ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আজ ঐতিহাসিক ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ সালে এই দিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহারের সবুজ চত্বর রঞ্জিত হয়েছিল শহীদ অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহার বুকের তাজা রক্তে।

ঐ দিনের ঘটনা সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো- আগের রাতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটে বিভিন্ন হল থেকে প্রায় দু হাজার ছাত্র-ছাত্রী এসে সমবেত হয়ে চারজন করে লাইনে দাঁড়িয়ে শহরের দিকে অগ্রসরের চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশ, ইপিআর আর সেনাবাহিনীর জোয়ানরা মিছিলে বাধা দেয়, মিছিল ঠেকাতে ছাত্রদের দিকে রাইফেল তাক করে। ড. জোহা তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে একবার ছাত্রদের পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাচ্ছিলেন, আবার কখনও সেনা কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটকে বোঝাচ্ছিলেন।

পরিস্থিতি যাতে বিগড়ে না যায় সেজন্য সামরিক কর্মকর্তাদের তিনি বার বার বলছিলেন, “কোন ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে আমার গায়ে যেন গুলি লাগে”। কিন্তু তারা শুনতে চাইছিলেন না। তাই ‘ডোন্ট ফায়ার! ডোন্ট ফায়ার!’ বলে ড. জোহা চিৎকার করতে থাকেন এবং ছাত্রদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন। ‘কিন্তু অবাঙালি সামরিক অফিসারটি প্রথম থেকেই উত্তেজিত ছিলেন এবং বার বার জোয়ানদের গুলি করার জন্য প্রস্তুত হতে বলছিলেন।

        শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. শামসুজ্জোহা

ড. জোহা তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে অনেক কষ্টে এক সময় ছাত্রদের বুঝিয়ে গেটের ভেতরে পাঠাচ্ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি যখন শান্ত হওয়ার পথে তখনই হঠাৎ বেজে ওঠে গুলির শব্দ। মুহূর্তের মধ্যেই আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে ছাত্র-শিক্ষকদেরে মাঝে। দুপুর ১২টার দিকে ক্যাম্পাসে খবর আসে, ড. জোহাকে প্রথমে কাছ থেকে গুলি করা হয়। পরে বেয়নেট চার্জ করে ক্ষত-বিক্ষত করা হয় এবং তাকে মরণাপন্ন অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। খবর পেয়েই ছাত্র-জনতা ভীড় জমায় হাসপাতালে।

ভাগ্য সহায় ছিলো না। প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে অপারেশন থিয়েটারে ইন্তেকাল করেন ড. জোহা। আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু নাম লিখিয়ে যান ইতিহাসের পাতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে। তার সেই রক্তস্নাত পথ ধরে গণআন্দোলন পরে গণঅভ্যুথানে পরিণত হয়।

 

 

ছাত্রদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে আত্মত্যাগ করেছিলেন তিনি। “কোন ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে আমার গায়ে যেন গুলি লাগে’- এমন দুঃসাহসিক কথা ড. জোহাই উচ্চারণ করেছিলেন। বর্তমানে বুক চিতিয়ে দিয়ে নিজের জীবন বাজি রেখে শিক্ষার্থীদের বাঁচানোর এমন নজির পৃথিবীতে দুটিও নেই। নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন শিক্ষকতা পেশাটি মহান। কিন্তু মৃত্যুর এতো বছর পরও যোগ্য সম্মানটুকু দেয়া হয়নি তাঁকে। জাতীয় আন্দোলনে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করলেও এখনো তাঁর বীরত্বগাঁথা সেই ইতিহাস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

দেশব্যাপী ‘শিক্ষক দিবস’ উদযাপনের স্বীকৃতির জন্য চেষ্টাও করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এ নিয়ে রয়েছে ক্ষোভ। তারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ড. জোহাকে শুধু রাবির অধ্যাপক ভাবলে ভুল হবে, গোটা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে তিনিই প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। শুধুমাত্র রাবির গণ্ডিতেই বছরে একবার জোহা দিবস পালন করায় কোন মাহাত্ম্য নেই। তিনি এমন একজন শিক্ষক যিনি শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়েছিলেন, অথচ  এতোগুলো বছর পরও তিনি অবহেলিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এদিনটিকে সারাদেশে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করার দাবি জানিয়ে আসছে।

 

১৯৩৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন ড. শামসুজ্জোহা। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। বাঁকুড়া ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৫০ সালের পর ড. জোহার পরিবার স্থায়ীভাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তান অর্ডিন্যান্স কারখানায় সহকারী কারখানা পরিচালক পদে শিক্ষানবিশ হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৬১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। এরপর ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালের ১৫ এপ্রিল তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব দেয়া হয়। ড. জোহা বিভিন্ন গবেষণা কর্মের সাথেও জাড়িত ছিলেন। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জার্নালে তার বেশ কয়েকটি প্রবন্ধও প্রকাশিত হয়।

 

 

২০০৮ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়ে ড. জোহাকে সম্মান জানায় বাংলাদেশ। ড. জোহার স্মৃতিকে ধরে রাখতে তার নামে একটি ছাত্র হলের নামকরণ করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রধান গেটে গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থানটিতে নির্মাণ করা হয়েছে জোহা স্মৃতি ফলক এবং প্রশাসনিক ভবনের সামনে রয়েছে শহীদ ড. জোহার মাজার। ড. জোহার অবদান কে স্মরণে রাখতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রতি বছর ১৮ ফেব্রুয়ারিকে ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।