ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

দেশে কোন ভাবেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের জোয়ার থামছে না। প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি, এসএসসি, এইচএসসি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। প্রতি পরীক্ষার আগের রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরতে থাকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। প্রতিবছরের ন্যায় এই বছরও এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগের রাতে ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপ থেকে প্রশ্নফাঁসের বিজ্ঞাপন দেয়া হয়।

বাজারের সবজির মত ৩০০/৫০০/৮০০ টাকা, বিভিন্ন দাম হাকিয়ে দরাদরি করে বিক্রি হয় ভবিষ্যত প্রজন্মের মেধার মূল্যায়ন করার প্রশ্ন নামক এই দলিল। এই প্রশ্ন আট থেকে আশি, মা থেকে মাসি সবাই পেলে উদ্বিগ্নতার কারণ থাকত না। তখন ফাঁসকৃত প্রশ্ন দিয়ে সবাই পরীক্ষা দিয়ে মেধার প্রতিযোগিতা হতো। কিন্তু প্রশ্ন কিনতে পারছে কিছু শহুরে ও ধনী শিক্ষার্থী। ফলে শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে ধরে একটি অমেধাবী ও অথর্ব প্রজন্ম যেমন তৈরী হচ্ছে, ঠিক তেমনি শিক্ষার্থীদের একটি অংশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি তৈরি হচ্ছে ঘৃণা আর ঘৃণা। যারা দেখছে সারা বছর পড়ালেখা করার পরও অন্য কেউ পড়ালেখা না করে ফাঁসকৃত প্রশ্ন দিয়ে তাদের চেয়ে ভাল রেজাল্ট করছে। এতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক কারণেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা শ্লোগান তুলছে “হয় যদি প্রশ্ন ফাঁস, পড়বো কেন বারো মাস!” এই প্রশ্নের উত্তর শিক্ষামন্ত্রী আজও দিতে পারেননি। বরং তিনি নির্লজ্জ ও বেহায়ার মত অকপটে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ অস্কীকার করে যান। প্রশ্ন ফাঁস হওয়া বন্ধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে প্রতিবছর এসএসসি, এইচএসসি সহ বোর্ড পরীক্ষা প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছেই।

 

.

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি চরম দুর্ভাগ্য হলো বোর্ড ফাইনাল চলাকালীন সময়ে বিরোধী দলগুলোর হরতাল। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে হরতালের এই সংস্কৃতি বেশ পুরানো। ১৯৯৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ৮ দিন হরতাল ডেকেছিল। ১৯৯৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা আওয়ামী লীগের অবরোধে পিছিয়ে যায় ৩ মাস। ২০০৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষাও হরতালে পেছাতে হয় কয়েকবার। বেশ কয়েকবছর বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হয় এই অপসংস্কৃতি।

২০১৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষা ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের কারণ ছাড়াও বিএনপি জোটের হরতালে পেছাতে হয় দুবার। একই বছরের নভেম্বরের অনুষ্ঠিত জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা পেছাতে হয় জামায়াতের হরতালে। ২০১৪ সালের জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষাও একই কারণে পেছাতে হয়। একই বছরের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ভর্তি পরীক্ষাও পেছানো হয় জামায়াতের ডাকা হরতালে। ২০১৫ সালের বিএনপি জোটের অবরোধে পেছানো হয় এসএসসি পরীক্ষা। সর্বশেষ জামায়াতের ডাকা হরতালে ২০১৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা পেছানো হয় দুবার।

তাই চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষার উপর শুধু প্রশ্ন ফাঁস নয় অভিশাপ হয়ে আছে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও। ৮ ফেব্রুয়ারি বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি। আবার দেখা দিয়েছে হরতালের আশংকা। হরতাল ডাকা রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর অধিকার হরণ করে এ কেমন গণতন্ত্রের চর্চা?

এভাবে প্রশ্ন ফাঁস ও হরতাল-অবরোধে পরীক্ষা পেছানো হলে পরীক্ষার্থীদের মন মানসিকতা ও চেতনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই কাকের মত চোখ বন্ধ না করে প্রশ্ন ফাঁস হয়নি বলে মিথ্যাচার না করে শিক্ষামন্ত্রী সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া এবং জড়িতদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা। হরতাল ডাকার সময় দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত দেশের লক্ষ লক্ষ ভবিষ্যত কর্ণধার তথা পরীক্ষার্থীদের কথা মাথায় রাখা। আগামীর বাংলাদেশ তো তাদের হাতেই।

 

লেখক: শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়