ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ধর্ম নিয়ে লিখতে বসছি, কেন লিখতে বসছি জানি না। আগে নিজের ভিউ টুক ক্লিয়ার করা যাক। ধর্ম নিয়ে কপচানো আমার খুব খুব অপছন্দের একটা বিষয়। আমি নিজেও ধর্ম ব্যাপারটা খুব একটা বুঝি না, এর উপর নির্ভর করা লোকজনও আমার খুব একটা পছন্দ না। যেমন কেউ যদি নামাজ পরে তাকে দেখতে ভালো লাগে, কিন্ত কেউ যদি সারাদিন কানের সামনে ঘ্যানর ঘ্যানর করতে থাকে “আল্লাহ!! ছি!!! নামাজ পড়ো না, তুমি তো নাস্তিক, তোমার সাথে কথা বলা পাপ” এই সব জিনিস আমার বরাবরই অপছন্দ।

অপছন্দের পিছনে শক্ত যুক্তিও আছে। শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি, আমি আমার ছোট্ট জীবনে যত জন অতি ধর্মভীরু মানুষ দেখছি তাদের সবার দোষ ছিল প্রায় মহাকাব্য লেভেলের। এক ভদ্রলোক (আসলে অভদ্র) ছিল পরিচিত (সংগত কারণেই নাম প্রকাশ করলাম না), উনি ধর্ম নিয়ে যতটা বাড়াবাড়ি করত আর কাউকে দেখি নাই; অনেক বড় হয়ে একদিন শুনলাম রেপ কেসে জড়ায় গেলেন, সেই কেস প্রমাণ হইল, তার জেল হইল।

একদম জানে জিগার টাইপ আত্নীয় একজন নানান জায়গায় ধর্মীয় সবক দিয়ে বেড়ান, উনি প্রেমিকা সহ ধরা খাইলেন এক হোটেলে। সব ফ্যামিলিতেই কমবেশি পাওয়া যায় এগুলা। তাই বলে ধর্মের দোষ না, এরা আসলে টিপিক্যাল বাঙালি টাইপ যারা সবক দিতে খুব ভালোবাসেন কিন্ত নিজের বেলায় মানেন না; যেহেতু আমরা একটা মানুষকে আলাদা আলাদা ভাবে দেখি না, বরং সামষ্টিক ভাবে দেখি তাই শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে ব্যাপারটা দাঁড়ায় “এই ব্যাটা কাঠমোল্লা, এই ব্যাটা ভন্ড, ধর্ম তার ভন্ডামির সাব্জেক্ট”; কেউ কেউ আগ বাড়ায় বলে বসেন ধর্মটাই আসলে ভন্ডামি।

অনেক দিন আগে আমার শহরের সবচেয়ে বড় মসজিদের ইমামের সাথে কথা, ভদ্রলোক এর পড়ালেখার জ্ঞান মাশাল্লাহ ভালো। হাদিস কোরানের ভালো ব্যাখ্যা দেন, কেউ তার কাছে গেলে কথা বলে মুগ্ধ করেন। কথায় কথায় উনি বলে বসলেন যে ইসলাম ধর্মের মূল বিষয় হচ্ছে পশ্চিম দিকে মুখ করে নামাজ পড়া। ঘাড় ত্যারামি যেহেতু আমার সারাজীবনের পছন্দের বিষয়, আমি বলে ফেললাম হুজুর ভুল তো বললেন, আমরা না হয় পশ্চিম দিকে নামাজ পড়ি কিন্ত সব দেশে তাই করতে হবে তা তো না। (আমার বলার কারণ ছিল যারা উত্তর-দক্ষিণ-পূর্বে থাকে তাদের জন্য কাবাও ঘুরতে থাকবে, যেহেতু কাবা কন্সট্যান্ট একটা জায়গায় থাকে তাই সবার জন্য কাবা পশ্চিমে না)। হুজুর এই কথা শুনে আমার দিকে তাকায় থাকলেন এরপর বললেন তুমি তো পুরাই নাস্তিক হয়ে গেছ, এইগুলা কি বললা, তওবা করো, আল্লাহ জাহান্নামে পুড়ায় মারবে নাইলে। এই হইল কারো কারো জ্ঞান এর দৌড়। যে এই দুনিয়া সৃষ্টির সব জানে, মৃত্যুর পর আমাকে কিভাবে পুড়ায় মারা হবে তা জানে তার কেন সামান্য ভূগোল জ্ঞান থাকবে না সেই জিনিস নিয়েই আমার সমস্যা।

সবাইকে সব জানতে হবে জিনিসটা তা না, কিন্ত যেটা আমি জানিনা তা নিয়ে কেন শুধু শুধু আরেক জনকে ভয় দেখানো? কোন কিছুকে মনে রাখতে হইলে ভালোবাসতে হয়। একটা ছেলে একটা মেয়ের প্রেমে যখন হাবুডুবু টাইপ খায় তখন সে ভালোবাসে, ওই মেয়েকে ভয় পায় এমন না। ধর্ম যদি করতেই হয় ভালোবেসে করেন, বুঝান যে ধর্ম হচ্ছে সূত্রের মত কি করলে কি হবে সব লেখা, ওই রকম ভাবে চলো দেখবা মিলে গেছে। কিন্ত আমরা তা করি না, আমরা অযথা ভয় দেখাই, নামাজ না পড়লে আগুনে, কাউরে নিয়ে খারাপ কিছু বললে মরা ভাইয়ের মাংস খাও ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত ভয় পাইতে পাইতে সবাই ধর্মকেই ভয় পাওয়া শুরু করে। ফলাফল এক গ্রুপ দোষ দেয় ধর্মের, আরেক গ্রুপ নাস্তিকতার। আজকে থেকে তাই ভাবছি কিছু জিনিস লিখে যাবো, যা জানি লিখে যাবো; অজ্ঞ হয়া কাউরে বিশ্বাস করে ধুম কইরে মইরে যাওয়ায় কোন আনন্দ নাই। বরং সত্যিটা জানা, কোন কিছুর পেছনের কারণ জানা, সবাইকে জানানোর চেষ্টা করাটাই সব। এই পোস্টের উদ্দেশ্য কোন ভাবেই কাউকে জ্ঞান দেওয়া না বরং আজকে যা ভাবতেছি, যেই যুক্তি মাথায় আসে আজকে থেকে অনেক বছর পরেও ঠিক সেই চিন্তাই থাকে কিনা তা দেখা।

আমার জীবনের একটা সময় পর্যন্ত শোনা সবচেয়ে কনফিউজিং লাইন ছিল “আমি তোমাদের ভাগ্য তোমাদের গলায় হারের মত ঝুলাইয়া দিয়াছি” (সূরা – বনী ইসরায়েল, আয়াত ৭১-৭৩)

এখন এই লাইনটা শোনার পরে আপনি দুইটা কাজ করতে পারেন; এই লাইনের অর্থ কি সেইটা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন অথবা চুপচাপ বিশ্বাস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে পারেন যে আমার কপাল তো আগেই লেখা তাহলে আর কিছু করে লাভ কি? কেউ কেউ খোঁচা দিয়ে প্রশ্ন করেন (টিটকারি মারেন আসলে); আল্লাহ তো সব ই জানেন, ভাগ্যও আগেই লেখা আছে তাইলে কে জান্নাতে যাবে কে জাহান্নামে সেইটার জন্য দুনিয়াতে পাঠাইতে হবে ক্যান? শাস্তি কারে কি দিবে তা তো আগের থেকেই রেডি। সবই ভাগ্যে আছে।

এই লাইনটার পিছনে চমৎকার একটা ব্যাখ্যা আছে, সেইটা হইল আমাদের ভাগ্য আগের থেকে ঠিক করা থাকলেও আমাদের কর্ম আগের থেকে ঠিক করা না, আমাদের শাস্তি হবে কর্মফলের ভিত্তিতে।

“যখন সময় আসবে তখন অবশ্যই তোমার প্রতিপালক তাদের সবাইকে তার কর্মফল পুরোপুরিভাবে দেবেন। তারা যা করে, নিশ্চয়ই তিনি সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।” (সুরা : হুদ, আয়াত : ১১১)

ধর্মে কোথাও লেখা নাই আমাদের শাস্তি হবে ভাগ্যের উপর, স্পষ্ট করে বরং বলে দেয়া আছে কর্মফলের উপর।

ধরা যাক আজকে ১৯ অক্টোবর ২০১৭, আমার ভাগ্যে লেখা আছে ২২ অক্টোবর ২০১৭ তে আমি ১০০০ টাকা পাব। এইটা আমার ভাগ্য। এখন সেই টাকাটা আমি কিভাবে পাইতে পারি? আমি পরিশ্রম করলাম একটু, সেইটার জন্য ১০০০ টাকাও পাইতে পারি অথবা মার ব্যাগ থেকে ১০০০ টাকাও মাইরে দিতে পারি। দুই জায়গাতেই আমি ১০০০ টাকার মালিক, কিন্ত একটা ভুয়া রাস্তা আরেকটা ঠিক ঠাক। পুরা দুনিয়াই আসলে এভাবে কাজ করে। সবাই তার ভাগ্যের হাতেই আটকা, কিন্ত কেউ কেউ সেই ভাগ্যের কাছে যায় ভুল পথে কেউবা ঠিক পথে। যারা ঠিক পথে যায় তাদের একটু কষ্ট করতে হয়, অনেকটুক সময় লাগে বলে ধৈর্যও ধরতে হয়। এ প্রসঙ্গে আবার লেখা আছে –

“নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন”। (সূরা বাক্বারাহ, আয়াত ১৫৩)

সূরা ইমরানের এক জায়গায় লেখা আছে-

“ওহে মু’মিনগণ! ধৈর্য ধারণ কর।”

এর মানে কি? মানে হইল আল্লাহ সঠিক পথটাই দেখাচ্ছেন, তার জন্য ধৈর্যও ধরতে বলতেছেন। পরের জনম কি আসলেই আছে? কি হবে সেইখানেয় এইগুলা খুব হাইপোথিটিকাল চিন্তা; কিন্ত এতটুকু বলা যায় আপনি যদি কিছু না করেন তাহলে শুধু শুধু ভাগ্যের দোষ দিয়ে লাভ নাই; আপনার গলায় ভাগ্যের হার পড়ায় দেয়া মানে আপনার রিযিক ঠিক করে দেয়া, কিন্ত সেই রিযিক কিভাবে আনবেন সেইটা ঠিক করে দেয়া না। যারা বলে আমার ভাগ্য, রিযিক, রিযিকের পথ সব আমার জন্মের আগেই ঠিক করে দেয়া সেগুলা স্রেফ কুযুক্তি। এমন কথা কখনোই বলা হয় নাই।

ধর্মটা অনেকটা ম্যাথের মত, আপনি একদম সূত্রমত কাজ করে উত্তর মিলাইতে পারেন অথবা কারো থেকে উত্তর দেখে ভিতরে আজগুবি সব করে উত্তর মিলায় ফেলতে পারেন। এইটা আপনার ব্যাপার; কিন্ত আজগুবি ভাবে উত্তর মিলায়ে আপনি অন্য কাউরে বলবেন “ইস সি উত্তর পারস না, দ্যাখ আমার উত্তর মিলছে” সেইটা ঠিক না। আপনি হয়তো আরেকজনের কাছে আপাতত বড় হইলেন কিন্ত নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাবেন।

আরেকটা কথা, একটা খুব সোজা অংক ক্যালকুলাসের মত কঠিন করেও মিলানো যায় অথবা জ্যামিতি দিয়ে সহজ ভাবে। একটা জিনিসের অনেক পথ থাকে, সবার পথ এক রকম হতেই হবে তা না। নিজের রাস্তা সঠিক হওয়া মানেই আরেকজনের রাস্তা বেঠিক হওয়া তা-ও না। আমাদের অতি ধর্ম ভীরুরা এই কথাটা যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন ততই বোধহয় মঙ্গল।

যুক্তির জয় হোক, বিজ্ঞান থেকে ধর্ম সব জায়গায়…