ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 
4

ছবিসূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম
‘একতাই বল’ এই বাক্যটি যদি যথার্থ হয়ে থাকে তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এখন সবচেয়ে ভাল অবস্থানে থাকার কথা। আকাশে বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে ‘চলচ্চিত্র ফোরাম’ নামে নতুন সংগঠন আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। ১৭ টি সংগঠনের জোট ‘চলচ্চিত্র পরিবার’ তো মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না? একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলার একটা চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। কেউ এটাকে চলচ্চিত্র সমালোচনা ভেবে ভুল করবেন না?

সাম্প্রতিক মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র নায়িকা পূর্ণিমার মিমিকস ভাল লাগেনি এমন কেউ মনে হয় পাওয়া যাবে না। একজন মানুষের আরেকজনকে অনুকরণের উদাহরণ হতে পারে তার এই পারফরমেন্স। কিন্তু এই পূর্ণিমাকে নিয়েই আমার রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। তখন ছাত্র। হিন্দি ছবি, কলকাতার বাংলা ছবি দেখে দিনরাত পার করি। শহরে মাইকিং হচ্ছে প্রেক্ষাগৃহে চলছে পেট ফাটানো হাসির ছবি ‘তোমাকেই খুঁজছি’। অনেক আশা নিয়ে গেলাম সিনেমা হলে। কিন্তু পূর্ণিমা এবং অন্যান্য চরিত্রগুলোর দূর্বল অভিনয় দেখে এতো বেশি বিরক্ত হয়েছি যে বাংলা বাংলাদেশি সিনেমার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছি। রাজশাহী অঞ্চলের ভাষা বলার ব্যর্থ চেষ্টা দেখে মনে হয়েছে এরা কোন হোমওয়ার্ক করেনি। হলে গিয়ে সিনেমা দেখার ইচ্ছাটাই নষ্ট হয়ে গেল। এর আগে হলে গিয়ে সিনেমা দেখিনি তা নয়। কিন্তু ‘কেন সিনেমা দেখব’ এই উত্তর তখন মনে জাগতো না কারণ বয়স কম ছিল। আর তখন আবার সিনেমা হলের ভেতরে হলে তো যাচ্ছেতাই অবস্থা; সিনেমা হলের সামনে পরিচিত কাউকে দেখলে সন্মান নিয়ে টানাটানি শুরু হতো কারণ তখন ছিল চলচ্চিত্রের অশ্লীল যুগ।

এই পূর্ণিমার ভেতর থেকে সেরা অভিনয় বের করে আনতে না পারার ব্যর্থতা কি আমাদের পরিচালকরা অস্বীকার করতে পারবে? এ প্রসঙ্গে শাকিব খানের কথাও উল্লেখ করা যায়। যৌথ প্রযোজনা বা প্রতারণার ছবিতে অভিনয়ের আগের শাকিব এবং পরের শাকিবের মধ্যে পার্থক্য ধরতে কোন চলচ্চিত্রবোদ্ধা হতে হয় না। আমার মতো সাধারণ দর্শকই যথেষ্ট।বাংলাদেশের অন্যতম মেধাবী অভিনেত্রী জয়া আহসান। আমাদের নির্মাতারা কতটুকু পেরেছে তাঁর অভিনয় প্রতিভাকে পুরোপুরি দর্শকের সামনে তুলে ধরতে?

সাইদুল আনাম টুটুলের ‘আধিয়ার ‘ বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংযোজন। শ্রেষ্ঠ বলছি এই কারণে আমার কাছে মনে হয়েছে এই চলচ্চিত্রের অভিনয় শিল্পীরা যে নিষ্ঠা আর ভালবাসা দিয়ে অভিনয় করেছে তা বাংলা চলচ্চিত্রে খুবই কম পাওয়া যায়। তেভাগা আন্দোলন নিয়ে তৈরি এই ছবিতে যে ভাষা ও স্থানের উল্লেখ আছে তার সাথে জন্মসূত্রে আমার পরিচয় আছে। আমার কাছে মনে হয়েছে এটা আমার চারপাশের চিত্র, এই ভাষায় এভাবেই তো আমার পূর্বপুরুষরা কথা বলতেন। ওঁদের আবেগ, ক্ষোভ, হাসি, কান্নার অভিব্যক্তি গুলো তো এমনই ছিল।তারেক মাসুদের ‘ মাটির ময়না’ দেখলে ঠিক দাদা-বাবাদের কাছে শোনা গল্পের চরিত্রগুলো চোখের সামনে ঘুরে বেড়ানোর মতো মনে হয়।

কিন্তু আমাদের অধিকাংশ চলচ্চিত্রে যে দৃশ্য দেখানো হয় সেটা সত্তর দশকের ‘মাস্টার সাব বুদ্ধি দ্যান তো’ টাইপের দৃশ্য।একটি ঘটনার সাথে আরেকটি ঘটনার মেলাবন্ধন ঘটানোর ক্ষেত্রে আমাদের সিনেমাওয়ালারা যেন খেই হারিয়ে ফেলে। সমাজ এখন অনেক বদলেছে। এখনকার সমাজে মাস্টারসাব কে মানুষ আর বুদ্ধিমান ভাবে না। কিন্তু চলচ্চিত্র সমাজের পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে পারেনি। চলচ্চিত্রে যে সমাজকে দেখানো হয় তা ইংলিশ ছবির সুপারন্যাচারাল কোন জগতও নয় আবার আমাদের পরিচিত কোন জগতও নয়। তাই এগুলো দর্শক মনে তেমন সাড়া ফেলতে পারে না। ‘শেষ বিকেলের পাখি’, ‘বড় ছেলে’ নাটকগুলো সাম্প্রতিক সময়ে যতটা সোস্যাল মিডিয়া কাভারেজ পেয়েছে কোন ছায়াছবিও তা পায়নি। এই যুগ সোস্যাল মিডিয়ার যুগ। মানুষ কোন নাটক, সিনেমা দেখতে বসলে অবচেতনভাবে নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে নেয়। সোস্যাল মিডিয়ায় এসে তা প্রকাশ করে। আমরা না পারছি দর্শক চাহিদা বুঝে সিনেমা তৈরি করতে বা আমাদের সিনেমা ভাবনার প্রতি দর্শককে আকৃষ্ট করতে।আমাদের চলচ্চিত্রে ‘The Rime Of The Ancient Mariner’ এর বৃদ্ধ নাবিকের মতো একজন গল্পকথক খুবই দরকার যার গল্প দর্শক বিমুগ্ধচিত্তে শুনবে!

দেশে ভালো সিনেমা তৈরি হয়না তা নয়। এখানে বলে রাখা ভালো আমি ভালো বলছি সাধারণ দর্শকের ভাবনা থেকে কোন চলচ্চিত্রবোদ্ধা হিসেবে নয়। ‘মনপুরা’ সিনেমার কাহিনী খুব আহামরি নয়। কিন্তু সিনেমার চরিত্র উপস্থাপনা ও গানগুলো এটিকে ব্যবসা সফল করেছে। হালের ‘আয়নাবাজি’ সিনেমায় এক চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় দর্শক মনে ‘শেষ হয়েও হইলো না শেষ’ অনুভূতি সৃষ্টি করেছে।’থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ সিনেমার বিভিন্ন সত্তার মধ্যে যে দ্বন্দ উপস্থাপন করা হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় আমাদের নেই। ‘অজ্ঞাতনামা’ চলচ্চিত্রে আমরা যে চিত্র পাই তা তো আমাদেরই। ভালকে আমরা সাদরে গ্রহণ করি না এই অপবাদ মনে হয় আমাদের সিনেমাওয়ালারা দিতে পারবে না।

হয়তো ভাবছেন ভিন্নধারার সিনেমার প্রতি আকর্ষণ থেকেই কথাগুলো বলছি। কিন্তু মানুষের ভাললাগাকে আলোড়িত করতে পারলে যেকোন ছবিই ব্যবসাসফল হতে পারে। এস এ অলীকের ‘হৃদয়ের কথা’ সিনেমার কথাই বলা যাক। এখানে কোন মারপিট নেই, উদ্দাম নাচ নেই কিন্তু ছবিটি বক্স অফিসে লাভের মুখ দেখেছে। আমার মনে হয় এটা সম্ভব হয়েছে অন্য ছবির তুলনায় এর গল্প বলার ভঙ্গির ভিন্নতার কারণে।প্রায় একই ধাঁচের শুরু ও শেষ দেখতে দেখতে দর্শকরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। নাটকীয় শুরু(Abrupt beginning) ‘হৃদয়ের কথা’ সিনেমার অন্যতম বৈশিষ্ট। গল্পের মাঝ থেকে গল্পকার ধীরে ধীরে শুরু ও শেষে নিয়ে গেছে। নায়ক মান্না অভিনীত ‘ধোঁকা’ আমি হিন্দি ‘গাজিনি’ ছবি মুক্তির আগেই দেখেছি। একই কাহিনীর উপর নির্মিত এ ছায়াছবি দুটিকে পাশাপাশি দেখুন আমাদের মান্না আমির খানের চেয়েও ভাল অভিনয় করেছে বলে মনে হবে। দিঘী অভিনীত ‘চাচ্চু’ বাণিজ্যিক ছবির সাফল্যের আরেকটি উদাহরণ হতে পারে। এরকম আরো অনেক বাণিজ্যিক ছবি আছে যা আমরা আম জনতা লুফে নিয়েছি। তখন তো আমাদের হলে নিয়ে যাওয়ার জন্য আন্দোলন করতে হয়নি?

মেকআপ, সাউন্ড, এডিটিং, ব্যাকগ্রাউন্ড, কস্টিউম, লোকেশন ইত্যাদি কঠিন বিষয়গুলো একজন সাধারণ মানুষের কাছে কোন কিছুই না। তার চায় আনন্দ পেতে, চায় চোখের জল লুকাতে। কিন্তু দর্শককে ‘ভালবাসা জিন্দাবাদ’ নামক জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা ছবি অথবা সুড়সুড়ি দিয়ে হাসানোর চেষ্টা করলে তো আপনারা ব্যর্থ হবেনই। কলকাতার খরাজ মুখ্যোপাধায়ের ‘কচু পোড়া’ বলার সময় হাসেনি এমন বেরসিক দর্শক পাওয়া খুব ভার।

আন্দোলন করে কোনদিন দর্শককে হলে আনা যায় না। সিনেমা কোন দাতব্য সংস্থা নয় মানুষ আপনাদের আহবানে এসে দান করে যাবে। মানুষ গাঁটের পয়সা খরচ করে আসে। সে যা চায় তা দিতে না পারলে সে আর আসবে না এটাই স্বাভাবিক। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগ একসময় ছিল। তখন মানুষ লাইন ধরে টিকেট কাটতো। আপনারা তো অনেকভাবে চেষ্টা করলেন। কাটপিস, ভারতীয় ছবির কাহিনী নকল ইত্যাদি অনেক চেষ্টাই তো ব্যর্থ হলো। আন্দোলনও ব্যর্থ হবে। তাছাড়া এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ আছে। যেভাবে বহিষ্কার বহিষ্কার খেলা হয় তাতে মনে হয় না নেতারা চলচ্চিত্রের কল্যাণের কথা ভেবে কাজ করছে। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে অথবা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই এই আন্দোলন। আন্দোলনের ব্যানার এবং নেতাদের ক্ষমতাসীনদের সাথে সখ্যতা গড়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা দেখে যে কেউ এই সন্দেহ করতে পারে।

অনেক আন্দোলন করলেন। যৌথ প্রযোজনা ঠেকানোর জন্য কাফনের কাপড় পড়লেন। কিন্তু কাজের কাজ কয়টি করলেন? একবারো কি একটি জরিপ পরিচালনা করে সাধারণ দর্শকদের মতামত নিয়েছেন -তারা কেনো আপনাদের সিনেমা দেখে না? চলচ্চিত্রের প্রতি এতই যখন ভালোবাসা কখনো কি একটি গবেষণা সেল গঠন করে ‘দেশের চলচ্চিত্রের সমস্যা, এর পেছনের কারণ এবং উত্তরণের পথ ‘ শীর্ষক কোন গবেষণা করে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন? আপনাদের কাজিয়া দেখে মনে হচ্ছে আপনারা কিছুদিন পর দর্শকের উপর চড়াও হবেন। ঠেঙ্গিয়ে দর্শককে হলে ঢোকাবেন?

গরীব এ দেশে অনেক সমস্যা আছে। সিনেমা দেখা আমাদের অনেকের কাছে অর্থের অপচয়। কারিগরী অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। তা স্বত্বেও কিছু মালিক কাহিনীর উপর ভিত্তি করে তৈরি সিনামাগুলো দর্শক সাদরে নিচ্ছে। অনেক ভাল নির্মানশৈলী দিয়ে তৈরি সিনেমা নকল করলে দর্শকপ্রিয়তা পাবে না এটাই স্বাভাবিক। স্যাটেলাইটের এই যুগে আপনি সিনেমা হলের সামনে অবস্থান করে হলে ঢুকে সিনেমা দেখা ঠেকাতে পারবেন কিন্তু বেডরুমে বসে বাইরের জগতের ভাল ভাল সিনেমা দেখা ঠেকাবেন কিভাবে? তাই এসব আন্দোলন তিক্ততা বাড়ায়। বৃহত্তর অর্থে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের ক্ষতিই করে। আমরা সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখতে চাই। আমাদের ছবি।