ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 
02_Aparajeyo+Bangla_0004

 

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড এর সেকালের গল্প বলি…

সেদিন ১৯৭১ সাল, ২৫ মার্চ রাত, চারদিকে থমথমে অবস্থা; এক কান দুই কান হয়ে কথা পৌঁছায় গেল- পাকিস্তানী আর্মি রাস্তায় নেমে গেছে, যারে হাতের কাছে পাচ্ছে তাদের হয় ট্যাংক দিয়ে পিষে মেরে ফেলছে নাহয় গুলি দিয়ে ঝাঁঝরা করে ফেলছে। অধ্যাপক ফজলুর রহমান তখন তার নীলক্ষেতের বাসভবনে। তার মন ভালো, আজকে তার বাসায় মেহমান। হঠাৎ তার ঘরের দরজায় খুব জোরে কড়া নাড়ার শব্দ, ফজলুর স্যার বিরক্ত হলেন। মনে মনে ভাবলেন এত রাতে তার বাসায় কোন স্টুডেন্ট আসার কথা না, তবুও কে? আর এত জোরে নক ই বা কে করে? সে সময়ের খুব বিখ্যাত এই স্যার দরজা খুলে দিলেন; মুহুর্তের মধ্যে পাকিস্তানি আর্মি তার উপর ব্রাশ ফায়ার করল, দুই আত্নীয়সহ ভদ্রলোক মারা গেলেন।

আচ্ছা এই গল্প আরেকদিন, আরেকজনের গল্প বলি। নীলক্ষেত থেকে পাঁচ মিনিট হাটলেই ফুলার রোডে সোশ্যাল সায়েন্স এর নোকি স্যার এর বাসা। স্যার বিখ্যাত লোক; ২৫ মার্চ রাতে যখন তার বাসায় আর্মি আসল তখন কমান্ডিং অফিসার চোখ নামিয়ে রেখেছিল, ভয়ে হোক বা শ্রদ্ধায় আর্মির সেই অফিসার তার গায়ে হাত দিতেও সাহস করে নাই। আর্মির উপর কড়া নির্দেশ ছিল একজনকেও বাঁচায় রাখা যাবে না। নোকি স্যারকে মারতে পারে নাই তো কি? কাউকে তো মারতে হবে, নোকি স্যার এর ঝাল তারা ঝাড়ল মুক্তাদির স্যার এর উপরে। ভূতত্ত্ব বিভাগের সবার প্রিয় মুক্তাদির স্যার ব্রাশফায়ারে মারা গেলেন গভীর রাতে।

জানেন? জি সি দেব স্যার আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট ছিলেন, উনি এতই বিখ্যাত ছিলেন যে অন্য ডিপার্টমেন্ট এর স্টুডেন্টরা তার ক্লাসে এসে বসে থাকত, মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনত; তো সেই প্রভোস্ট স্যারকে পাকিস্তানি আর্মিরা রাস্তার উপর ধরে আনল, তারপর বলা নাই কওয়া নাই, ফায়ার…

এবার প্রাচ্যের অক্সফোর্ড এর একালের গল্প বলি…

২০১৭ সাল, নভেম্বর মাস; টি.এস.সি তে ঢাকা ইউনিভার্সিটির টিচার দের সভা। আগেকার আমলে শিক্ষক বললে বুঝা যেত উনি ‘শিক্ষক’। এখন শিক্ষক বলার সাথে সাথে বলতে হয় তিনি কোন কালারের শিক্ষক; নীল, লাল,হলুদ, সবুজ ইত্যাদি ইত্যাদি। সময়ের সাথে সাথে রং পরিবর্তন হয়। রং জানার পর বোঝা যায় কার এখন কতটুক ক্ষমতা। তো নীল দলের এমনি এক সভায় কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে একজন প্রক্টর আক্রমন করেন আরেকজন অধ্যাপকের উপর। প্রথমে প্রক্টর ওই অধ্যাপক কে লাথি মেরে ফেলে দেন, এরপর লাথি খেয়ে উনি দাঁড়াতে চাইলে ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান ওনাকে আবার ধাক্কা দেন। ধাক্কাধাক্কির শেষ হয় কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট এর একজন প্রফেসরের বীরত্বে। উনি ঘুষি দিয়ে সেই অধ্যাপকের নাক ভেঙে ফেলেন…

১৯৭১ সালে আমরা পরাধীন ছিলাম, সে সময়ে আমাদের ইউনিভার্সিটির টিচাররা জীবন দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিছিলেন; ২০১৭ সালে তাদের পরের প্রজন্মের টিচাররা স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার করতেছেন লাথি দিয়ে, নাক ফাটিয়ে। আমাদের জন্য এগুলা কত বড় লজ্জা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটা শিক্ষার্থী তা জানে, শুধু জানেননা আমাদের মহান স্যাররা। তারা একদল নীল, একদল সাদা; নীল দলের মধ্যে আবার কয়জন উপাচার্য পক্ষ, কয়জন উপাচার্য বিরোধী পক্ষ। তারা আগে মুখে মুখে ঝগড়া করতেন, আজকে থেকে হাত উঠানোর চলও শুরু করলেন।

যে বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যেন বোসের মত গবেষক শিক্ষক ছিলেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার আর প্রফেসররা এখন কেউ কেউ চুরি করে গবেষণাপত্র ছাপান। শিকাগো জার্নালের সম্পাদক চিঠি পাঠান যে তোমার ইউনিভার্সিটির ওই টিচার এর গবেষণা চুরি করা। কোন কোন অধ্যাপকের পিএইচডি থিসিস বাতিল হয়ে যায় কারণ তার পুরা গবেষনাই ভুয়া, তিনি অন্য কারোটা মেরে দিছেন। কিন্ত তাদের কোন শাস্তি হয় না, তাদের ডেকে বকা দেয়ার মতও কেউ নাই। কিন্ত যখন ক্ষমতার কথা আসে তখন ওনারা এক একজন রীতিমত নায়ক। একজন আরেক জনকে লাথি মারেন, নাক ফাটান।

আমাদের স্যার ম্যাডামরা আমাদের বাবা-মা’র মত। বাবা মা যখন মারামারি করে, চুরি করে তখন তার সন্তান কি হবে? হয় গুন্ডা নাহয় চোর। আমরা তাই হইতেছি আস্তে আস্তে… অথচ আমরা চোখে অনেক স্বপ্ন নিয়ে আসছিলাম; বড় হওয়ার স্বপ্ন, বড় মানুষ হওয়ার স্বপ্ন…

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নাকি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হত; ফোর্ড গাড়ির মত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সবার আগে ছুটত গবেষণা, নেতৃত্ব সব কিছুতে। সেই দিন হয়তো খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে, এখন আমরা শুধুই ‘অক্স’, যারা শিং দিয়ে একে অন্যের সাথে মারামারি করি। ছেলে-মেয়েরা মারামারি করলে কান ম’লে দেয়া যায়; বাবা-মা’রা মারামারি করলে তা অনেক কষ্ট নিয়ে দেখা ছাড়া আর কিই-বা করার থাকে?