ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ ইতিহাসে ভরপুর এক ভূখণ্ড রংপুর জেলা। হিন্দুদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে যেমন এই জেলার নাম পাওয়া যায়, তেমনি মুঘল আমলের আইন-ই-আকবরী গ্রন্থেও এই জেলা সম্পর্কে উল্লেখ আছে। ১৭৮৩ সালের প্রজা বিদ্রোহ , ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ, নীলকরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ থেকে স্বদেশী আন্দোলন, ১৯৩০ সালের আইন অমান্য আন্দোলন, ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের তেভাগা আন্দোলন এরকম প্রতিটি মুক্তি ও ন্যায্য আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল এ অঞ্চলের মানুষ। আমাদের সবচেয়ে গর্বের স্বাধীনতা আন্দোলন রংপুরের মানুষ শুরু করে ২৪ মার্চ । ২৮ মার্চ রংপুর সেনানিবাস দখল করতে গিয়ে প্রাণ দেয় শত শত মুক্তিকামী জনতা। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে লিখতে গিয়ে এই ইতিহাস বর্ণনার কারণ লেখার শেষাংশে উল্লেখ করব।

দেশের প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় এই ভূখণ্ড থেকে। ভাওয়াইয়া গান ও নারী শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্মভূমি প্রসিদ্ধ এই প্রাচীন জেলা স্বাধীনতার পর দেশের সবচেয়ে অবহেলিত ও দারিদ্রপীড়িত জনপদের তকমা পায়। এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতির ঘৃণিত হিসেব-নিকাশ। বেগম রোকেয়ার জন্মভূমি রংপুরে ২০০৮ সালের আগে কোন বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না।

উচ্চশিক্ষার বিপক্ষে সমাজে প্রচলিত কতগুলো মিথের কারণে মা-বাবারা তাঁদের সন্তানদের বিশেষ করে মেয়েদের রংপুরের বাইরে পাঠাতে চাইতো না ।অসচেতনতা , অর্থাভাবের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা থাকা সত্বেও হাজার হাজার ছেলেমেয়ের উচ্চশিক্ষার ঠিকানা হতো বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভূক্ত কলেজগুলো। ভোটের আগে রংপুরের মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ, শিক্ষাবোর্ড, সিটি কর্পোরেশন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতির কথা শুনলেও ভোটের শেষে , একটা নির্দিষ্ট অকার্যকর দলের প্রতি সমর্থনের কারণে বার বার তাঁদের হতাশ হতে হয়েছে। অবশ্য আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে রংপুরকে বিভাগ ঘোষণা করা হয় এবং রংপুর পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা হয়।

রংপুরের মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্বাবধায়ক সরকার। ২০০৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রংপুর সার্কিট হাউসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে রংপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় । ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে দুইটি অনুষদে ৬ টি বিভাগে ৩০০ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক এম লুৎফর রহমান।
আবাসন সংকট, শিক্ষক স্বল্পতা আরো অনেক সমস্যার মধ্যেও উপাচার্যের সু্যোগ্য নেতৃত্বে এগিয়ে চলে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা। সেই সাথে এগিয়ে চলে রংপুর তথা গোটা উত্তরবঙ্গের স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয়। সারা দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তত্বাবধায়ক সরকারের পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামীলীগ। তারা রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রাখে। কোন কারণ ছাড়াই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এম লুৎফর রহমান কে অপসারন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রফেসর ড. আব্দুল জলিল মিয়াকে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়। নেতৃত্বের এই পরিবর্তন নবীন এই বিশ্ববিদ্যালয়টির সাথে রংপুরের মানুষের কত যে ক্ষতি করেছে বোঝা যাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান অবস্থার দিকে তাকালে। —

১। ২০১৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার রুটিন প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদালয় ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তিচ্ছুদের এখনো ভর্তি পরীক্ষাই নিতে পারেনি।
২। ২০০৮-২০০৯ শিক্ষাবর্ষে যারা ভর্তি হয়েছে তাদের অনেক সহপাঠী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তাদের স্নাতকোত্তর কোর্স সম্পন্ন করেছে। বেগম রোকেয়ার শিক্ষার্থীরা গত জুন মাসে স্নাতক সম্পন্ন করলেও তাদের মাষ্টার্স কোর্স শুরু হতে ৬ মাস সময় লেগেছে। বলে নেওয়া ভালো সেশনজট সমস্যায় জর্জরিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে একই শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া ছাত্র-ছাত্রীদেরও স্নাতক শেষ হয়েছে।
৩। গত কয়েক বছর যাবত ছাত্র আন্দোলন, শিক্ষক আন্দোলন , ভিসি বিরোধী আন্দোলন, চাকরি স্থায়ীকরণ আন্দোলন সহ নানা আন্দোলনে শিক্ষা কার্যক্রম বারবার বিঘ্নিত হয়েছে। এর সর্বশেষ সংযোজন শহীদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে শিক্ষকদের দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি, শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবিতে অনশনরত ছাত্র- শিক্ষকদের উপর হামলা, যা মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে।গত তিন মাস ধরে শিক্ষাকার্যক্রম সম্পূর্ন বন্ধ।

উপরে বর্ণিত অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। সাবেক ভিসি জনাব আব্দুল জলিলের সীমাহীন দূর্নীতি , নিয়োগপ্রীতি, পারিবারিকরণের ইতিহাস বিভিন্ন গণযোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সবার জানা । নিয়োগ ও অন্যান্য অর্থ উৎপাদনকারী ব্যাপার নিয়ে ওনারা এত ব্যস্ত ছিলেন যে ছাত্র-ছাত্রীদের অনার্স শেষে মাস্টার্স চালু করতে হবে এই কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। দূর্নীতি কখনো একা করা যায় না। সাথে কাউকে না কাউকে সাথে নিতে হয় । এভাবে একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে । এই গোষ্ঠী আবার বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হয় । যখন এদের স্বার্থে আঘাত আসে তখন তারা আগের আশ্রয় ত্যাগ করে নতুন আশ্রয় খোঁজে। এভাবেই সাবেক ভিসির উত্থান এবং পতন। বর্তমান ভিসি আগের সেই পুঞ্জিভূত সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান না করে নিয়োগ বা অন্যান্য নতুন সমস্যার গ্যাঁড়াকলে নিজেকে জড়িয়ে হয়তো আগের এবং বর্তমান সমস্যা মিলিয়ে সমস্যা বাড়িয়েছেন বৈকি কমাতে পারেননি।

আজকের এই অচলাবস্থায় সরাসরি ক্ষতির শিকার ছাত্র-ছাত্রীরা । শিক্ষক কর্মচারীরা আজ না হোক দুই মাস পরে হলেও তাদের বেতন , পদমর্যাদা , এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ফিরে পাবেন । কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সময় কি তারা ফিরিয়ে দিতে পারবেন? তাই অনেক হয়েছে । এবার ক্ষ্যান্ত দিন। আপনাদের দাবি দাওয়া থাকলে ভদ্র ও গ্রহনযোগ্য উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করুন। ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন নিয়ে খেলা বন্ধ করুন।
দেশের সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রনকারী কর্তৃপক্ষ সবাই কেমন জানি চুপ করে বসে আছে। যেন কিছুই হয়নি। আজকের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারী এবং আন্দোলন প্রতিহতকারী কেউ স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি নয়। সবাই নিজেকে সপক্ষের শক্তিই দাবি করেন। তাহলে কেন এতো নির্লিপ্ততা?

লেখার শুরুতে রংপুরবাসীর আন্দোলনের ইতিহাস এবং এই বিশ্ববিদ্যালয় অর্জনের পেছনে যুগ যুগ অপেক্ষা ও বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরেছিলাম। অনেক সাধনার ফসল এই প্রতিষ্ঠান কে রংপুরের সংগ্রামী মানুষ এভাবে নষ্ট হতে দিবে বলে আমার মনে হয় না। যেদিন সাধারন মানুষ এর বিরুদ্ধে দূর্বার আন্দোলনে নামবে সেদিন অন্য কোন আন্দোলন ধোপে টিকবে না। “কোনঠে বাহে জাগো সবায়’- এই জাগরণী মন্ত্র রংপুরের মানুষ ভুলে যায় নি।