ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সরকার বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন সংশোধন করে বিয়ের বয়স ১৮ রেখে বাবা-মা চাইলে ১৬ তে বিয়ে নামে একটি ধারা যুক্ত করতে চাচ্ছে। যেহেতু দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধানের এতে সম্মতি আছে আইনটি হয়ত পাশ হয়ে যাবে। আইন ও বাবা-মা নিয়ে আলোচনার আগে চলুন জেনে নেয়া যাক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ পরিস্থিতি।

সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়স্ক নারীদের প্রায় ৭৪ শতাংশ ১৮ বছরের আগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। আফ্রিকার দেশ নাইজারে বাল্যবিবাহের হার বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ, প্রায় ৭৭ শতাংশ। আর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশ, যা এশিয়ায় সর্বোচ্চ ।
তবে ‘এন্ডিং চাইল্ড ম্যারেজ: প্রোগেস অ্যান্ড প্রসপেক্টস’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার বাংলাদেশেই বিশ্বের সর্বোচ্চ।প্রতিবেদনা জানানো হয়, বিশ্বে প্রায় ২৫ কোটি নারী ১৫ বছর পৌঁছানোর আগেই বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছেন।

শিশু অধিকার সনদ স্বাক্ষরের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয় যে বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ গরিব পরিবারের মধ্যে বাল্যবিবাহ হয়, ধনীদের মধ্যে এই সংখ্যা ৫৩ শতাংশ।বৈষম্য গ্রাম-শহরের অনুপাতেও। বাংলাদেশে গ্রাম-শহরের মধ্যে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অনুপাত ৭০:৫৩।

এসব পরিসংখ্যানের কথা। পরিসংখ্যান সবসময় বাস্তব চিত্র তুলে ধরেনা। এই সংখ্যাটা কম বা বেশি হও্য়া স্বাভাবিক।এবার আসুন বাবা-মা ইচ্ছা -অনিচ্ছার কথায়। বাংলাদেশে যত বাল্যবিবাহ হয় তার ৯৯.৯৯ ভাগ হয় বাবা-মার ইচ্ছাতে। অনেক সময় অল্প বয়সী কিছু কিশোর-কিশোরী পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে এই হার খুবই নগণ্য। এই সামান্য ব্যাপার কে বড় করে দেখিয়ে অথবা অপরিণত বয়সে গর্ভধারন কে যুক্তি হিসেবে দেখিয়ে আইনের সংশোধন কতটুকু যৌক্তিক তা আইন প্রণয়নে সংশ্লিষ্টসহ সবার বোধগম্য।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক প্রকাশিত ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন (ভিএডব্লিউ) সার্ভে ২০১১’ নামের এই জরিপে উঠে আসে দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশই স্বামীর মাধ্যমে কোনো না কোনো সময়ে, কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ শারিরীক নির্যাতন, ৩৬ শতাংশ যৌন নির্যাতন, ৮২ শতাংশ মানসিক এবং ৫৩ শতাংশ নারী স্বামীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

এই নির্যতন কিন্তু গ্রামে এবং অস্বচ্ছল পরিবারেই বেশি। যৌতুকের কথা ভেবে দরিদ্র অভিভাবকরা অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য হয় । মানসিকভাবে অপ্রস্তুত মেয়েটি নানামুখী নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজের মতো বেঁচে থাকার চিন্তা করে অথবা আত্মহত্যা করে। আজকের বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মেরুদণ্ড তৈরি পোষাক শিল্পের যে ৯০ শতাংশ নারী শ্রমিক কাজ করে তাঁদের অর্ধেকের বেশির জীবনে রয়েছে বাল্যবিবাহের করুণ কাহিনী। আর এদের অধিকাংশের বয়স ১৫-২৫ বছরের মধ্যে। হয়তো গার্মেন্টস মালিকরা কথাটা শুনে ক্ষেপে যাবেন কারণ তারা শিশু শ্রমিক নিয়োগ দেন না। তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি , ১৪ বছর বয়স, জন্মনিবন্ধন সনদ সংশোধন করে ১৮ দেখিয়ে বিয়ে রেজিস্টার ও পোষাক কারখানায় কাজ জোগাড় বাংলাদেশের সমাজে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। যখন আইনে ছিল ১৮ তখন বাংলাদেশ রানার্সাআপ ,এবার চ্যাম্পিয়ন হবে নিশ্চয়। আজ যেখানে বাবা-মা তার কন্যা সন্তান কে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ানোর কথা ভাবে, বয়স ১৬ করা হলে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ানোর কথা ভাববে, বয়স ২০ করা হলে স্নাতক পর্যন্ত পড়াবে।

২০১৪ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত গার্ল সামিটে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছর বয়সের আগে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে সম্পূণর্ভাবে বন্ধ করার লক্ষ্যমাত্রার কথা জানিয়েছিলেন।ইউনিসেফের মতে,১৮ বছরের আগে গর্ভধারণ করলে প্রসবকালে তাঁদের মৃত্যুর ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি। বাল্যবিবাহের করুণ পরিণতির শিকার হাজার হাজার মুখ, বিভিন্ন নারীকল্যাণ সংস্থার প্রতিবাদ স্বত্ত্বেও বয়স কমানোর অনড় সিদ্ধান্ত কি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর ‘ক্লাশ ফোর’ তত্ত্বের রিহার্সেল। কোন একদিন কি আমাদেরকে এর মঞ্চায়ন দেখতে হবে?

চুক্তি আইনে আছে ১৮ বছরের নীচে কেউ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারবে না। এর অর্থ দাঁড়ায় ১৬ বছর বয়সী কোন স্ত্রী তার স্বামীর অনুপস্থিতে কোন পারিবারিক ছুক্তিতে স্বাক্ষর করার অধিকার রাখে না । রাষ্ট্র যখন এরুপ নারী বিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে পারে সমাজে এর প্রতিফলন দেখা যাওয়াই স্বাভাবিক।

পরিশেষে রাষ্ট্রের কাছে চাওয়া বাংলাদেশের নারী অগ্রযাত্রার রথ কে থামিয়ে দেবেন না। যে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে তাকে পরীক্ষা করতে গিয়ে অস্বাভাবিক করবেন না। বাংলাদেশ নারী- পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠুক এটাই কামনা ।