ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

আমাদের দেশে রাজনীতিতে প্রতিহিংসা একটি কমন বিষয়৷ ক্ষমতাসীন ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে প্রতিহিংসার রাজনীতি চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কয়েক হাজার নিরীহ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। স্বাভাবিকতো প্রতিহিংসার রাজনীতির প্রধান শিকার হয় সাধারণ জনগণ। তারপর বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের কর্মীরাও প্রতিহিংসার শিকার হয়৷ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রধান হাতিয়ার মামলা৷ আর বিরোধী দলের প্রধান হাতিয়ার হরতাল, আন্দোলন।

২০০৬ সালে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে অচল হয়ে পড়েছিল সারাদেশ। লগি-বৈঠার আঘাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল শতশত সারাধাণ মানুষকে। তখন বিরোধী দলকে দমনের জন্য ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা দিয়েছিল। গ্রেপ্তার ও হামলার শিকার হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতারা৷ এমনকি এখনকার প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভানেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও মামলা হয় তখন৷

২০১৩ সালে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে হরতালের নামে পেট্রোল বোমা ছুড়ে শত শত নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছিল। তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী দলকে দমনের জন্য বিএনপির শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছিল। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফের ভাষ্যমতে, ‘২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ২৬ হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে৷ তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া, সংসদ সদস্য আহসানুল্লাহ মাস্টার, নাটোরের সাবেক এমপি মমতাজ আহমেদ, খুলনার মেয়র প্রার্থী মঞ্জুরুল ইমামের মত সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা করানো হয়েছে৷ বিএনপি সরকারের তত্ত্বাবধানে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়৷ সেই হামলায় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতা-কর্মী নিহত হন৷ এখনো ৮০ জন নেতা-কর্মী স্প্রিন্টারের আঘাত নিয়ে পঙ্গু জীবন যাপন করছেন৷ আর এই হামলার পর আমাদের মামলা করতে দেয়া হয়নি৷’

খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খানের ভাষ্যমতে, ‘‘গত ৯ বছরে এই সরকার বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৩৮ হাজার মামলা করেছে৷ আর এইসব মামলায় বিএনপির অন্তত ১০ লাখ নেতা-কর্মী নির্যাতিত হয়েছেন, জেল খেটেছেন৷ এক হাজারের বেশি নেতা-কর্মী গুম হয়েছেন৷ বিএনপি’র সিনিয়র নেতাদের গ্রেপ্তার করে ডান্ডাবেড়ি পড়ানো হয়েছে৷ এরকম লোমহর্ষক নির্যাতন চলছে বিএনপির ওপর।’

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ মামলা বিবেচনায়, ৫ হাজার ৮৮৮টি মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং ৯৪৫টি মামলা থেকে কিছু আসামিকে অব্যাহতি দেয়৷ ওই সময় মোট ৭৩ হাজার ৫৪১ জন আসামি এই প্রক্রিয়ায় বিচার এড়াতে সক্ষম হয়।

২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মহাজোট সরকার ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ মামলা বিবেচনায়, ৭ হাজার ১৯৮টি মামলা সম্পূর্ণ বা আংশিক প্রত্যাহারের সুপারিশ করা করা হয় এবং বর্তমানেও তা অব্যাহত আছে৷

রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলাগুলোর কারণে সাধারণ জনগণের মামলাগুলোর বিচার কার্য বিলম্বিত হচ্ছে। এর জন্য আইনের প্রতি জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাচ্ছে। যার ফলে দেশে অনৈতিক কাজের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। যদি রাজনৈতিক কারণে মামলা দায়ের করা হয় এবং তা প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে এর সুযোগ নিবে প্রকৃত দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীরা৷ তারা এই সুযোগে ছাড়া পেয়ে যায়৷

আমাদের দেশে প্রতিহিংসার রাজনীতি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি দূর করা সুস্থ রাজনীতির পূর্বশর্ত। প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আস্থা এবং শ্রদ্ধাভাব গড়ে তুলতে হবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে, সূদুর ভবিষ্যতে বাংলার জনগণ তাদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করবে।