ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সারা বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্যায়নের দাবিতে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

 

১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগে অনুষ্ঠিত ২য় নারী সম্মেলনে প্রতি বছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব করা  হয়। ১৯১১ সাল থেকে নারীদের সম অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। নারী দিবস হচ্ছে জাতি গোষ্ঠি তার সাংস্কৃতিক,অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সব ক্ষেত্রে বৈষম্যহীনভাবে নারীর মর্যাদা অনুভব করার দিন।

গত বছর বাংলাদেশে পালিত নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল- নারী পুরুষের সমতায় উন্নয়নের যাত্রা, বদলে যাবে বিশ্ব, কর্মে নতুন মাত্রা। কিন্তু সারা বিশ্বব্যাপী নারী দিবস পালনের এক শতক পেরিয়েও আমরা কি নারী পুরুষের জন্য একটি সমতার পৃথিবী গড়তে পেরেছি? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নারীর সামাজিক অবস্থান শোচনীয়। নারী গৃহস্থালী ছেড়ে বাইরে কাজ করবে সেই নিরাপদ পরিবেশ তৈরী হয়নি কোথাও।

উদারনৈতিক নারীবাদীরা মনে করেন গৃহকর্ম ও মাতৃত্বের মত গতানুতিক ভূমিকার পাশাপাশি পুরোপুরি কর্মজগতে প্রবেশ নারী মুক্তির উপায়। নারীবাদী তাত্ত্বিক জন স্টুয়ার্ট মিলহেরিয়ার টেইলর বলেন,নারী পুরুষের সম-অধিকারের জন্য নারীদের ঘরের বাইরে কাজ করতে হবে। শুধুমাত্র নারী বাইরে কাজ করলেই বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে বিষয়টা এমন নয়। বরং নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনটা সর্বপ্রথমে জরুরী।

আমরা পুরুষের বাইরের কাজকে উৎপাদনশীল এবং নারীর গৃহস্থালীর কাজকে সাধারণ হিসেবে দেখি বলেই এই বৈষম্য প্রবল হচ্ছে। সরাসরি আর্থিক লেনদেন না থাকায় আমরা গৃহস্থালির কাজকে গুরুত্বের সাথে দেখি না। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সাথে ব্যক্তিগত আলাপে জানতে চেয়েছিলাম,তাঁর স্ত্রী কি করেন। জবাবে তিনি বলেছিলেন, কিছুই করে না। গৃহস্থালির কাজ বা সন্তান লালন-পালনকে তার কোন কাজ মনে হয় না। অথচ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৫ এর মতে, দেশে ১ কোটির ও অধিক নারী দৈনিক ১৬ ঘন্টা করে গৃহস্থালীর কাজ করে, যার অর্থিক মূল্য হিসাব করলে কয়েক হাজার কোটি ডলারে দাড়াঁবে।

 

পুরুষর পাশাপাশি একই মাত্রায় কাজ করে যাচ্ছে নারীরাও

পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৫ এর মতে, কর্মজীবী হিসেবে ৯০ লাখ ১২ হাজার নারী কৃষিখাতে, ৪০ লাখ ৯০ হাজার নারী শিল্প খাতে এবং ৩৭ লাখ নারী সেবা খাতে কাজ করছে। এই কর্মজীবি নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল তৈরী হয়নি মোটেই। পুলিশে কর্মরত নারী কনস্টেবলদের ১০ ভাগের বেশি সদস্য যৌন হয়রানির শিকার হন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের গবেষণায় দেখা যায়, ৩০ শতাংশ নারী শ্রমিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

তাছাড়া বাইরে কাজ শেষে এই কর্মজীবী নারীদের  আবার গৃহস্থালির কাজও করতে হয়। তাই গৃহস্থালির কাজ যে শুধু নারীর এই ধারণাও পাল্টাতে হবে। কেননা, কর্মজগতে কাজ করা নারীদের এই ধারণার কারণে আমরা বাইরের কাজের পাশাপাশি গৃহস্থালীর কাজ চাপিয়ে দিচ্ছি।

সন্তান লালন-পালন ও গৃহস্থালির যাবতীয় কাজ নারী-পুরুষ উভয়ের। এই কাজকে নারীর কাজ ধরে নিয়ে পুরুষের সহযোগিতার আলাপও নারীর উপর বৈষম্য। বরং পরিবারের কাজ নারী-পুরুষ উভয়ের। উভয়ের অংশগ্রহণে নারীর প্রতি বৈষম্য দূর হবে।

নারী প্রাকৃতিকভাবে পুরুষের চেয়ে ভিন্ন এটা বাস্তব কিন্তু নারী প্রাকৃতিকভাবে দুর্বল নয় বরং সমাজ ও সংস্কৃতি তাকে দুর্বল করেছে। যার অন্যতম মাধ্যম মিডিয়া। বিজ্ঞাপন চিত্র ও মডেল হিসেবে নারীকে বিকৃত ভাবে উপস্থাপন করা হয়। টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনে ছেলেকে সায়েন্টিফিক গল্প ও মেয়েকে ন্যাচারাল গল্প শোনানো হয়। এইভাবে নারীকে মিডিয়া অবলা,দূর্বল বলে উপস্থাপন করে। টিভি উপস্থাপনায় নারীকে দেখা গেলেও প্রতিবেদক হিসেবে কয়জনকে নিয়োগ দেয়া হয় ? যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রাতে কাজ করতে না পারার দোহাই দিয়ে মেয়েদের বাদ দেয়া হয়।

অনেকে মনে করেন, আমাদের মত মুসলিম দেশে পর্দা প্রথার কারণে নারীর মুক্তি মিলছে না। বেগম রোকেয়া বলেছিলেন,’আমরা অন্যায় পর্দা ছাড়িয়া দিয়া আবশ্যকীয় পর্দা রাখিব’। ঘোমটা খুললেই নারী মুক্তি আসবে না। বেগম রোকেয়া ‘অর্ধাঙ্গী’ প্রবন্ধে লিখেন,’পার্সী মহিলাদের পর্দামোচন হইয়াছে সত্য, কিন্তু মানসিক দাসত্বমোচন হয়েছে কি?‘ তিনি নারী মুক্তির জন্য মানসিক মুক্তিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি ’স্ত্রী জাতির অবনতি’ প্রবন্ধে নারী স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য সর্বপ্রথম নারী শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। শিক্ষা বলতে তিনি সেই শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলেছেন যা নারী অধিকার,চেতনা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা জাগ্রত করবে।

 

দেশের প্রথম নারী ট্রেন চালক সালমা খাতুন

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম নারীর সম-অধিকারের প্রশ্নে ঘোষণা করেছেন,’বিশ্বে  যা কিছু সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’। এই যুক্তির পক্ষে নারীর জাগরণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামী হওয়ার আহবানে শ্লোগান তুলেছেন ‘জাগো নারী জাগো নারী বহ্নি শিখা’। জাতীয় কবি আরো বলেছেন,‘কোনো কালে একা হয়নি ক’জয়ী পুরুষের তরবারি, প্রেরণা দিয়েছে দিয়েছে শক্তি দিয়েছে শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষী নারী।’

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ:

২৮(১) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না।

অনুচ্ছেদ: ২৮(২) মতে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সকল স্তরে নারী পুরুষ সমান অধিকার লাভ করবেন । সংবিধানের ধারাসমূহ হতে এটা পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও গণজীবনের কোন স্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার এবং নারীর পূর্ণ মানব মর্যাদা সংক্রান্ত বিষয়ে কোন বিতর্ক থাকতে পারে না। সংবিধান সংরক্ষণ এবং সমুন্নত রাখার শপথগ্রহণ করে যারা রাষ্ট্র ও সরকারী ক্ষমতায় বসেন নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তারা শপথ রক্ষার ব্যর্থতার জন্য অভিযুক্ত হতে পারেন।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। যুদ্ধে পুরুষের মত রনাঙ্গনে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে অনেক নারী। তারামন বিবির মতো বহু মুক্তিযোদ্ধা আছেন। অথচ নারীযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে গুটিকয়েক নারী। দূর্ভাগ্যক্রমে যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে নারীর ধর্ষণের ঘটনা প্রচার লাভ করেছে অনেক বেশি। যেটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর প্রতি বেষম্য দৃষ্টিভঙ্গির বহি:প্রকাশ।

যৌতুক প্রথা এই দেশের নারী মুক্তির পথে আরেকটি বাধা। যৌতুক প্রথা ও নারীর সামাজিক নিরাপত্তা অভাবে কন্যা সন্তান জন্মদানকে এই দেশে সুখবর হিসেবে দেখা হয় না। ইভটিজিংয়ের সামাজিক ব্যাধি নারীর সামজিক অবস্থান তৈরী কে বাধাগস্ত করছে। তবে যুগে যুগে নারী চলার পথে এমন অনেক বাধা ছিল। সতীদাহ প্রথার কথায় ই ভাবতে পারি। ধর্মের দোহাই স্ত্রীকে  স্বামীর   সাথে জ্যান্ত আগুনে জ্বলে নিঃশেষ হতে হত। কিন্তু সমাজ সংস্কারকগণ সে কঠিন পর্যায় থেকে নারীকে মুক্তির পথে নিয়ে এসছেন। বর্তমানে নারীর সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। সংস্কারক হিসেবে কাজ করতে হবে তরুণ প্রজন্মকে । তরুণদের গঠণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নারীর জন্য একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ করবে।

লেখক,শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন
শিক্ষার্থী,জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়