ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বিদেশ থেকে জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টের নামে আসা ২ কোটি  ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাচঁ বছরের কারা দন্ড দিয়েছে আদালত। দশ বছর আগে জরুরী অবস্থার মধ্যে দুদুকের দায়ের করা এই মামলার খালেদা জিয়ার জৈষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান সহ ছয় আসামীদের মধ্যে বাকিদের দশ বছরের সাজা হয়।

সেই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বকশি বাজারে অালিয়া মাদ্রসায় স্থাপিত বিশেষ অাদালত-৫ এর বিচারক ড.আখতারুজ্জামান এই রায় দেন।

আদালত বলেছে,অভিযোগ প্রমাণ হলেও খালেদা জিয়ার সাজা অন্য আসামীদের তুলনায় কম হয়েছে ‘তার বয়স ও সামজিক মর্যাদা’ বিবেচনায়। উল্লেখ্য জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টে এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আনা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা দায়ের করে দুদুক।

এদিকে খালেদা জিয়ার সাজাকে ‘ফারমায়েশি রায়’ আখ্যায়িত করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা বলেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের আইনজীবী।রায়ের কপি হাতে পেলে আগামী রবিবার আপিল করার কথা ও জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবীরা।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন,“এই রায়ের মধ্য দিয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং আইনের ঊর্ধ্বে যে কেউ নয় তা প্রমাণ হল। (সূত্রঃ বিডিনিউজ২৪.কম)
রায়ের প্রতিক্রিয়া বরিশালে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন,“যারা মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে,ওই বিচার এমনিতেই হয়। ওই বিচারই হচ্ছে।” (সূত্রঃ পরিবর্তন.কম)

প্রধানমন্ত্রী খালেদার জিয়ার এই রায়কে মানুষ পুড়িয় মারার অভিশাপ হিসেবে দেখছে। তার কথা মতে, অভিশাপের দরুণ রায় খালেদার বিপক্ষে গেছে। এবং এই ও ঠিক যে অতীতে আর যারা যারা মানুষ পুড়িয়ে মেরেছেন তাদের মানুষ পুড়িয়ে মারার অভিশাপে জেল হবে।

খালেদা এই রায় এতিমখানার টাকা আত্মসাত করা নিয়ে আর এতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে মানুষ পুড়িয়ে মারার অভিশাপ । তবে সরকারের উচিত খালেদা জিয়া যদি মানুষ পুড়িয়ে মারে তার বিরুদ্ধে আরও বেশী বেশী মামলা করা এবং ইতিমধ্যে করা সব মামলা গুলো দ্রুত বিচার আইনে আনা যাতে তিনি (খালেদা জিয়া) তাঁর জীবদ্দশায় সব মামলার রায় দেখে যেতে পারেন। তবে এইসব মামলায় প্রধানমন্ত্রীর জেলাকে ব্যঙ্গ করার অভিশাপ প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে। উল্লেখ্য খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া এতিমখঅনা মামলা ছাড়াও ২৫ টি মামলা রয়েছে যার মধ্যে ১৪ টি স্থানান্তর করা হয়েছে বকশি বাজারের বিশেষ আদালতে। এই ১৪ টি মামলার মধ্যে ৫ টি দুদুকের করা মামলা , বাকি মামলার মধ্যে রয়েছে হত্যা,নাশকতা, পুলিশের কাজে বাধা দেয়া এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতা।

আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যে ২ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলার রায় হওয়াকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে বলেছেন। তবে শেয়ার বাজারের কোটি টাকা কোটি টাকা আত্মসাত,বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হলমার্ক কেলেঙ্কারীর,বেসিক ব্যাংক,জনতা ব্যাংক লুটপাতের হোতারা যে এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে তাকে তিনি কিসের শাসন বলবেন। ১৯৯৬ সালের শেয়ার বাজার কেলেংকারির পর আাবার ২০১০-২০১১ স্মরণকালেরর সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হয় শেয়ার বাজারে। যার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্ণর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদরে নেতৃত্বধীন ৪ সদস্যদের শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি বিষয়ক তদন্ত কমিটি করা হয়। ২০১১ সালের ৭ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর কাছে এই নিয়ে কমিটি ৩২০ পৃষ্ঠার তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়। কমিটির পর্যবেক্ষণ অনযায়ী, কিছু অসৎ ব্যবসায়ী শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণকারীদের সাথে যোগসাজশে খুচরা বিনিয়োগকারীদের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। কমিটির প্রতিবেদনে প্রায় ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি,রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর নাম উঠে আসে । যারা বেনামে বা ভূয়া ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদরে টাকা হাতিয়ে নেন। অর্থমন্ত্রী আশ্বাস দিলেও আজ তাদের কোন বিচার হয় নি। এমনকি অর্থমন্ত্রী জড়িতদের নাম জনসম্মুখে বলতেও চান না।

পাচঁ বছর আগেও বেসিক ব্যাংক ছিল দেশের অন্যতম সেরা ব্যাংক। অন্নত সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা এই ব্যাংক থেকে জাল-জালিয়াতি ,আর অনিয়ম করে বের করে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে শত শত কোটি টাকার ঋণ । ঋণের প্রস্তাব শাখা থেকে পাঠানোর আগেই অনুমোদন পরিচালনা পরিষদ । বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল ২০১২ সালে,কিন্তু আজও কোন তদন্ত এগোয়নি । (সূত্রঃ প্রথম আলো ১৭.০৬.২০১৩)

হলমার্ক কেলেঙ্কারি পর আমাাদের বয়োজ্যষ্ঠ অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন চার হাজার কোটি টাকা কিছুই নয়। অথচ এই চার হাজার কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। কারণ অলরেডি টাকা পাচার হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত একজন সজ্জন লোক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে তিনি হেদায়তের বক্তব্য নিয়ে এসে সভা সেমিনার মজলিশ গরম করেন। সেই সজ্জন ব্যক্তি যখন জনতা ব্যাংকের চেয়্যারম্যান ছিলেন তখন ব্যাংকের ১২ টা বাজিয়ে দেন। তিনি নিয়ম বহির্ভূত ভাবে মাত্র ছয় বছরে জনতা ব্যাংক একজন গ্রাহককে দিয়েছে ৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার ঋণ। ২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ৫ বছরের জন্য বারাকাত সাহেব কে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানান অর্থমন্ত্রী। তার সময়ে দেয়া হয় এত বড় নিয়ম বহির্ভূত ঋণ জালিয়াতি। জনতা ব্যাংকের মোট মূলধন ২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ঋণ দেয়ার সুযোগ আছে। অর্থাৎ এক গ্রাহক ৭৫০ কোটি টাকার বেশী ঋণ নিতে পারেন না। অথচ একজনকেই দেয়া হয়েছে মূলধনের দিগুণ অর্থ। ২ কোটি টাকার জন্য খালেদার ৫ বছরের জেল হলে তবে আবুল বরাকাত সাহেবের কত বছরের জেল হওয়া উচিত । যদি এত বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারীগুলোর বিচার না হয় তবে কিভাবে আইনমন্ত্রীর কথায় একমত হবো যে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।


আবার রাজনীতিতে ফেরা যাক। আজ খালেদা জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে সরকার জন নিরাপত্তার দোহায় দিয়ে যেভাবে গাড়ি ঘোড়া নিয়ন্ত্রণ করেছে তাতে মনে হয় সরকার নিজ থেকেই হরতাল পালন করেছে। তবে রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি গতানুতিক ভাবে হরতাল না ডেকে শুভ বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন এই সময়ে হরতালের মত হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেয়ার দেশবাসী তাদের সাধুবাদ জানায়। তাদের উচিত আইনি ভাবে মামলা মোকাবেলা করা এবং রাজনৈতিক কোন কর্মসূচি দিলে তাতে যেন জ্বালাও-পোড়াওয়ের মত ধ্বংস্মাক কর্মসূচি পরিহার করা হয়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ হিসাবে হরতালের বিকল্প খোঁজার সময় এসছে।

লেখক: শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন
শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।