ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমি তখন ক্লাস থ্রী তে পড়ি, বাসায় আমাকে নিয়ে বিশাল বিচার। মূল বিচারক দুইজন – বাবা আর দাদু, আর অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে কতক্ষন বাবাকে সান্ত্বনা দেয়া আর কতক্ষন আমার দিকে তাকায় তাকায় মুখ টিপে হাসার অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছেন মা। বিচার বসার কারন ভয়াবহ, বাসায় অনেক মেহমান আসবে এই উপলক্ষে যত প্লেট ছিল সব নামানো ছিল, আমি রোনালডোর মত ফুটবল খেলতে যেয়ে একসাথে ২৭ টা প্লেট ভেঙ্গে ফেলছি। ওই যুগে প্লাস্টিকের প্লেট বলতে কোন জিনিসের বালাই নাই, আর যার বাসায় যত সুন্দর প্লেট-কাপ-পিরিচ তার বাসা তত সুন্দর। এখন আমাদের বাসায় ২৭ টা ভাঙ্গা প্লেট, বাবার হতাশ হওয়ার মূল কারন এইটাই। আমি যেহেতু জীবনেও কখনো মাইর খাই নি তাই ওইটুক সাহস আছে যে আজকেও যেভাবেই হোক বেঁচে যাব। বড়জোর ‘সরি’ বলতে হবে। ছোটবেলা থেকেই কোথায় কোনটা বলতে হয় খুব ভালো বুঝতাম, এই জন্য অপেক্ষা করতেছি, ঠিক মুহুর্তে ‘সরি’ বলতে পারলেই সব শেষ।

বাবা বলল ‘কাছে আসো’, ততক্ষনে আমার কলিজার পানি শুকায় সেইখানে ধু ধু মরুভূমি। হাত ধরে বলল “তুমি কি জানো তোমার একটা বোন হবে? তুমি যে এত দুষ্ট, এমন করলে তো সমস্যা”; আমি মনে মনে আশার আলো পাই। যতই ভাব দেখাই যে বোন পেয়ে আমি অনেক খুশি, যতই আনন্দের সাথে বোনের জন্য মা’র সাথে শপিং করতে যাই, কিন্ত ভিতরে ভিতরে বিরক্ত। স্কুল লাইফের প্রথম বন্ধুর নাম শুভাশিস, সে ক্লাসে আসত তার ছোট ভাইয়ের খামচির দাগ নিয়ে, আবার বাসায় ফেরার পর সেই খামচির দাগ হয় আরো বাড়ত নাহয় গাড়ো হত। ৬ টাকা দিয়ে রোল কেক খেতাম আর ১২ টাকায় বার্গার, নতুন কেউ আসা মানে সব দুই ভাগ হওয়া, ওই ছোট বয়সেই সম্পত্তির ভাগ দেয়ার কোন ইচ্ছাই আমার ছিল না। যাই হোক যেহেতু বাবা বলে ফেলছে দুষ্টামি করলে বোন আসা বন্ধ এই জন্য আমি জ্যামিতিক হারে দুষ্টামি বাড়ায় দিলাম। একদিন টিভির ট্রলি ভাঙ্গি, তো পরের দিন মা’র ঘড়ি কেউ খুঁজে পায় না। নিজের কাজে আমি নিজেই গর্বিত, এবং পুরোপুরি শিওর যে বোন আর আসতেছে না।

দিন যায়, মাস যায়; একদিন আমার সব আশা ভরসা শেষ হয়ে যায়। স্কুল থেকে বাসায় এসে শুনি আমার ফুটফুটে একটা বোন আসছে, সে নাকি এতই সুন্দর যে পরী টরী সব ফেইল। প্রথমে দেখার কোন ইচ্ছাই ছিল না, সবাই আনন্দে চিল্লাচিল্লি করতেছে এই জন্য বাধ্য হয়ে কাছে গেলাম, যেয়ে দেখি লাল টকটকে একটা পিচ্চি চাইনিজদের মত পিটির পিটির করে তাকায় আছে। বড় খালা পাশে ছিল, বলল “নাও নাও ধরো”, ছোট বোনটাকে সেই প্রথম কোলে নেয়া। কোন পিচ্চি যে এতটা সুন্দর হইতে পারে সেই প্রথম একদম সামনা সামনি দেখা। একটু হাসল, আর আমার পিচ্চি কালের সেই অশান্ত মন একদম হালকা হয়ে গেল, আমি অনেক আনন্দে ‘হাউ মাউ’ করে বিশাল চিৎকার দিলাম, আর পিচ্চির কি সেই কান্না।

পিচ্চি হয়ে গেল খেলনার মত, এর হাতে আমি ছোট্ট একটা ব্যাটারি দেই, সেই ব্যাটারি সহ হাত পরে যায়; সেই খেলার আনন্দ যে কি সেইটা তো কাউকে বলে বুঝানো যায় না। এই খেলনার সাথে খেলতে খেলতেই হঠাৎ একদিন দেখলাম সে উঠে বসল। তারপর একদিন হাটা শুরু করল। তার জন্য আমি স্কুলে দফায় দফায় মাইর খাওয়া শুরু করলাম। মাইর খাওয়ার কারন হল – স্কুলওয়ার্ক খাতায় আমার যতটুক লেখা থাকে তার চেয়ে কয়েক গুন বেশি থাকে এর বিমুর্ত শিল্প। ও মা কে ডেকে বলে “আমি লিকি (লিখি) মা?” মা আদর করে বলে “আচ্ছা মা”; ব্যাস সেই খাতার সব পেজ এর দফারফা হয়ে যায়।

তার বয়স যখন চার বা পাঁচ, তখন দেখি বাংলা সিনেমার উপর তার প্রবল আকর্ষন; শাবানা জসিমকে জড়ায় ধরে কাঁদে সাথে সাথে সে ও কাঁদে; শাবনুর সালমান শাহর বুকে লাফ দিয়ে পড়ে আর সে দেখি আনন্দে ‘ইয়েস’ বলে; আমি তো মহা বিরক্ত। বাসার সবচেয়ে ছোট সদস্য, তাই সবাই তার পক্ষে, কোন খেলা দেখা যায় না, টিভি দেখা যায় না; কিছু বললেই বলে “আমার তিভি”; এভাবেই দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়; একদিন দেখি গানের উপর তার বিশাল টান। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়ায় দাঁড়ায় গাইতেছে “ও রে শয়তানের মাইয়া, আমায় দে রে দে ছাড়িয়া”; ওই বয়সে সাম্পানের নাইয়া কি জিনিস সেইটা বোঝা হয় নাই বলেই ‘সাম্পানের নাইয়া’ কিভাবে কিভাবে যেন ‘শয়তানের মাইয়া’ হয়ে গেছে। আমার পুরা পরিবার তার এই সব প্রতিভায় মুগ্ধ। বাবার ধারনা সে বিশাল কিছু হয়ে যাবে একসময়।

তাকে প্রথমবার নিয়ে যাওয়া হইল স্কুলে পরীক্ষা দিতে, আসল “ত্রী” দিয়ে ৫ টি শব্দ লিখ। সে পারে দুইটা, কিন্ত প্রতিভাধরেরা তো আর কোন কিছুতে আটকায় থাকে না, সেও প্রতিভার ব্যবহার করে আসল। তার লেখা পাঁচটা শব্দ ছিল – নেত্রী, পাত্রী, কেত্রী, মেত্রী, গেত্রী। মা হাসতে হাসতে গড়ায় পরে আর জিজ্ঞেস করে “মা এই কেত্রী মেত্রীর মানে কি?” সে খুব গম্ভীর হয়ে উত্তর দেয় “অর্থ আছে, তুমি বুঝবা না”

কেত্রী মেত্রীর অর্থ জানা এই পিচ্চি এখন কলেজে পড়ে; চোখের সামনে দিয়ে এর হাতে মাইর খেতে খেতে আমি বড় হইছি, আর কয়দিন পর তার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা; আজকে সকালে সে যখন কলেজে টেস্ট পরীক্ষা দিতে যায় তারে জিজ্ঞেস করি “এই ফাজিল, পড়সিশ কিছু?” সে মুখ ঝামটা দিয়ে বলে যায় “তোরা আমার লাইফটারে হেল বানায় ফেলসিশ”; মা আবার হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে “মা কিভাবে হেল হইল?” সে বলে “মা দেখো তুমি বুঝবা না, চুপ থাকো তো”

আমরা সবাই চুপ থাকি আর ও বকবক করতেই থাকে। আলতু ফালতু বকবক গুলোও মাঝে মাঝে কতই না সুন্দর হয়…

জীবন অনেক সুন্দর, আশেপাশের হাজারটা হতাশার মধ্যেও জীবন অনেক বেশি সুন্দর, সেই সুন্দর টুক অ্যান্ড্রয়েড বা আইফোনের স্ক্রীনে পাওয়া যায় না; ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ বা স্ন্যাপ চ্যাটে পাওয়া যায় না। সেই সুন্দর টুক ধরার জন্য একটু কষ্ট করে স্ক্রীন থেকে মুখটা তুলতে হয়, আশপাশে একটু তাকাতে হয়; সেই তাকানোতেই এখন আমাদের কত আপত্তি…