ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

দেশে দেশে যারা অযথা ঘুরে বেড়ায় তাদের বলে ‘যাযাবর’, ওই হিসেব করলে আমার ট্যাগ দেয়া যেতে পারে ‘চাচাবর’, আমি অযথাই সব চাকরির পরীক্ষা দিয়ে বেড়াই। চাকরি যে পাই না তা না, কিন্ত প্রিলি পরীক্ষা দেয়াটাই হয়ে গেছে নেশা। অ্যাপ্লাই করতে টাকা লাগে না, নানা রকম সকমের প্রশ্ন থাকে তাই বিসিএস এর জন্য হাত মকশো হয়। চান্স পাইলে ‘মা মা আমি চান্স পেয়েছি’ টাইপ লুক নিয়ে বাসায় ঢুকতে ভালো লাগে, আবার চান্স না পাইলে কোন পার্টটা ভালো করে পড়া উচিত সেইটাও মাথায় থাকে। যা ই হোক এরকম ‘চাচাবর’ গিরি করতে করতে চলে আসল বিশাল পরীক্ষা – “৮ ব্যাংকের সমন্বিত পরীক্ষা (সিনিয়র অফিসার)”; এখন বলি কিভাবে দিয়ে আসলাম সেই পরীক্ষা…।

দুইদিন আগে থেকেই ঝামেলা হচ্ছিল পরীক্ষা নিয়ে, আদালতের কোন একটা নির্দেশের কারনে ওনারা একবার বলতেছিলেন ৭০০ পদে পরীক্ষা হবে আবার কেউ কেউ বলছিলেন পরীক্ষাই হবে না। সব কিছুর অবসান ঘটায় পরীক্ষার ঠিক আগের বিকেলে ওনারা ওয়েবসাইটে ঘোষনা দিলেন পরীক্ষা হবে ১৬০০ পোস্টের জন্যই। এর আগে এই পরীক্ষা নিয়ে আরো বড় এক কাহিনী হয়ে গেছে। দুনিয়ার সব পরীক্ষায় পরীক্ষার ঠিক ১০ মিনিট আগেও ওয়েবসাইট থেকে প্রবেশপত্র প্রিন্ট করার ব্যবস্থা থাকলেও কোন এক অদ্ভুত কারনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই সিস্টেম নাই। ওনারা ১০ দিনের জন্য প্রবেশপত্র ছাড়েন, সেই সময়ে প্রবেশপত্র প্রিন্ট করে রাখতে হয় বা সফট কপি রেখে দিতে হয়, কেউ সেই কপি হারায় ফেললে পরে আর কোন ভাবেই এক্সাম দেয়ার সিস্টেম নাই। (এতটা কঠোর হওয়া অমানবিক, হলের এক বড় ভাই তার সব অ্যাডমিটের সফট কপি রাখছেন তার পিসিতে, সেই পিসির হার্ডড্রাইভ ক্র্যাশ করায় উনি গত তিন মাসের কোন ব্যাংক পরীক্ষা দিতে পারেন নাই, অথচ উনি অসাধারন টাইপ ক্যান্ডিডেট); যাই হোক প্রবেশপত্রের এই কাটায় পরে ১ লক্ষ ৪০ হাজার ছেলেমেয়ে পরীক্ষাই দিতে পারল না। বাকি ১ লক্ষ ৭০ হাজারের মধ্যে আমি একজন।

প্রথমে সেন্টারে ঢোকার গল্প বলি। এই সব পরীক্ষার প্রবেশপত্রের নিচে খুব সুন্দর করে লেখা থাকে কোন ভাবেই সেন্টারে মোবাইল নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না, ব্যাগ বই খাতা তো দূরে থাক। সেদিন ঢোকার সময় দেখলাম কারো কারো কাছে বিরাট ব্যাগ, মোবাইল; অনেকে ‘জব সল্যুশন’ নামের ইয়া মোটা বই নিয়েও ঢুকতেছেন, সামনে দাঁড়ানো কেউ কিছু বলার নাই, চেক করার নাই। গার্ড টাইপ একজনকে হেসেই বললাম “আজকে যে সব নিয়ে ঢুকতে দেন, কাহিনী কী ভাই?” উনি ত্যাছড়া করে তাকায় বললেন “আপনার সমস্যা আছে? পরীক্ষা দিতে আসছেন দেন, এত কথা জিজ্ঞেস করেন কেন?”

সঙ্গত কারনেই পরীক্ষার সেন্টার, রুম নাম্বার বললাম না। পরীক্ষার রুমে ঢুকে দেখি মুরগির খোয়াড় টাইপ একটা রুম। মোট ৩০-৩৫ টা বেঞ্চ যার এক একটাতে বড়জোর দুইজন বসা যায় (বিসিএস পরীক্ষায় এমন এক বেঞ্চে একজন করে বসছি)। ৩৫টা বেঞ্চে সেই হিসেবে হবে ৭০ জন, কিন্ত রুমের সামনে বড় করে যে রোল সিরিয়াল দেয়া তাতে লেখা এই রুমে বসবে ১৯০ জন!! এত অবিশ্বাস্য ব্যাপার আমি আমার চাকরি পরীক্ষার জীবনে আর দেখি নাই। আরো যত পরীক্ষা দিছি সবজায়গায় বেঞ্চে লেখা ছিল কোন রোল কোথায় বসবে, আর এই এক্সাম হলে ঢোকার পরেই টিচার বলে দিছেন যেখানে ইচ্ছা বসেন। যাই হোক যেখানে ইচ্ছা সেখানে বসে পরীক্ষা শুরু হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

তখন পরীক্ষার আর ১ মিনিট, হলে তখনো প্রশ্ন আসে নাই, ওএমআর আসে নাই। অথচ ওএমআর দেয়ার কথা ৫ মিনিট আগে। ৩.৩০ বাজার আরো ৫ মিনিট পর ওএমআরসহ প্রশ্ন আসল। যারা এইসব পরীক্ষা ফেস করেন বা করেছেন তারা খুব ভালো করে জানেন এই সব পরীক্ষায় পরিক্ষার্থী মিনিটের হিসেব করে না, করে সেকেন্ডের হিসাব। ১০ সেকেন্ডের জন্য আপনি চান্স পেতে পারেন বা বাদ পড়তে পারেন, সেইখানে আমরা পরীক্ষা শুরুই করলাম ৮/৯ মিনিট পর।

প্রশ্ন দেয়ার সময় আবার আরেক কাহিনী। গার্ড ম্যাডাম এই রুমে একা, উনি এতগুলা প্রশ্ন সাজাইতেই পারতেছেন না সেট অনুসারে। ততক্ষনে পুরা রুম ভর্তি। ১৯০ জন আসে নাই, আসছে মাত্র ৭৯ জন এবং তাতেই ৩ জন বসতে পারতেছেন না। দুইজনকে বসানো হল অন্য দুইটা বেঞ্চে অনেক জোর করে, আর বাকি একজনকে বসানো হল গার্ড যেই চেয়ারে বসার কথা, সেখানে। এইবার প্রশ্ন বিতড়নের পালা, আগেই বললাম যে প্রশ্নের সেট সাজানো নিয়ে ভদ্রমহিলা ঝামেলায় পড়ছেন। ওনার দোষ ও দেই না, কারো পক্ষেই ওই ৩-৪ মিনিটে এত হাউকাউ এর মাঝে প্রশ্ন সাজিয়ে বিতড়ন সম্ভব না। প্রশ্ন একটা নরমাল ফটোকপি। ফটোকপি মেশিনের কালি শেষ পর্যায়ে থাকলে যেমন হয় অমন প্রিন্ট। (আমি একটা ম্যাথ দিতেই পারি নাই, কারন প্রশ্নে ছিল ১.০০১, সেই দশমিকের ফোটাই প্রশ্নে ছিল না), প্রশ্নের উপর স্পষ্ট করা নাই যে নেগেটিভ মার্কিং আছে কি নাই, পরের পেজের এক পাশ প্রিন্ট হয় নাই তাই প্রশ্ন নাম্বার ৫৭, ৫৮, ৫৯ এইগুলাকে দেখা যাচ্ছে প্রশ্ন নাম্বার ৭, ৮, ৯। এমনেই ১০ মিনিট পরে পরীক্ষা শুরুর টেনশন, এর মধ্যে এইসব সমস্যা যে কি বিশাল প্রবলেম ক্রিয়েট করে তা শুধু এইসব পরীক্ষা দেয়া মানুষরাই জানেন।

যাই হোক এক্সাম শুরু হয়ে গেল, সবাই সবাইকে জিজ্ঞেস করতেছে এন্সার কোনটা কী? আমি যে জিজ্ঞেস করি নাই তা না। এই রকম এক্সাম দিলে সবার এক্সামই ভালো হয়। আমার পাশের ভাই করলেন আরো এক কাহিনী, পেছনের জনকে বললেন আমার প্রশ্ন আপনি নেন আর আপনারটা আমি নেই। এইভাবে আমাদের পাশাপাশি সিটে সেট পড়ল A A, আর  C C হলো পেছনের সিটে। পাশের বান্দা ভাইজান বুকে হাত দিয়েও বলতে পারবে না উনি দুই তিনটা প্রশ্ন নিজে থেকে দিছেন। আমার খাতা পুরাটা কপি, আমি যখন ম্যাথ করতাম উনি দাঁত খুটতেন, ম্যাথ সল্ভ করার পর দাগানোর সময় উনি দেখে দাগায় দিতেন। বিসিএস পরীক্ষা হলে আমরা চারজনই বহিস্কার হইতাম সেইটা আমি বাজি ধরতে পারি, কিন্ত এই পরীক্ষায় এই হিসাব না। গার্ড ম্যাডাম সাইন করতে এসে কার কি সেট চেক করেন নাই, এমনকি অ্যাডমিট কার্ডটাও দেখতে যান নাই, কোন রকম একটা সাইন দিয়ে চলে গেছেন। উনিও যে অতিষ্ট ওনার ভাবসাবেই বুঝা যাচ্ছিল।

ঠিক পাশের রো তে চলে অন্য কাহিনী, সবাই মোবাইল নিয়েই বসছিলেন যার যার সাথে; অতি সাহসী এক আপু পরীক্ষা চলার সময়েই তার মোবাইল খুলে ডিকশনারিতে দেখলাম ইংলিশ ওয়ার্ড মিনিং চেক করতেছেন (ডিকশনারিই খুলছেন এত শিওর হয়ে বলতেছি কারন ওই সেম অ্যাপ আমিও ইউজ করি)। মেয়েদের যে এত বিশাল সাহস হয় জীবনে আমি প্রথম বার সামনা সামনি দেখলাম। আর গার্ড ম্যাডাম যেহেতু সাইন করতেছেন তখন তারো এত দিকে খেয়াল করার টাইম নাই। একজন পাশের সবাইকে নিয়ে হাসতেছেন কারন উনি একটা জেনারেল নলেজের প্রশ্ন গুগলে সার্চ দিছেন, সেই উত্তর গুগলেও পান নাই। যেই উত্তর গুগলে নাই সেই উত্তর মাথায় থাকে কিভাবে? জীবনে এই প্রথমবার সাথে একটা মোবাইল না থাকার জন্য ভয়াবহ আফসোস হচ্ছিল।

প্রশ্ন দিতে ৭-৮ মিনিট দেরি করলেও খাতা এরপর যথাসময়ে নেয়া হইল। বের হইলাম, এরপর শুনলাম সব রুমে এক অবস্থা ছিল। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে এক্সাম দিয়েছেন, কেউ কেউ দিয়েছেন মোবাইল খুলে। বের হতে হতে মনে হইল আমাদের সেন্টারেই এই কাহিনী হইছে, বাসায় এসে ফোন দিলাম বন্ধুকে, যার সিট মিরপুরে, সে ধরে বলল তাদের অবস্থা আরো ভয়াবহ, সে মারামারিও করে আসছে।

এতক্ষন তো আমার কাহিনী শুনলেন এইবার বলি বন্ধু আর বড় ভাইদের বয়ানঃ

  • জহুরুল হল হলের এক বড় ভাই এসে বলছিলেন তার সেন্টারে সবাই মোবাইল বেঞ্চে রেখেই পরীক্ষা দিয়েছে। যখন ইচ্ছা মোবাইল দেখে নিয়েছে, কেউ কিছুই বলে নাই।
  • জহুরুল হক হলের আরেক বড় ভাই বলতেছিলেন তাদের এক্সাম শুরু হইছে ৪৫ মিনিট পর, এই ৪৫ মিনিট বসে থাকার সময়ই ওনারা ফেসবুকে প্রশ্ন পেয়েছেন আর যে যা জানে এবং গুগল মিলায় ঝিলায় ওনাদের এক্সাম খুব ভালো হয়েছে।
  • মিরপুরের একটা সেন্টারে জিয়া হলের এক বন্ধুর সিট পড়ছিল, সেইখানে পরীক্ষাই হয় নাই, পোলাপাইন মারামারি করে এসেছে (পরে অবশ্য এই পরীক্ষা ২০ তারিখ আবার নেয়া হবে বলা হয়েছে)

এই হলো আমার পরীক্ষা অভিজ্ঞতা। ব্যাংকার্স কমিটির স্যার বলছেন “দুই একটা জায়গা ছাড়া বাকি সব জায়গায় পরীক্ষা সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়েছে”। উনি স্যার মানুষ উনি বলবেনই। আমরা পরীক্ষা দেই তাই খুব আত্মবিশ্বাসের সাথেই বলতেছি যে স্যার আপনার কথা ভুল, বরং দুই একটা জায়গায় পরীক্ষা সুচারুভাবে হয়েছে এবং বাকি জায়গায় পরীক্ষার জাতও হয় নাই।

প্রশ্ন ফাঁস, নকল এইগুলো দেখতে দেখতে এমনি ক্লান্ত, এখন যদি চাকরির পরীক্ষায় ওনারা আমাদের ঠিক মত বসাতেও না পারেন, ঠিক মত গার্ড দিতে না পারেন, ঠিক মত একটা প্রশ্নপত্র দিতে না পারেন তাহলে আমরা কোথায় যাবো? অথচ সবার চোখেই স্বপ্ন ভালো একটা চাকরির। সেদিনের পরীক্ষার রেজাল্ট ম্যানুয়ালি চেক করেন, দেখবেন কোন সেন্টারে সবাই চান্স পাবে আবার কোন সেন্টারে হাতে গোনা কয়জন। খাতা দেখা হবে কম্পিউটারে, কম্পিউটার সততা বোঝে না, কে মোবাইল দেখে পরীক্ষা দিছে বা কে দেয় নাই তা বুঝে না। কম্পিউটার বুঝে শুধু নাম্বার। তাই যে মোবাইল দেখে ৮০ পাবে কম্পিউটার তাকেই রাখবে আর যে সত্যিই ভালো, ৬০ পাবে একদম পিওর, তাকেই হয়তো বাদ দেয়া হবে।

এইভাবে একটা দেশ কতটুক আগায় আমার জানা নাই। শুনলাম এই পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে, বাতিল হবে কি না হবে তা নিয়েও আমার অত আগ্রহ নাই; শুধু মন খারাপ লাগে এই ভেবে যে একটা ভুল দেশে ভুল সময়ে জন্ম নিয়েছি আমাদের মত চাকরি প্রার্থীরা। আমার স্বপ্ন অন্য, তাই এই পরীক্ষা নিয়ে মাথা ব্যথা নাই, কিন্ত অনেকে আছেন যারা এক দেড় বছর প্রিপারেশন নিয়েছেন শুধু এই পরীক্ষায় ভালো করার জন্য। কি সুন্দর করে আমরা তাদের স্বপ্নের গলা টিপে ধরলাম।

আজকের এই স্বপ্ন ভাঙ্গা মানুষরাই এক সময় সব হারিয়ে শুধু একটু বাঁচার জন্য দুর্নীতি শুরু করবে, অথচ এই দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষক যে স্বয়ং দেশ ছিল সেইটা কেউই মনে রাখবে না…।