ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আদিম সমাজের পুরুষেরা তাদের লিঙ্গ আড়াল করে রাখতো গাছের পাতা বা ছাল দিয়ে। একইভাবে নারীরাও বুকের বিশেষ অংশটি ঢেকে রাখতো। আদিম সমাজে নারীদের কোন মূল্যায়ন করা না হলেও, তাদের নির্যাতন করা হতো না। তারপরেও আমরা আদিম যুগের মানুষদের কেন ঘৃণা করি? তারপরও আমরা আদিম যুগের মানুষদের কেন বর্বর অসভ্য জাতি বলি? বলছিলাম বউ পিটানো বা নারী নির্যাতন সম্পর্কে। বিখ্যাত উপন্যাসিক জহির রায়হানের “হাজার বছর ধরে” উপন্যাসে বউ পিটানো চিত্রটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উল্লেখ করেছেন। কীভাবে আবুলেরা প্রতি বছর একটা করে বউ মারতো, তারপর আবার বিয়ে করতো!

ফার্মেসি থেকে মায়ের জন্য ঔষধ নিয়ে মাত্র বাসায় ফিরেছি। তখন রাত প্রায় নয়টা। পাশের বাসা থেকে একজন মহিলার চিৎকারের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে চলে গেলাম ওই বাসায়, যে বাসায় মহিলার চিৎকারের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। গিয়ে দেখলাম, ভদ্রলোক প্যান্টের বেল্ট দিয়ে তার বউকে পিটাচ্ছেন। আমাকে দেখে, প্রহাররত মহিলাটি আমার পায়ে ধরে বলছেন, ভাই সাহেব আমাকে বাঁচাও। ও আজ আমাকে মেরেই ফেলবে। বাঁচাও ভাই! আমাকে বাঁচাও। ভদ্রলোকের বেল্টে ধরে আমি প্রহারে বাধা প্রদান করলাম। এতে ভদ্রলোক আমার প্রতি রেগে গিয়ে বললেন, দেখো ছোট ভাই! স্ত্রীকে একটু শাসন করছি। ধর্মেও স্ত্রীকে শাসন করার বিধান রয়েছে। তুমি তো এখনো বিয়ে করনি। তাই তুমি এসব কিছু বুঝবেনা। এই ব্যাপারটা আমাদের স্বামী-স্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত। তাই আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে বাহিরের মানুষ ইন্টারফেয়ার করুক, তা আমি চাইনা।

প্রতিউত্তরে আমি ভদ্রলোককে বললাম, আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারটা যদি আপনার প্রতিবেশির বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখন তো আর ব্যাপারটা আপনাদের একান্ত ব্যক্তিগত থাকেনা। আপনি স্ত্রীকে প্রহার করা বন্ধ করুন। তা না হয়, আমি পুলিশ ডাকতে বাধ্য হবো। ভদ্রলোক আপাতত রাতের জন্য প্রহার করা বন্ধ করলেন। অবাক হওয়ার মত ব্যাপার! প্রত্যেকটা ধর্মের লোকেরা বউকে কম-বেশি পেটায় সত্য। কিন্তু এর মধ্যে মুসলিমরাই ব্যতিক্রম। মুসলিমরা বউ পিটায় ধর্মীয় ভাবে জায়েজ করে। বউ পিটানো জায়েজ, এসব কাঠমোল্লাগো ফতোয়া। ইসলাম ধর্ম বউকে শারিরিক ভাবে আঘাত করা সম্পুর্ণ হারাম। এবং মানসিক ভাবে আঘাত করাও হারাম। কাজেই ধর্মের নামে জায়েজ করে বউ পিটানো যাবেনা।

বাসায় ফিরে আমি ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলাম। আর কেইবা চিন্তা করবনা। লোকটা যখন তখন বউকে পিটানো শুরু করে। আর এতে একজন প্রতিবেশি হিসেবে আমার খুব খারাপ লাগে। ওই মহিলার করুণ চিৎকার আমার বিরক্তের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বামী-স্ত্রী একজনের প্রতি অপরজনের সন্দেহ বা অবিশ্বাসের জন্য এই নির্যাতন চলে। একেক শ্রেণীর মানুষ বউকে একেকভাবে পিটিয়ে থাকে। একেবারে নিম্ন শ্রেণি থেকে সর্বোচ্চ শ্রেণি পর্যন্ত এই বউ পিটানো লক্ষণীয়। নিম্ন শ্রেণির মানুষ বউ পিটায় দৈহিকভাবে। উচ্চ শ্রেণির মানুষ বউ পিটায় মানসিক টর্চারের মাধ্যমে। যারা বউকে প্রহার করে, তারা বিবেকহীন মনুষ্যত্বহীন। এরা সমাজের পরিবেশ দূষিত করছে। তাই তাদের ছত্রছায়ায় থাকা মানুষগুলোকেই বউ পিটাতে দেখা যায়।

আদিম সমাজে কিন্তু বউ পিটানোর নিয়ম ছিল না। তারপরেও আমরা আদিম সমাজকে অসভ্য সমাজ হিসেবে জানি। আরবের অন্ধকার যুগে নারীদের মূল্যায়ন না করলেও কিন্তু বউ পিটানোর দৃশ্য ছিলো না তখন। কিন্তু এই যুগে সভ্যতার মুখোশ লাগিয়ে কিছু পুরুষ এমন সব কাজ করে যাচ্ছে যা অসভ্য যুগের মানুষগুলিও কখনো করেছে বলে জানা যায়নি।

এখনো কিছু পুরুষ নিজের স্ত্রীকে অর্ধাঙ্গিনী ভাবতে পারেনি। তার সামনে আবির্ভূত হয় একজন শাসক হিসেবে। বাইরে কারো সাথে ঝামেলা হলে ঘরে গিয়ে বউকে নির্যাতন করে তার প্রতিশোধ নেয়। পুরুষ তার নিজের বিশাল বড় বড় ভুলগুলোও তার চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু তার স্ত্রীর সামান্যতম ভুল আকাশের সমান বড় মনে হয়।

সেই পুরুষ একবারও ভাবে না, যে মেয়েটি তাকে বিশ্বাস করে তার নিজের মা-বাবা অর্থাৎ সকল আপনজন রেখে চলে এসেছে তার সাথে, তাকে সে কিভাবে অবিশ্বাস করে? কিভাবে তার শরীরে আঘাত করে? এখনো অনেক পুরুষ বিয়ে করে শুধুমাত্র তার দেহ ভোগ করার জন্য। বিয়েটাকে নেয় ভোগের লাইসেন্স হিসেবে। দেহের তুলনায় মনের গুরুত্ব তাদের কাছে ক্ষীণ। বউয়ের চাওয়া-পাওয়া, ভালো লাগা খারাপ লাগা তাদের কাছে অর্থহীন।

এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও সেই আদিম যৌন খেলায় তাদের সহধর্মিণীর মতামত বা ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা বা মূল্যায়ন করা হয় না। তারপরেও ঘুরেফিরে সকল দোষে দুষ্ট করা হয় নিজের বউকেই।

এই পুরুষ শাসিত সমাজে এখনো অনেক পুরুষ নিজের বউকে পিটিয়ে কৃতিত্ব দেখায়। আমি সেই সকল পুরুষ আর আদিম অসভ্য সমাজের বর্বর মানুষগুলির মাঝে বিশেষ কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনা। তবে হালকা কিছুটা পার্থক্য আছে। আদিম সমাজের মানুষগুলো ছিলো মুখোশহীন অসভ্য যদিও তারা এইভাবে বউ পিটাইতো না, আর বর্তমানের এই শাসক শ্রেণির পুরুষগুলো হচ্ছে মুখোশধারী অসভ্য। ওরা আধুনিক এই সমাজের ভাইরাস।

তবে এটাও সত্য যে পুরুষ মানেই শাসক নয়, বেশিরভাগ পুরুষই বিশ্বাস করে তার স্ত্রী তার অর্ধাঙ্গিনী। একজন ঘরের বাইরে বা দেশের বাইরে কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করে, আর অপরজন সংসার দেখে। সন্তানদের লালন-পালন করে। অথবা সেও তার স্বামীর সাথে অর্থ উপার্জন করে। দু’জন মিলেই সন্তান লালন-পালন করে। একে অপরকে বিশ্বাস করে। কারণ বিশ্বাস হচ্ছে ভালোবাসার মূল শক্তি এবং সুখের অন্যতম উৎস। আর প্রকৃত ভালোবাসা তাদের সংসারেই বিরাজ করে।

কাজেই বলা যায়, বউকে পিটানো বা কোনো টর্চার করার মাঝে কোনো কৃতিত্ব নেই। যা আছে, তা হচ্ছে অসভ্যতা, বর্বরতা, হীনতা ও মনুষ্যত্বহীনতা।