ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। স্বজনদের আর্তনাদে প্রতিদিন ভারি হচ্ছে বাংলার আকাশ। যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, ২০১৭ সালে দেশে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৯৭ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হয়েছে।

অর্থ্যাৎ প্রতিদিন ২০ জন লোক সড়কে প্রাণ হারাচ্ছে। একই সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের হার ২২.২ শতাংশ বেশি ছিল। দুর্ঘটনার হারও ছিল ১৫.৫ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ আমরা আন্দোলন করছি, দাবি জানাচ্ছি কিন্তু সড়কের নিরাপত্তা দিনকে দিন কমছে।

আমাদের কোনও পরিবহন আইন নেই। ড্রাইভার ও পরিবহন শ্রমিকদের কোনও প্রশিক্ষণ বা যোগ্যতার মাপকাঠি নেই।  মন্ত্রী শাজাহান খান একবার বলেছিলেন, গরু-ছাগল চিনলেই ড্রাইভার হওয়া যায়।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ৯ দফার সাথে সংহতি প্রকাশ করে মানবন্ধন করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ছবি- স্বাধীন

একজন চালক কীভাবে সারারাত জেগে দূরপাল্লার বাস চালায়? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেরিতে হলেও ঘোষণা করেছেন, টানা ছয় ঘন্টার বেশি গাড়ি চালানো যাবে না। কিন্তু এই দেশে আইন আছে, পালন নেই। বিচারক আছেন, বিচার নেই।

অনেক ক্ষেত্রেই চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে ড্রাইভারদের নিয়ম বহির্ভূতভাবে রাতের পর রাত বাস চালাতে বাধ্য করে মালিকপক্ষ। তাই তারা অনেকেই রাত জাগতে মাদক নেয়। আর এর ফল দাঁড়ায় সড়ক দূর্ঘটনা।

বাসে করে একজন যাত্রী নিরাপদে গন্তব্যে ফিরবেন কি না এই নিশ্চয়তা নেই। প্রতি ঈদের সময়ই একটা আতঙ্ক নিয়ে বাড়ি যেতে হয়। শুধু ঈদ নয়, বাসে চড়লেই মনে আতঙ্ক বাসা বাঁধে। রাস্তায়-ফুটপাতেও কাটেনা সেই আতঙ্ক।

গত ২১ জুলাই রাতে নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইদুর রহমান পায়েল হানিফ পরিবহনের একটি বাসে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ফিরছিল। জ্যামে আটকে থাকা বাসযাত্রী পায়েল হেলপারকে বলে প্রাকৃতিক কাজ সারতে বাস থেকে নামেন। কিন্তু জ্যাম ছাড়লে তাকে ছাড়াই বাস দ্রুত টান দিলে পায়েলও দেয় দৌড়। বেশ কিছু পথ দৌড়ানোর পরে বাস থামানো হলে বাসের দরজার সাথে জোরে ধাক্কা খায় পায়েল। তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

পায়েলকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে হয়ত সে বেঁচে যেত। অথচ ‘ঝামেলা চুকাতে’ তাকে ব্রিজ থেকে নদীতে ফেলে দেয় বাসের স্টাফরা। দুইদিন পর পুলিশ পায়েলের লাশ নদী থেকে উদ্ধার করে।

এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমরা যেসব বাসে চড়ছি তা কোন ধরনের মানুষ চালাচ্ছে। বাসের যাত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব এর স্টাফদের, কিন্তু সে স্টাফরাই হচ্ছে যাত্রী হন্তারক। কারো কাছে তাদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। তাহলে এদেরকে প্রতিহত করবে কে?

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে গত ২৯ জুলাই ঢাকায় দুই স্কুল শিক্ষার্থীর উপর বাস তুলে দেয় জাবালে নূর পরিবহনের ড্রাইভার। এই ঘটনায় সহপাঠির নির্মম মৃত্যুর বিচার চেয়ে ঘাতক বাস চালকের শাস্তির দাবিতে মাঠে নেমেছে ঢাকার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।

বাস চাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের প্রতিবাদে রামপুরা সেতু এলাকায় সড়ক আটকে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা

আজকের শিশু-কিশোররাই আগামীর বাংলাদেশ। তারা জানে কেন পরিবহন সেক্টরে এই নৈরাজ্য। কিন্তু জানেন না যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছেন।

ঢাকা শহরে অধিকংশ বাস চালকের কোনও লাইসেন্স নেই।

শিক্ষার্থীরা তাই বলছে, এই দেশ আমাদের, এই দেশের আবর্জনা আমাদেরকেই পরিষ্কার করতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখাও, তাছাড়া গাড়ি চালাতে পারবে না। পুলিশ আংকেল, ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই কেন?

এর মধ্যেও আমরা দেখি ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখাতে বলায় এ.কে স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সালের উপর পিকআপ চালিয়ে দেয় ড্রাইভার। পরিবহন সেক্টরে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি চালু রয়েছে, তারই ফল এসব ঘটনা।

এই দেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীকে ক্লাস ফেলে রাজপথে নামতে হচ্ছে। বাস থামিয়ে তাদেরকেই ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করতে হচ্ছে। এটা রাষ্ট্রের জন্য চরম ব্যর্থতা। এটা এই দেশের রাজনীতিবিদ, পলিসি মেকার, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী সবার ব্যর্থতা। স্বাধীনতার ৪৮ বছরের তারা নতুন প্রজন্মকে একটি নিরাপদ সড়ক দিতে পারেনি। নিরাপদ দেশ উপহার দিতে পারেনি।

তবু আশা জেগে উঠে যখন এই আগামীর এই প্রজন্ম আজকে রাজপথে শ্লোগান তোলে- উই ওয়ান্ট জাস্টিস। তবে তোমাকে আসতেই হবে  ‘জাস্টিস’। কারণ, জেনারেশন নকিং অ্যাট দ্য ডোর।