ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আবারো ধর্ষণ । শুধু ধর্ষণ নয় হাত বেঁধে পানিতে ফেলে দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। মাদ্রাসা ছাত্রী অনিতার মৃত্যু, প্রিপারেটরি স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার খবরে সয়লাব আমাদের গণমাধ্যম ও অনলাইন সামাজিক নেটওয়ার্ক। নতুন কোন ইস্যু পেলে আমরা দৌড় দেব সেদিকে। এভাবে চলছে , চলবে।

একদিক থেকে ভালোই করেছে ধর্ষকরা। অনিতাকে মেরে ফেলেছে। বেঁচে থাকলে কি হতো? সারা জীবন তাকে ধর্ষিতার পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো। ধর্ষিতারা শুধুই ধর্ষিতা-সমাজের চোখে, বাবা-মার চোখে, ভাইবোনের চোখে, নিজের কাছে।

মেয়েটির আর্থিক অবস্থা যদি খারাপ হয়, গ্রাম্য সালিসে তার বাবা মার হাতে কিছু টাকা তুলে দিয়ে গ্রাম্য মোড়লরা তাদের দায়িত্ব শেষ করবে। একটা মেয়েকে একটা ছেলের ভালো লেগেছে।, তাই একটু দুষ্টুমি করেছে তাতে কি? ধর্ষিতাকে কে বিয়ে করবে? বাবা-মা দিশেহারা। তাদের কে শান্ত্বনা দেয়ার জন্য এগিয়ে আসে পাশের বাড়ির করিম মিয়া। তার পরিচিত একজন আত্মীয় আছে। বয়স ৬৫। ছেলে মেয়ে সবাই বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে। বউ মারা গেছে একমাস হলো । তার কাছে মেয়ে বিয়ে দিলে মেয়ে সুখে থাকবে।অথবা পাশের গ্রামের জয়েন উদ্দিনের বউ থাকেনা। ইতোমধ্যে তিনটি বউ চলে গেছে। অনেক বুঝিয়ে আপনার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য রাজি করিয়েছি। অথবা পাশের গ্রামের আকবর ব্যাপারির পাগল ছেলের কাছেও বিয়ে দেওয়া যায়। ব্যাপারি সাহেব হজে যাবেন তাই ছেলেকে বিয়ে করাতে চাচ্ছেন? যাই করুক না কেনো মেয়েকে বাড়িতে রাখা যাবেনা। ধর্ষিতাদের বাড়িতে রাখতে নেই। অসহায় বাবা-মা অনেক বিকল্পের একটি বেছে নেয় অথবা মেয়েটিই তার বিকল্প মৃত্যু কে বেছে নেয়।

মেয়েটি যদি মধ্যবিত্ত হয়। তখন গ্রাম্য সালিসে সিদ্ধান্ত হয় ধর্ষকের সাথে মেয়েটির বিয়ে দিয়ে দেওয়ার জন্য। যে পুরুষটির পশুত্বের শিকার মেয়েটি, তার কাছে প্রতিনিয়ত ধর্ষিত হওয়ার ব্যবস্থা করে দিবে সমাজ। শুধু তাই নয় । ছেলেটির বাবা পরহেজগার। তাই মোহরানার টাকা বিয়ের রাতেই শোধ করে দিবে। মোহরানা যত কম ততই সওয়াব। নগদ নাকফুলের ৫০০ টাকা বুঝে নিয়ে ইমাম সাহেব ৪০ হাজার টাকা মোহরানা ধার্য্য করে বিয়ের পড়িয়ে দেন। মেয়ের বাবা-মার কিছুই বলার থাকেনা। ভালো মেয়ে হলে একটা কথা ছিল। ধর্ষিতা মেয়ে। যেভাবেই হোক পার করে দিলেই বাঁচে। আর কিছুদিন বৈধভাবে ধর্ষন করে মোহরানার ৪০ হাজার টাকার মধ্যে সালিসের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে তালাকনামা চূড়ান্ত হয়। নগদ ১০ হাজার, বাকি টাকা সামনের ধানের সিজ়নের পর। ধানের সিজন আসে না, টাকাও দেওয়া হয় না।

মেয়েটি যদি উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে হয়।তাহলে বাবা মা কোনভাবেই ধর্ষকের কাছে মেয়ে বিয়ে দেবে না। কিন্তু ধর্ষকের নামে মামলাও করবে না। মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে এটা নিয়ে মামলা করা বিব্রতকর। কতটাকা লাগে লাগুক মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। যে মেয়েটি ধর্ষণের কারণে দেহ ও মনে বিপর্যস্ত আরেক টা ধর্ষনের ব্যবস্থা করাকেই এর সমাধান ভাবছে পরিবার। কেউ এসে বলেনা চিন্তা করো আমি আছি তোমার পাশে। মেয়েটি কাউকে জড়িয়ে ধরে ডুঁকরে কেঁদে মন হালকা করার সুযোগ পায় না। সবাই ব্যস্ত বিয়ে নিয়ে। ধর্ষিত মেয়ে ঘরে রাখতে নেই।

এতো গেল জনসম্মুখে আসা ধর্ষণ ঘটনা । নীরবে , নিজের নিকট আত্মীয় , পারিবারিক শুভাকাঙ্খীদের দ্বারা হাজার হাজার মেয়ে ধর্ষিত হচ্ছে। ধর্ষণের কথা মুখে আনতে নেই, বললেও জোরে বল যাবে না;ফিসফিস করে বলতে হবে। তাই মেয়েটি ধর্ষিত হয় কিন্তু মুখে আনতে পারেনা। যখন সে আর সহ্য করতে পারেনা, মাকে গিয়ে বলি। মা প্রথমে বিশ্বাস করতে চায় না, মনে করে মেয়ে দুঃস্বপ্ন দেখছে। যখন প্রমাণ পায় মেয়েটি সঠিক বলেছে, তখন সেই পরিচিত জনের কাছে করজ়োড়ে মিনতি করে যা কিছু হয়েছে তা যেন বাইরের কেউ না জানে। মেয়েটিকে ধমক দেয়। চুপ করে থাক । কাউকে কিছু বলবিনা। আমি তোর জন্য ছেলে খুঁজছি। বিয়ে দিয়ে দিব। মেয়েদের জীবনে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই পারে। মেয়ের বাবাকে বলে আমি যা বলছি তাই শোনো মেয়ে বড় হয়ে গেছে বিয়ে দিতে হবে। মেয়েটি মানসিকভাবে বিয়ে করার জন্য প্রস্তুত কিনা এটা কেউ জানার চেষ্টা করেনা?

আরো ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।এটা সরাসরি নয়। মেয়েটি কেনো ধর্ষিত হলো? এর উত্তরে আমরা সবাই ধর্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হই। আমরা প্রথমেই বলি মেয়েটির পোষাকের কথা? বিভিন্ন সূরায় বর্ণিত মেয়েদের পর্দার ব্যাপারে সচেতন করে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব বোধ করি। আচ্ছা শুধু কি মেয়েদেরকেই পর্দা করতে বলা হয়েছে, ছেলেদের সংযত হতে বলা হয়নি? মাদ্রাসার মেয়েরা তো পর্দা করে। তাহলে অনিতা কেনো মারা গেলো? ৪ বছরের শিশুর কোন অঙ্গ ধর্ষনাভূতি জাগ্রত করে? কেউ বাল্য বিবাহের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ধর্ষন বেড়ে যাওয়াকে তুলে ধরে। সত্তর বছর বয়সের বৃদ্ধ বা চার বছর বয়সের শিশু ধর্ষিত হলেও কি ওই যুক্তি খাটানো যায়? ধর্ষনের কারণ হিসেবে মেয়েটির হাজার হাজার দোষ খুঁজেও বের করার চেষ্টা করা হয় কিন্তু ছেলেটির দায় থাকতে পারে এটা ভাবা হয় না? কিছু দিন আগে এক হিন্দু ধর্মাবলম্বী মেয়ে জোর করে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করে ধর্ষণ করাকে যায়েজ ঘোষণা করেছে অনেকে। পাহাড়ে আদিবাসী ধর্ষণের ঘটনাকে তো আমরা কিছুই মনে করিনা? এক হাতে তালি বাজে না এই প্রবাদ বাক্য এখন ধর্ষনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে যুতসই?

আর কিছু বলতে পারছি না । খুব অসহায় লাগে। শুণ্যে মুষ্টিবদ্ধ হাত চালিয়ে নিজের ব্যর্থ্যতাকে প্রবোধ দিই। আমি যখন কোন ধর্ষিতার ভাই অথবা বাবা হবো তখন আমিও কি এমন করবো? আমাদের সমাজটা কি কোনদিনও নারীবান্ধব হয়ে উঠবেনা? এই ঘটনায় হয়তো কিছু স্বপ্নাচারি যুবক যুবতী শাহবাগে প্লেকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ধর্ষণকে না বলার আহবান জানাবে। কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করলে অন্যমনস্কভাবে বলব ওরা ধর্ষণের প্রতিবাদ করছে।এভাবে একদিন এসব ঘটনা আমাদের গা সওয়া হয়ে যাবে? দুষ্টু ছেলেরা এমন করতেই পারে বলে আমরা সব এড়িয়ে যাব?

সূত্রলিঙ্কঃ-
১।http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article968202.bdnews
২।http://www.jugantor.com/current-news/2015/05/16/264615
৩।http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article968915.bdnews