ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

10_Victory+Day_Jatiyo+Smriti+Soudho_161214_0003

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর সময় বিকাল চারটায় ৯৩০০০ সৈন্যসহ পাক হানাদার বাহিনীর প্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল নিয়াজী হাতের অস্ত্র মুক্তিসেনাদের পায়ের কাছে রেখে, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলেন বীর বাঙালিদের সামনে। পাক হানাদার বাহিনীর প্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল নিয়াজী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মাথা নিচু করে স্বাক্ষর করেছিলেন পরাজয়ের সনদে। যার ফলে বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় হয়েছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।

দেশের প্রতিটা শহর থেকে শুরু করে প্রতিটা গ্রামেও প্রতি বছর এই দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে বিজয় দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমরা তোমাদের ভূলবোনা” এই গানের ধ্বন্নিতে মুখরিত হয়ে যায় সারাদেশ। মুক্তির জয়গানে মুখরিত কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করে জাতির সেই অকুতোভয় শ্রেষ্ঠ বীর সন্তানদের, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এ বিজয়। বিশ্ব মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

ইংরেজদের উপনিবেশিক শাসন থেকে এদেশ ১৯৪৭ সালে মুক্ত হলেও বাঙালিদের ওপর শুরু হয় পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্যমূলক অন্যায় আচরণ। বাঙালি বঞ্চিত হতে থাকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে। পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ লুট করে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা হয়। তাদের সে অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে জেগে ওঠে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা। বীর বাঙালিরা প্রথমেই আঘাত হানে শাসনযন্ত্রে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে, ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ১৯৫৭ সালে স্বায়ত্তশাসন দাবি, ১৯৬২ ও ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালে নির্বাচনে।

১৯৭০ সালে নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজয়ী হওয়ার পরেও পাকিস্তানি সামরিক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি একত্রিত হয়ে, অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য পুরোপুরিভাবে প্রস্তত হয়ে যায়। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ: ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লাখো জনতার উপস্থিতিতে গগণ বিদীর্ণ জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য আহব্বান জানান। বঙ্গবন্ধুর কন্ঠে প্রকম্পিত হল; ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’! তখন লাখো বাঙ্গালির হাততালিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠছিল রেসকোর্সের ময়দান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই ভাষণে জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য ঝাপিয়ে পড়ার আহবান জানিয়েছিলেন। ২৫ মার্চ মধ্য রাতে পাক হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত নিরীহ বাঙ্গালীদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার নিজ বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। তার এই ঘোষণা পত্রটি টেলিগ্রামে চট্রগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে পাটিয়ে দেন! ইতিমধ্যেই দেশের কিছু কিছু স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এসময় তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান চট্রগ্রামের ক্যন্টনমেন্টে দ্বায়িত্বে ছিলেন। মেজর জিয়াউর রহমান ও কর্ণেল অলী আহমদসহ বেশ কিছু আর্মি অফিসার বিদ্রোহ করে চট্রগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র বাঙালিদের দখলে নিয়ে আসেন। ২৬ মার্চ চট্রগ্রাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

বাঙালিরা মেজর জিয়াউর রহমানের কন্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে গ্রামেগঞ্জে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে। পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জন্য দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল। মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে একজন সেক্টর কমান্ডারেরর দায়িত্বে ছিলেন। মেজর জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন অকুতোভয় র্নিভিক যোদ্ধা। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি জেড ফোর্স গঠন করেছিলেন। বিজয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন।

পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রজনতা ও বিভিন্ন পেশার দামাল ছেলেদের নিয়ে মুক্তি বাহিনী গঠন করা হয়। মুক্তিবাহিনীর প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন কর্নেল এম এ জি ওসমানি। মুক্তিবাহিনী ছাড়াও পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল কাদেরিয়া বাহিনী ও মুজিব বাহিনী। কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। জাতির এই বীরসন্তানদের আত্তত্যাগের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বে মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছিল!

১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসের এইদিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি, জাতির দুর্দিনে যেসব বীর বাঙালিরা দেশকে হানাদারমুক্ত করতে জীবন দিয়েছেন এবং যেসব মুক্তিযোদ্ধা বেঁচে আছেন তাদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মেজর জিয়াউর রহমান, কর্নেল এম এ জি ওসমানিসহ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়া সকল বীরদের বিদ্রোহী আত্তার মাগফিরাত কামনা করছি এবং কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর দীর্ঘায়ু কামনা করছি। তোমাদের মত এমন মহান নেতা না পেলে হয়তোবা আমরা বাঙালিরা আজো স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বাদ পেতাম কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে!