ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

ছোট বেলা থেকে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহটা একটু বেশি ছিল, ক্লাস ৩ থেকে যখন বিজ্ঞান বই পেতাম, প্রথেম থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় সব পড়ে ফেলতাম। বিশেষ করে যেই সব পরীক্ষামূলক বিষয় দেওয়া থাকত। এর মধ্যে অনেকগুলিই করতে পারিনি শুধুমাত্র সুযোগের অভাবে। যাই হোক, এই বিজ্ঞান পড়ার ধারাবাহিকতায় একদিন জানলাম যে বিজ্ঞানে প্রায় সব কিছুরই একটা আদর্শ মান আছে। যেমন, পূর্ণ কাল বস্তু হল কৃষ্ষ গহব্বর, অভিকর্ষ বলের একটা মান আছে যাকে জি বলা হয়, ক্যামিষ্ট্রিতে আদর্শ গ্যাস ইত্যাদি ইত্যাদি। শুনে বেশ ভালই লাগছিল। ভেবেছিলাম যে আদর্শ বলে তাহলে কিছু জিনিষ এখনও আছে। যতক্ষনে এই বিষয়টি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি এবং আনন্দ পেতে শুরু করেছি, স্যার ঘন্টা বাজালেন। বললেন, আসলে আদর্শ বলতে শুধু ধরেই নেওয়া হয়, যা পুরাটাই আপেক্ষিক।

এর পর একটা প্রমান পড়ালেন যে স্থির বলতেও কিছু নাই। যাই হোক, প্রথমে একটু মন খারাপ হলেও পরে ভাবলাম যে তাইলে আদর্শ বলে যেহেতু কিছুই নাই, সুবিধা হল। কেউ আমার আদর্শ নিয়ে কথা বলতে গেলে থুতমা (থুতনি) ভেঙ্গে দিব।

আস্তে আস্তে বয়স বাড়তে লাগল, আর বুঝতে পারলাম যে আসলেই আদর্শ বলে কিছু নাই।

কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক।
১. আমাদের বিদ্যালয়ে নিয়ম ছিল যে এক ছাত্র যদি ৮০% উপস্থিতি না দেখাতে পারে, তাহলে তাকে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে দেওয়া হবে না। কিন্তু আমার পরিবারের এমনই সমস্যা ছিল যে বাবার সাথে দোকানে বসতে হত এবং মাঝে মাঝে আমারও স্কুলে যেতে ইচ্ছা করত না।তাই আমাকে প্রায় সব সময়ই দোকানে বসতে হত। মনে আছে ক্লাস ৯ এ মাত্র ৩২ দিন ক্লাস করেছিলাম। আমাদের ক্লাস টিচার যখন দেখলেন যে আমার উপস্থিতি মাত্র ৩২ দিন, উনি আমাকে বললেন অনেক আসছ, এবার আজকেও ছুটি নাও। এবং তাই দিলেন। অন্য ছাত্রদের কে ৮০% এর নিচে হলেই ফাইন করলেন।

২. নিজের গড়িমসির জন্য এস.এস.সি তে খারাপ পরীক্ষা দিলাম। তার উপর আবার ২০০১ এর সেই বিখ্যাত (কুখ্যাত) গ্রেডিং সিষ্টেম চালু হল। সব মিলায় ল্যাজে গোবোরে অবস্থা। আমার গ্রেড আসল ৩.২৫। এই রেজাল্ট দেখে এমন একটা লাফ দিলাম, পরে মনে হয়েছিল যে স্কুলের দোতালার ছাদের উপের জিনিষও দেখে ফেলেছি। এর পরই আমার সব থেকে ভাল বন্ধুটাকে দেখি কানতে কানতে বাড়ি ফিরতেছে। এর মত ভাল ছাত্র কোন ভাবেই ফেল করতে পারেনা। তাই তাকে সান্তনা দিতে গেলাম। কিন্তু যেয়ে শুনি যে সে ৪.৭৫ পাইছে (২০০১ এ যশোর বোর্ডে এটাই ছিল সব থেকে ভাল গ্রেড)। সে কানতেছে ৫.০০ পায় নাই বলে। বুঝলাম যে আসলেই ভাল রেজাল্টেরও কোন আদর্শ মান নাই।

৩. কলেজে ভর্তি হলাম। এমন কলেজ যে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয় প্রথমে ভর্তি হয়ে। আর একবার ভর্তি হলে ভর্তি বাতিল করাতে পুরা ১ বছরের টাকা দিতে হবে। অর্থাৎ ভর্তি হয়ে ভর্তি পরীক্ষা না দিলেও হয়। কোন সমস্যা নাই। যাই হোক, এই কলেজে কেটে গেল ২বছর, আসল খেল দেখলাম যখন টেষ্ট পরীক্ষা আসল। পরীক্ষার পড়ার অবস্থা খুবই খারাপ। একটাতেও পাশ করব বলে মনে হয় না। কিন্তু টেষ্ট পরীক্ষায় পাশ করতেই হবে। উদয় হল এক বড় ভাই, বুদ্ধি দিলেন পরীক্ষা না দিতে, এবং উনি সব সামলাবেন। কি জন্য যেন উনার কথা বিশ্বাস করলাম এবং ফল পেলাম। টেষ্টের রেজাল্ট দেবার পর দেখি যারা পরীক্ষা দেয়নি, তাদের ফাইন ৫০টাকা, আর যারা ১টা সাবজেক্টের বেশিতে ফেল করেছে, তাদের ফাইন সাবজেক্ট প্রতি ১০০ টাকা। বুঝেন অবস্থা।

৪. আমার এক আত্মীয়া এইচএসসি পরীক্ষা দিল, তার রেজাল্ট আনতে তার কলেজে গেলাম। যদিও ইন্টারনেটে দিবে। তারপরও ট্রাডিশনাল ভাব রাখতেই যাওয়া। যেয়ে দেখি বলদ আরও আছে। যাই হোক, রেজাল্ট নিলাম। এর মধ্যে দেখি যে তারই একজন বান্ধবি কান্দে আর হুস হারায়। তাকে সান্তনা দিতে গেলাম। আগে থেকে আমার ঐ বন্ধুর কারণে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু খেলাম ধাক্কা। তার রেজাল্ট ৫.০০ এসেছে। কান্নার কারণ খুজে পেলাম না। পরি আন্টির কাছে শুনলাম যে এটা কী গোল্ডন এ+ নাকি শুধু এ+ তা বুঝতে না পেরেই এই কান্না। বুঝলাম যে এ+ (৫.০০) এর ও আদর্শ মান বলতে কিছু নাই।

৫. আসলে এই গল্পটা বলব বলেই এত কষ্ট করে লিখলাম। কিন্তু এখন আর লিখতে ইচ্ছা করছে না। কারণ এইটা লিখলে আমার জীবনের অনেক বড় গোপন একটা কথা বের হয়ে যাবে। যা অনেকেই জানে। কিন্তু এই লেখাটা যেহেতু ফেইসবুকে শেয়ার করব, তাই আমার খুব কাছের মানুষদের শুনাতে চাই না। তবে এটা বলব, বন্ধুত্ব বা ভালোবাসার কোন আদর্শ মান না থাকতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব বা ভালবাসাকে কখনই পায় ডলে যেতে নাই। একটা সত্যিকারের বন্ধু যেমন পাওয়া কষ্টের, একটা মানুষ পাওয়াও কষ্টের যে সত্যি সত্যি ভালবাসবে।

সবাই ভাল থাকবেন।