনাদ, জবাই করা লাশের ক্ষয়ের যাওয়া বেদনা আর নারীর সমভ্রম হারানোর আর্তচিৎকারের সাক্ষী এই ভয়ার্ত মানুষগুলো। অনেকে দিনে পর দিন হেঁটে হেঁটে শত মাইল পাড়ি দিয়েছেন। পায়ে হেঁটে এতদূর পাড়ি দেয়ার চেয়ে সেখানকার সহিংসতা ছিল বেশী দুঃসহ ও আতংকের।। পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ যে ১৩ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র নিজেই বলেন, তার দেশের প্রায় ১৭৬ টি গ্রাম জনশূণ্য। অন্তত ৩৪ টি গ্রাম পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। এই সংখ্যা মোট রোহিঙ্গা গ্রামের ৫৫ শতাংশ।

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই নারী, শিশু ও বৃদ্ধা। যাদের ৬০%ই শিশু ও ৩০% নারী ও বৃদ্ধ। রোহিঙ্গা যুবকরা বেশীর ভাগই হত্যা ও গ্রেফতারের সম্মুখীন হয়েছে বলে দাবি করছে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। তবে তাদের অনেকে আরসার সাথে বা নিজেদের মত প্রতিরোধ গড়ে তোলার খবর রয়েছে।

এপারে পালিয়ে আসারা যাতে আর ফিরতে না পারে সীমান্তে বসানো আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ সীমান্ত মাইন। সে মাইনে পালিয়ে আসতে গিয়ে অনেকে মারা গেছেন। হাত-পা উড়ে গিয়ে ভর্তি হয়ে আছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে। বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে মানবতার এহেন পরাজয় করুণ আর্তনাদ চোখে না দেখলে অনুমান করা মুশকিল।

এই সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা নির্ণয় করা মুশকিল। মায়ানমার সরকার বলছে, ৮৭ জন নিরাপত্তা বাহিনী ও ৫০০ জন রোহিঙ্গা নিহত হয় এবং গ্রেফতার করা হয় আরও ১০০০ রোহিঙ্গা যুবককে। তাদের এই সংখ্যা যদিও বা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্যনয়। কারণ বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের সবাই তাদের পরিবারের কাউকে না কাউকে মেরে ফেলার কথা বলছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহ বিভিন্ন মানবিধার সংগঠন স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে দেখান যে কীভাবে তিন সপ্তাহ ধরে পরিকল্পিতভাবে একর পর এক গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে উজাড় করে দিচ্ছে মায়ানমার সেনাবাহিনী। জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, সেনাবাহিনী মূলত রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মূল অভিযান চালাচ্ছে। যদিও বা মায়ানমার সেনাবাহিনী বলেছে তারা জঙ্গি দমন অভিযান চালাচ্ছে, সাধারণ জনগণ তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নয়।

Image may contain: 1 person, child, outdoor, nature and water

পালিয়ে অাসা রোহিঙ্গা শিশু। ছবি-রয়টার্স।

বিশ্বের বুকে একটি মানবিক বাংলাদেশ

যখন থেকেই রোহিঙ্গারা নির্যাতিত হয়ে আসছে বাংলাদেশ তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এবারের জাতিগত নিধন নির্যাতন আগের সব নিসংসতাকে হার মানিয়েছে। এদেশের আপামর জনতা  রোহিঙ্গা শরনার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। যেভাবে যতদ্রুত মানুষ আসতেছিলে এবং পরিস্থিতি এতই বিধ্বংসী ছিল সরকার এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল। মানবিক বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ এগিয়ে আসে রোহিঙ্গাদের পাশে।

প্রতিদিন ব্যক্তিগত উদ্যোগে শত শত ত্রাণের ট্রাক যাচ্ছে কক্সবাজারে। দেশের সকল পেশাজীবি, সামাজিক সংগঠন, অনলাইন এক্টিভিটিস ও ছাত্র-তরুণরা এগিয়ে এসেছে আর্তমানবতার টানে। মানুষের পাশে মানুষের জন্য। প্রতিদিন শত শত রোহিঙ্গা নারী পুরুষ প্রাণ ভয়ে পালিয়ে এসে নাফ নদীর তীরে আশ্রয় নিয়েছে, যাদের নাফ নদীর পার হওয়ার ভাড়া পর্যন্ত নেই। বাংলাদেশের মানুষ এপার থেকে নৌকা নিয়ে গিয়ে তাদের মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। আহত হয়ে, ধর্ষিত হয়ে নাফ নদীর তীরে আশ্রয়ের জন্য হাহাকার করা মানুষগুলোকে ঠাঁই দিচ্ছে মানবিক বাংলাদেশ। বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে মানুষকে। মুখে খাবার তুলে দিয়ে অনাহারী লক্ষ লক্ষ শিশুর মুখে। ধর্ষিত নারীদের দিয়েছে আশ্রয় আর চিকিৎসা। বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে নিরাপদে জন্ম নিচ্ছে আনোয়ার, শেখ হাসিনা সহ বহু শিশু যাদেরকে মায়ানমার সেনাবাহিনী মাতৃগর্ভে মেরে ফেলতে চেয়েছিল।

বাংলাদেশের মত হাজারো সমস্যা জর্জরিত জনবহুল একটি দেশের সরকার ও জনগণ সব সমীকরণের উর্ধ্বে উঠে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের বুকে বিশাল এক মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

এখানে উল্লেখ্য যে চট্টগ্রামের স্থানীয় লোকজন অতীতে দীর্ঘসময় রোহিঙ্গাদের খারাপ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখত। বার্মায়ইয়া বলে একটা বাজে সুরে আর বিভিন্ন উপায়ে গালি দিত রোহিঙ্গাদের। তবে সাম্প্রতিক সহিংসতায় বাংলাদেশীরা বুঝতে পেরেছে রোহিঙ্গারা নির্যাতিত জনগোষ্ঠী এবং তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া উচিত।

নারী ও শিশুরা রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকিতে

আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের বেশীরভাগই নারী ও শিশু। আর নারীদের ৯০% ই ধর্ষিত। তাদের শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক চিকিৎসারও প্রয়োজন। পাড়ি দেয়া রোহিঙ্গাদের অনেকে রয়েছে গর্ভবতী নারী। অনেকে শরণার্থী শিবিরের খোলা আকাশের নিচে বাচ্চা প্রসব করছেন। এসব নবজাতক ও মায়েদের যথাযথ স্বাস্থ্য সেবা দরকার। অনেক শিশু রয়েছে যাদের বয়স ১ বছরের নিচে কিন্তু শিশুর মাকে মেরে ফেলেছে মায়ানমার সেনারা। এমন অহরহ বাচ্ছা রয়েছে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে। এই শিশুদের যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে সরকার ও এনজিওকে ভূমিকা রাখতে হবে।

শিশুদের বড় একটি অংশ রয়েছে যারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। যারা পালিয়ে এসেছে আগুনের লেলিহান শিখা থেকে মৃত্যুর মুখে। অনেকে নিজ চোখে বাবা-মা’কে মরতে দেখেছে। আহত হয়েছে আনেকে, পায়ে হেটেঁ পাড়ি দিয়েছে মাইলের পর মাইল দুর্গম পথ। এই শিশুদের যথাযথ শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন। এদের যদি এখন মানসিক কাউন্সিলিং করা না হয় তবে এই শিশুদের নিয়ে সামনে জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে।

অনেক শিশু রয়েছে যাদের পরিবারে সবাই মায়ানমার সেনা বাহিনী ও বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের হাতে মারা গেছে। এইরকম শতশত পরিবার বিচ্ছিন্ন শিশু ঘুরছে শরণার্থী ক্যাম্প গুলোতে। ইউনিসেফ বলছে তারা প্রায় ১৬০০ শিশুর তালিকা তৈরী করেছে যাদের পরিবারের কেউ বেচেঁ নেই। এই শিশুরা যৌন হয়রানী, পাচার বা মাদক চোরাচালানের মত কাজে ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করছে ইউনিসেফ।

Image may contain: outdoor

বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প। ছবি: বিবিসি

নৌকা ডুবি ও ইয়াবা ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য:

বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ যখন নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তখন অসাধুদের তৎপরতাও থেমে থাকেনি। সুযোগ সন্ধানী নৌকার মাঝিরা একজন কে নাফ নদীর পার করিয়ে দিতে ২০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছেন। যারা দিতে পারছে না তাদের সর্বস্ব লুট করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা বা বাঙালি নাারীদের শেষ সম্বল থাকে তাদের নাকের ফুল। অনেকে সে নাকের ফুলের বিনিময়ে পাড়ি দিচ্ছেন নাফ নদী।

কিছু দিতে না পারলে নৌকা ডুবিয়ে দেয়ার নজিরও রয়েছে। যমুনা টিভির অনুসন্ধানে দেখা যায়, সহিংসতার ১৫ দিনে নাফ নদীতে নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটেছে ২৩ টি, যার মধ্যে ৫৪ জন শিশু সহ প্রায় ১০৫ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। তাছাড়া পথ হারা দিক হারা এই মানুষগুলোকে পাচারের চেষ্টা করার অভিযোগও  স্থানীয় কিছু অসাধু লোকের বিরুদ্ধে। তাই বাধ্য হয়ে রোহিঙ্গারা এখন বান্দরবনের বেশ কিছু পাহাড়ী সীমান্ত পয়েন্ট হয়ে পাড়ি দিচ্ছে বাংলাদেশে।

মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্মও থেমে নেই। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রবেশে বর্ডারে শিথিল করার সুযোগ নিচ্ছে ইয়াবা চোরাকারবারীরা। তারা শরণার্থীদের সাথে মিশে গিয়ে বাংলাদেশে পাচার করছে ইয়াবা সহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন বিপুল পরিমাণ ইয়াবা এই শরণার্থী ঢলের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। কোস্ট গার্ড বেশ কিছু চক্রকে গ্রেফতারও করে। ধরা পড়েছে ২ লাখ, ১০ লাখ পিচেরবড় বড় ইয়াবা চালান। মাদক পাচার ঠেকাতে মৃত্যু মুখ থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জনে জনে চেক করা সম্ভব ও না। স্থানীয়দের আশংকা যদি সত্যিই হয় তবে দেশের যুব সমাজের জন্য তা খুব আশংকাজনক। তাছাড়া অনেক রোহিঙ্গা স্থানীয় দুর্বৃত্তদের হাতে ছিনতাইয়েরও শিকার হচ্ছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা গরু-ছাগল নাম মাত্র মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য কর হচ্ছে বলেও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় খবর এসছে।

আরকান রোহিঙ্গা সেলভেশন আর্মি

২০১৬ সালে এবং এইবার মায়ানমারের চেকপোস্টে হামলা করে আলোচনা আসে বা দ্য আরকান রোহিঙ্গা সেলভেশন আর্মি  বা আসরা। আরসা সম্পর্কে যে ভুল ধারণা সেটা হচ্ছে তারা রাখাইনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন। আরসা প্রধান আতাউল্লাহ কোন ভিডিও বার্তায় দাবি করেননি তারা আরকানের স্বাধীনতা চান। তিনি যেটা বলেছেন তা হল, মায়ানমারের নাগরিত্বের দাবিতে এবং সমান নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাদের সংগ্রাম।

আরসা প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মা জুনুনি মূলত সৌদি আরবে বড় হয়েছেন। সৌদি আরবের মক্কায় বসবাসরত ২০জন নের্তত্বস্থানীয় রোহিঙ্গাদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে এই সংগঠন। আতাউল্লাহ পাকিস্তানের বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী থেকে অস্ত্র ও ট্রেনিং নিয়ে আরসা প্রতিষ্ঠা করে ২০১২ সালে করে প্রথম সামনে আসেন।

মাত্র দুই থেকে তিনশ সদস্য ও কিছু ছোটখাটো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শুরু হয় আরসার কার্যক্রম। তবে এখনো পর্যন্ত কোন আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সাথ তাদের যোগাযোগ রয়েছে এমন প্রমাণ মেলেনি। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) এক তদন্তে উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গাদের নিপীড়িত পরিস্থিতি পাকিস্তান, সৌদি আরব ও অন্যান্য জায়গার বিভিন্ন ধনী ব্যক্তিদেরকে একটি বিশৃক্সখল জঙ্গি দল গঠন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

আতাউল্লাহ ও তার দল আরসা এখন মায়ানমার আর্মির কাছে এক আতংকের নাম। তবে এই সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে ভিন্নমত আাছে নিয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে। তার সহযোদ্ধাদের কাছে তিনি মুক্তিকামী সৈনিক। তারা মনে করেন তিনি রোহিঙ্গাদের দুঃখ বুঝেন বলেই সৌদি আরবের বিলাসী জীবন ছেড়ে লড়াই করছেন।

তবে সমালোচকরা মনে করেন আতাউল্লাহর হটকারী সিদ্ধান্তের কারণে আজকে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকে রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আরসাকে দায়ি করছে কারণ ২০১৬ সালের সহিংসতা ও এবারের জাতিগত নিধন অভিযান আরসার হামলার প্রেক্ষিতে শুরু হয়। আরসার আক্রমণ যদিও বার্মার সামরিক বাহিনীর আক্রমণের তুলনায় কিছুই নয় আরসাকে নিয়ে তাই রোহিঙ্গাদের বিভাজন সাম্প্রতিক সময়ে আরো বিস্তৃত হয়েছে। কেননা আরসার আক্রমণের কারণে বার্মার সামরিক বাহিনী সকল রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করছে আর কার্যকরভাবে মানবিক সাহায্যের সকল রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে। আর এই সুযোগে জঘন্য নিপীড়ন ও সামরিকীকরণের চক্র পুরোদমে ঘুরছে।

চীনপন্থী বিশ্লেষকরা আরসাকে একটি ষড়যন্ত্র বলেই মনে করেন। তাদের মতে, বিদেশী শক্তির মদদে রাখাইনে চীনের বিনিয়োগকে ক্ষতিগস্ত্র করতে আরসাকে দিয়ে রাখাইন রাজ্য অস্থিতিশীল করে তুলছে। এই গ্রুপ আরো দাবি করছে আরসাকে মদদ দেয়া গ্রুপ আসিয়ানের মধ্যে একটি ফাটল ধরানোর চেষ্টা করছে। বিশেষত মালেশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াকে মায়ানমারকে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায়। তাছাড়া রাজনৈতিক ভাবে শান্তিপূর্ণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে অস্থিতিশীল করাও তাদের লক্ষ্য। তাই তারা আরসাকে একটা ষড়যন্ত্র বলেই দাবি করছে।

মায়ানমারে চীন রাশিয়া আর ভারতের স্বার্থ ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের অবস্থান 

চীন রাশিয়া ও ভারতের নিজ নিজ ব্যবসায়িক ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে মায়ানমারে। সামরিক শাসনের শুরু থেকেই মায়ানমার নিজেকে বহিঃবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এই বিচ্ছিন্নতার যুগে চীন মায়ানমারে একচেটিয়াভাবে তার ব্যবসা বিস্তার করে। পাশাপাশি ডোনাল্ড এম সিকিন্সের “হিস্টরিক্যাল ডিকশনারী অব বার্মা ”বইতে চীনাদের বার্মায় অভিবাসিত হতে উৎসাহিত করার কথা জানা যায়। চীনের এক সন্তান নীতির কারণে অধিক সন্তান নিতে আগ্রহীরা চীনারা মায়ানমারে স্থায়ী হয়েছেন। ১৯৮৪ সাল থেকে আজ পযৃন্ত প্রয় ২০ লাখ চাইনিজ মায়ানমারের নাগরিকত্ব নিয়েছে বলে দাবি করেন ডোনাল্ড এম সিকিন্স।

২০০৪ সালে রাখাইনে (আরকান) বিপুল পরিমাণ জ্বালানী সম্পদের সন্ধান পাওয়ার পর এই অঞ্চলটির উপর চীনের বিশেষ দৃষ্টি পড়ে। ২০১৩ সালে মিয়ানমারের বন্দর কিয়াউকফিউক থেকে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং পর্যন্ত তেল ও গ্যাসের ২টি পাইপলাইন নির্মাণ করে চীন। এই পাইপলাইন গিয়েছে রাখাইন প্রদেশ হয়ে এবং এর নিরাপত্তার দায়িত্ব সরাসরি সেনাবাহিনী প্রধানের হাতে। গ্যাস পাইপলাইন দিয়ে মিয়ানমারের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে হাইড্রোকার্বন নেয় চীন আর অন্যটি দিয়ে মালাক্কা প্রণালী হয়ে আফ্রিকায় তেল সরবারহ করে চীন। তাছাড়া ভারত মহাসাগরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া প্রভাব কমাতে মায়ানমারের কাঁধে চীনকে অবশ্যই অস্ত্র রাখতে হয়।

সংঘাতপূর্ণ রাখাইন রাজ্যে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে ৩০ লাখ একর জায়গা চায় চীন। মায়ানমারের গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ৩০ লাখ একর জায়গা জুড়ে চীনের বিনিয়োগ করতে চাই ১৮ বিলিয়ন ডলার। রাখাইন রাজ্যের ৭০ শতাংশ অঞ্চল ই গহীণ অরণ্যে ঘেরা। এত বিশাল এলাকা চীনের হাতে তুলে দিতে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করছে মায়ানমার সরকার। তাই চীন নীরবে ও প্রকাশ্যে রোহিঙ্গাদের উপর মায়ানমার সরকারের সরকারের যাবতীয় নিপীড়নকে অন্ধের মত সমর্থন করে যাচ্ছে।

মায়ানমার রাশিয়ার ২য় অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর মতে, ১৯৮৮-২০০৬ সাল পযন্ত প্রায় ৪০ কোটি ডলারের অস্ত্র ক্রয় করেছে। তাছাড়া মায়ানমারের ২ টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে রাশিয়া। তেল ও গ্যাস উত্তোলনে বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে রাশিয়ার। মায়ানমারের উচ্চ শিক্ষার বাজারও রাশিয়ার হাতে। ফলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় কোন ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই রাশিয়া।

মায়ানমারে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারে উদিগ্ন ভারত। প্রতিবেশী পাকিস্তান, শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও নেপালে চীনের প্রভাব এখন আগের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি। তাই মায়ানমারে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। তাই রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তুই শহরের গভীর সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে ভারতের মিজোরাম অঞ্চলকে থাইল্যান্ডের সাথে সড়ক নির্মাাণের কথা ভাবছে ভারত সরকার। ভারতের এই উচ্চবিলাসী প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে রাখাইন রাজ্যের উপর দিয়ে। এই অঞ্চলে উত্তেজনা বিরাজ করলে বা এই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সক্রিয় হলে ভারতের এই প্রকল্পে স্থবিরতা আসতে পারে। তাই মোদি সরকার কোন ধরনের সাত-পাঁচ না ভেবে অন্ধভাবে রোহিঙ্গাদের জাতিগত উৎখাতকে সমর্থন করে যাচ্ছে।

রাখাইনের সহিংসতা শুরু হওয়ার ২ দিন পর ২৬ আগস্ট ইন্ডিয়ান পররাষ্ট্র দপ্তর বিবৃতিতে রাখাইনে সরকারী বাহিনীর উপর “রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী”র হামলার নিন্দা জানান এবং রোহিঙ্গাদের উপর মায়ানমার সেনাবাহিনীর হামলার কোন নিন্দা না জানিয়ে বরং সেনাবাহিনীর ভূমিকাকে সমর্থন করেন।

৫ সেপেটম্বর নরেন্দ্র মোদি মায়ানমার সফরে গিয়ে ঠিক এই বিবৃতি পুনঃপাঠ করে। ৭ সেপ্টেম্বর ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড পার্লামেন্টরি ফোরাম অন সাসটেনেবল ডেভেলেপ্টমেন্ট শীর্ষক সেমিনারে রোহিঙ্গাদের উপর সহিংসতার প্রতিবাদে আন্তজার্তিক ঘোষণা থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয় ভারত।

এভাবে একচেটিয়া মনোভাবের আরও কারণ আছে। রোহিঙ্গারা যদি আন্তর্জাতিক সমর্থন পায় তবে ভারতের সেভেন সিস্টারের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন উৎসাহিত হতে পারে। ভারতের সেভেন সিস্টারের মেঘালয়, মিজোরাম ও মণিপুর অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ভারতের অবশ্যই মায়ানমারের সহযোগিতা দরকার। ভারতের টিভি টকশোতে সাবেক ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল বলেন, ‘ভারতের উচিত রোহিঙ্গা ইস্যুতে মায়ানমারের পাশে থাকা। কারণ মায়ানমারের কাছে ভারতের অনেক কিছু পাওয়ার আছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের কাছে যা পাওয়ার তা যেমন সেভেন সিস্টারে ট্রানজিট, চট্টগ্রামবন্দরের ব্যবহার তা ভারত পেয়ে গেছে।’  তিনি উল্লেখ করেন বাংলাদেশ অস্ত্র কিনে চায়নার কাছ থেকে সে কারণে চায়না থাকুক বাংলাদেশের পাশে।

রোহিঙ্গারা মুসলিম হলেও এই ইস্যুতে চুপ রয়েছে পাকিস্তান, সৌদি আরব বা ইরানের মত দেশ। তুরুস্ক শুরুতে মানবতার বাণী শুনালেও এখন চুপ হয়ে গেছে। যতই এটাকে মুসলিম সম্প্রদায়ের আঘাতের প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে না কেন তাতে খুব একটা পালে হাওয়া লাগছে না। পরমাণু অস্ত্র ইস্যুতে চীন ইরানকে যে পরিমাণ সাপোর্ট দিয়েছে তাতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইরান চীনের বিরুদ্ধে কথা বলে না। যেমনটা ইউঘুর মুসলিমদের উপর চীনের অভিযান  নিয়ে ইরান চুপ ছিল তেমনি ইরান চুপ রোহিঙ্গা ইস্যুতে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানেরও রয়েছে চীনের সাথে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক। তাই বাণিজ্যিক ও ভৌগোলিক রাজনীতির ম্যারপ্যাচে রোহিঙ্গা ইস্যুতে রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশ কেউ খুব একটা বিদেশী বন্ধু পাচ্ছে না।

তবে আসিয়ানের সদস্য রাষ্ট্র মালেশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া শুরু থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মায়ানমারের কঠোর সমালোচনা করছে। তাছাড়া আরেক সদস্য রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধনে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ায় চরমপন্থার উত্থান হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করে।

বাংলাদেশ শুরুতে রোহিঙ্গা ইস্যু যেভাবে মোকাবেলা করেছে রাখাইন সহিংসতা নিয়ে বাংলদেশের হাতে যথেষ্ট গোযেন্দা তথ্য ছিল বলে মনে হয় না।  বাংলাদেশের  দীর্ঘদিনে পরীক্ষিত বন্ধু ভারতকে পাশে না পাওয়া বাংলাদেশের কূটনীতির অপরিপক্কতার প্রমাণ। রাখাইনের সহিংসতা শুরু হওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশের উচিত ছিল ভারতে একজন মন্ত্রী পর্যায়ে বিশেষ দূত পাঠানো। বর্তমান সরকারের প্রতি ব্রিকস রাষ্ট্রসমূহের একটা বিশেষ সমর্থন রয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকার সে সুযোগও কাজে লাগাতে পারেনি বলে মনে হয়।

বাংলাদেশের অবকাঠাামো নির্মাণে চীন বর্তমানে সবচেয়ে বড় অংশীদার। চীনে কমিনিস্ট পার্টির সম্মেলনে আ’লীগের যে প্রতিনিধি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছে সেটা ছিল পূর্ব নির্ধারিত একটা সফর। চীনে ও বাংলাদেশ সরকার কোন বিশেষ কোন প্রতিনিধি পাঠিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ অভিমুখে ঠেলে দিলে বাংলাদেশসহ এই অঞ্চল যে অস্থিশীল হয়ে উঠতে পারে তা বোঝানোর কোন উদ্যোগ নেয়নি।

রাশিয়া আমাদের দীর্ঘদিনের কৌশলগত বন্ধু। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে রাশিয়ার অবদান রয়েছে। আমাদের পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়া বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশ রাশিয়াকে কাছে পাওয়ার জন্যও কোন শক্ত তৎপরতা চালায়নি। মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরকে দিয়ে আসিয়ানের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের একটা সুযোগ ছিল মায়ানমারকে। তাছাড়া সৌদি ও মিডলইস্টেও দেশ সমূহের মাধ্যমে ও মায়ানমারকে চাপ দেয়ার দরজা খোলা আাছে। কারণ এদের সাথে আবার চীন-রাশিয়ার ভাল বন্ধুত্ব। রোহিঙ্গা ইস্যুতে অন্তত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মায়ানমারের পক্ষে ভোট না দিলে যাতে ভেটো দেয়া থেকে চীন-রাশিয়া বিরত থাকে সে তৎপরতা চালানো উচিত বাংলাদেশর।

এখন পর্যন্ত কূটনৈতিক তৎপরতা বলতে সব দেশের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রিফিং ও টেকনাফ শরণার্থী শিবির পরিদর্শন। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন আমরা ১৬ কোটি মানুষ খেতে পারলে ১০ লাখ রোহিঙ্গাদেরও খাওয়াতে পারব। এটা অনেকটা দীর্ঘসময়ের জন্য রোহিঙ্গাদের এখানে মেনে নেয়ার মত বক্তব্য।

সহিংসতা চলাকালীন সময়ে মায়ানমার প্রায় ১৭ বার বাংলাদেশের আকাশ সীমা লঙ্ঘন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ কোন উসকানীতে পা দেয়নি। এটা অবশ্যই দূরদর্শী কূটনীতি। এজন্য বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইউএনএইচসিআর, পোপ ফ্রান্সিস, দাল্ইালামা সহ আন্তজার্তিক অনেক জোট, সংগঠন ও ব্যক্তিত্ব রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আল-জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি, সিএনএনর মত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম খুব গুরুত্বের সাথে খবর প্রকাশ করে। রোহিঙ্গাদের উপর সহিংসতাকে তুলে আনে। সিএনএনের মত টিভি যেটা কিনা আমেরকিা ইইরোপের খবর দিয়ে শুরু করে তাদের প্রধান নিউজ ও আলোচনা জুড়ে ছিল রোহিঙ্গা ইস্যু। বিশেষ করে তুরস্কের ফাস্ট লেডির রোহিঙ্গাদের দেখতে বাংলাদেশ সফরের পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনামে উঠে আসে রোহিঙ্গা ইস্যু।

কক্সাবাজারের প্রাকৃতিক পরিবেশ জনজীবনে প্রভাবঃ

অনেক বছর ধরে কক্সাবাজার রোহিঙ্গাদের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সহিংসতার আগেও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাস করছে কক্সবাজারে। তাছাড়া ভাষাগত মিল ও শারীরিক গঠনের মিলের কারণে অনেক রোহিঙ্গা মিশে গেছে স্থানীয়দের সাথে। ফিলিস্তিন বা ইউরোপের শরণার্থী শিবির থেকে শরনার্থীরা বের হতে পারেনা। কিন্তু কক্সবাজারের শিবিরের এই নিয়মের বালাই নেই। শরাণার্থী শিবিরগুলোতেও অবাধে স্থানীয়দের বিচরণ। বান্দরবন ও কক্সবাজারে অনেক রোহিঙ্গা স্থানীয়দের সাথে মিশে ভোটার হয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। এমনকি বান্দরবনে স্থানীয়দের সাথে মিশে যাওয়া রোহিঙ্গা জনপ্রতিনিধিও নির্বাচিত হয়েছেন।

অনেক অসাধু লোক এই রোহিঙ্গাদের দিয়ে মাদক চোরাচালান সহ নানা অসামাজিক কাজে ব্যবহার করছে। এর ফলে টেকনাফ- কক্সবাজারের স্থানীয় জীবনে বিরুপ প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজার, টেকনাফ, মেরিন ড্রাইভ রোড। কিন্তু মেরিন ড্রাইভ রোডের দু’পাশে এখন রোহিঙ্গা বসতি। এই রোডের রোহিঙ্গা বসতি নিঃসন্দেহে পর্যটন ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। রোহিঙ্গারা মাথা রাখার ঠাঁই করতে শত শত একর বন উজাড় করছে পাহাড় কেটে বাড়ি বানাচ্ছে।

পালিয়ে আশা স্বচ্ছল রোহিঙ্গারা ইতিমধ্যে কক্সবাজার শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, এই সংখ্যা ৬ হাজার হলেও স্থানীয়দের মতে তা লাখ ছাড়িয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন তাদেরকে ক্যাম্পে ফিরিয়ে নেয়া হবে বললেও তা আদৌ কতটা সম্ভব সে প্রশ্ন রয়েছে। ইতিমধ্যে শহরে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলেই মনে করছে পর্যটন ব্যবসায়ীরা। যেহেতু বৈধ উপায়ে রোহিঙ্গা আয়ের কোন সুযোগ নেই তাই তারা পর্যটকদের জিম্মি বা ছিনতাই করতে পারে আশংকা তাদের।

তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ে বৃক্ষসৃজনের নামে পাহাড়ে বেশ কিছু লোক রোহিঙ্গারা পাহাড়ে বসতি ঠিক করে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম ও ঢাকা শহরের অনেক বাড়িতে এখন কাজের মেয়ে হিসাবে কাজ করছে রোহিঙ্গা নারীরা। ইতিমধ্যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশে শ্রমিক হিসেবে গিয়ে অবৈধ কাজ করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষূন্ন করেছে। তাছাড়া রোহিঙ্গাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয়ার কাজটাও আমারা ঠিক মতো করতে পারিনি। পরিপেক্ষিতে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা স্থানীয়দের সাথে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্থানীয়দের সাথে মিশে যাওয়া ঠেকাতে না পারলে বিপুল বাণিজ্যিক ও পর্যটন সম্ভাবনাময় শহর কক্সবাজার ও টেকনাফের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। যা বাংলদেশের এই অঞ্চলকে দীর্ঘমেযাদি অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাবে।

উগ্রপন্থা বিস্তার রোধে বাংলাদেশকে সতর্ক হতে হবে

পর্যায়ক্রমিকভাবে রাখাইনে রোহিঙ্গাদেও মানবধিকার লঙ্ঘন হয়ে  আসছিল। তাদেরও নাগরিকত্ব নেই, আইনগত সুরক্ষা নেই। নেই চিকিৎসা শিক্ষার মত মৌলিক অধিকার। এভাবে অধিকার সুংকুচিত করা পলে সেখানে পুরা মাত্রায় বিদ্রোহ দেখা দেবে সেটাই স্বাভাবিক।
মানতে বাধা নেই বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বিশ্বশক্তির কাছে। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসগর, চীন সাগর ও প্রশান্ত সাগরকে ঘিরে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলছে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা। আর এই সব অঞ্চলে প্রভাব ধরে রাখতে মায়ানমার ও রাখাইন রাজ্যের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে বিশ্বশক্তির কাছে। তাই সবাই বিনিয়োগের ঝুলি নিয়ে দৌঁড়াচ্ছে মায়ানমারের দিকে। মায়ানমারের উত্তরাঞ্চলে খ্রিস্টান বনাম বৌদ্ধ ও আরকানে মুসলিম বনাম বৌদ্ধ যে সংঘাত চলছে তার আগুনে ঘি ঢালার লোকের অভাব নেই।

মায়ানমারের এই সাম্প্রদায়িক বিদ্বষ ছড়িয়ে পড়তে পারে বাংলাদেশর পার্বত্য চট্টগ্রাম, ভারতের মণিপুরি, আসাম ও মেঘালয় রাজ্য জুড়ে। যদি এই ধরনের কোন বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে তবে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিদেশী জঙ্গি গোষ্ঠী বা ‘যোদ্ধা’রা যোগ দিতে পারে। যা বাংলাদেশ ভারত ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিবে। এই আগুন লাগবে চীনের গায়েও। কারণ মায়ানমারে রয়েছে চীনের বিপুল বিনিয়োগ। সুতরাং এই অঞ্চলের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে উগ্রপন্থী কোন সংগঠন যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে  তার জন্য করণীয় ঠিক করতে হবে ভারত-মায়ানমার-চীন-বাংলাদেশ কে। বাংলাদেশকেই সে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে এবং ভারত চীনকে তাদের নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান প্রয়োজন তা বুঝাতে হবে।

বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা বান্দরবনে  মায়ানমারের সন্ত্রাসী গ্রুপ আরকান লিভারেশন পার্টি (এএলপি) বেশ সক্রিয়। রয়েছে আরএসের মত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। আরএসের ওয়েবসাইট গেটে দেখা যায়, তারা বাংলাদেশের কিছু অংশ ও আরকান নিয়ে ইউরেশিয়া নামে নতুন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের ওয়েবসাইটে নিজস্ব ভৌগিলিক সীমা, নিজেদের পতাকা ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের অফিস থাকার কথা উল্লেখ আছে। ইউটিউবে আরকান লিভারেশন আর্মির ট্রেনিংয়ের ভিডিও সার্চ দিলেই পাওয়া যায়। অন্যদিকে নতুন আতংক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘আরসা’। সাম্প্রতিক সহিংসতার পর আরসা স্বাভাবিক ভাবেই তাদের দলে বিক্ষুব্ধ পরিবার লোকদের বেড়াতে পারবে। আরসা প্রশিক্ষিত যোদ্ধারা বাংলদেশে ইতিমধ্যে ঢুকে পড়েছে কোন সন্দেহ নেই। অর্থ ও অস্ত্রের জন্য তারা বাংলাদেশে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে। ইতিমধ্যে টেকনাফের আনসার ক্যাম্পে অস্ত্রের জন্য রোহিঙ্গা ডাকাতের কবলে পড়েছে। চরমপন্থীদের কোন ধর্ম নেই । এএলপি আরসা বা আরএসও যদি একত্র হয় তবে তা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য বিশাল হুমকি হয় পড়বে। এমনকি চট্টগ্রাম পরবর্তী কাশ্মির, ফিলিস্তিন হওয়ার আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

সূচির মন্ত্রীর সফর ও রোহিঙ্গা সমাধানের দুরত্ব:

সম্প্রতি অং সাং সুচির দফতরের খিও টিন্ট সোয়ে বাংলাদেশ সফরের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে ৫ লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নেয়ার খবর যে প্রচারিত হয়েছে তা শুভংকরের ফাকি।  ১৯৯২ সালের চুক্তি অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র বা শনাক্তকরণ কার্ডধারী রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার কথা বলেছেন বার্মিজ মন্ত্রী। এই পক্রিয়ায় মাত্র ১৪ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত যেতে পারবে।

কারণ কফি আনান কমিশনের সুপারিশে গত জুনের পর শনাক্তকারী কার্ড পেয়েছে মাত্র ১০ হাজার রোহিঙ্গা আর জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে ৪ হাজার রোহিঙ্গার। কারণ ১৯৮৫ সালের পর রোহিঙ্গাদের কোন জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া হয়নি। বাংলাদেশ-মায়ানমার যে জয়েন্ট ওযার্কিং গ্রুপ করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান  করা হবে তার নির্দিষ্ট কোন সময় বাংলাদেশ সরকার জানে না। ওয়ার্কিং গ্রুপে জাতিসংঘের প্রতিনিধি রাখার প্রস্তাব দেয়া উচিত ছিল বাংলাদেশের। যেহেতু রোহিঙ্গা সমস্যার শুরু থেকে জাতিসংঘ কাজ করছে জাতিসংঘের এই নিয়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে। সমঝোতা টা আন্তর্জাতিক আঙ্গিকে করা গেলে বাংলাদেশের জন্য তা আরও পাকাপোক্ত হবে। কারণ মায়ানমার তাদের প্রস্তাব নিয়ে কতটা আন্তরিক তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অতীতে তারা অনেকবার কথা রাখেনি। অং সাং সুচি বৃটিশ মন্ত্রীকে রাখাইনে কোন অভিযান চালানো হবে না বলার পরদিনও সহিংসতার খবর পাওয়া যায়।

অবস্থা দৃষ্টে যা মনে হচ্ছে শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মায়ানমার কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত নিতে চাচ্ছে। এটা হতে পারে তাদের আন্তর্জাতিক চাপ এড়ানোর কৌশল। বাংলাদেশের উচিত জাতিসংঘ চীন বা ভারতের মধ্যস্থতায় সব রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো। বাংলাদেশের নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বিবিসিকে বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আসলে ভারতে তেমন একটা কিছু করার নেই। বাংলাদেশের উচিত চীনের সহযোগিতা নেয়া। বাংলদেশে নিযুক্ত চাইনিজ রাষ্ট্রদূত অলরেডি সমঝোতা করার ইচ্ছা পোষণ করেছে। তাই বাংলদেশের উচিত বিশ্ব দরবারে আমাদের অবস্থান যথাযথভাবে তুলে ধরে রোহিঙ্গা ইস্যুর একটি যৌক্তিক সমাধান খোঁজা নতুবা জাতিগত বিদ্বেষ বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে।

সঠিক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারলে এই খেলায় বাংলাদেশ জিততে পারবে বলেই মনে করি আমি। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া বাংলাদেশের মানবিকতা ইতিমধ্যে বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত হয়েছে। অন্যদিকে বহিঃবিশ্বে রোহিঙ্গাদের উপর যে গণহত্যা চালানো হয়েছে তা প্রমাণিত সত্য। সুচি বিশ্বের সামনে এখন ভিলেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তার খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর চীন যতই মায়ানমারকে সমর্থন করুক না কেন চীনের বাণিজ্য স্বার্থে একটু আধটু হেরফের হলে আন্তজার্তিক আদালতের রায় মাায়ামার সরকারের মাথায় ঝুলিয়ে দিবে এটা নিশ্চিত। বরং বাংলাদেশই এইখানে খুব ফ্রি ডিপ্লমেসি খেলতে পারবে।

বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশের বছরের পর ১০ লাখ রোহিঙ্গাদের পালন করা সম্ভব নয়। তাছাড়া রোহিঙ্গা এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যও দিন দিন হুমকি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের উচিত সরকারের এবং সরকারের বাইরের আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বকে কাজে লাগিয়ে বন্ধু রাষ্ট্রদের কাছে নিজেদের উদ্বিগ্নতার কথা তুলে ধরা। সাথে সাথে রোহিঙ্গা ইস্যুর একটা স্থায়ী সমাধান বের করা। কারণ এই সমস্যা জিইয়ে রাখলে আমাদের পূর্বমুখী বাণিজ্য সম্প্রসারণ মুখ থুবড়ে পরবে।

সূত্র: 

১. রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস, এন. এম. হাবিব উল্লাহ্।
২.  নিউজ টোয়েন্টিফোরেএর প্রতিবেদন

৩. যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদন

৪. আল-জাজিরা

এছাড়াও সাম্প্রতিক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবদেন গুলো অনুসরণ করে এই লেখাটি লেখা হয়েছে।

চলবে…………

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন
শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়