ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

ছাত্রী নিপীড়নে জড়িত ছাত্রলীগ কর্মীদের বহিষ্কারের দাবি পূরণ না হওয়ায় গত ২৩ জানুয়ারি মঙ্গলবার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, প্রক্টর কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচির সময় ভাঙচুরের অভিযোগে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেওয়ার দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানকে। পরে সেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাই তাকে উদ্ধার করেছে আন্দোলনকারী সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের পিটিয়ে। ছাত্রলীগ ‘সন্ত্রাসীরা’ পিটিয়ে আহত করেছে বাম ছাত্র সংগঠনের নেতা ও মিডিয়া কর্মীদের। এই হল বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতি।

সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী ও মিডিয়া কর্মীদের পিটানোর পরও গত ২৪ জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে, নির্লজ্জের মত মিছিল, মানববন্ধন আর অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ছাত্রলীগ ‘সন্ত্রাসীরা’। ২৪ জানুয়ারী বুধবার উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে প্রায় দুই ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স বলেন, “সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসে গাঁজা খায় কারা?” ছাত্রলীগ কর্মীদের কাছ থেকে সমস্বরে উত্তর আসে- ‘বামেরা’। অবস্থান কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান বলেন, “যদি আমার বাবাকে রক্ষা করতে গিয়ে, আমার শিক্ষককে রক্ষা করতে গিয়ে আমাকে জেলে যেতে হয়, মৃত্যুবরণ করতে হয় আমি তাতেও রাজি আছি।” (সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)

১৯/১২/১২, এই দিনটি আমার জীবনের চির স্মরণীয় দিন। এদিন সারাদেশ ব্যাপী হরতালের দিন ছিল। আমাদের সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের এইচএসসি টেস্ট পরীক্ষার রিজাল্ট প্রকাশিত হয়েছিল সেদিন। আমি ও আমার বন্ধু জাকারিয়া সকাল নয়টায় পায়ে হেঁটে কলেজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। পথিমধ্যে কলেজের মুসলিম হোস্টেলের জানালায় উঁকি দিল জাকারিয়া। সে আমাকে বলল, দোস্ত! দেখ, দেখ। সাজ্জাদ নামে আমাদের ক্লাসমেট ও আরো ১৫/১৬ জন কলেজের হোস্টেলে বসে মদ খাচ্ছে। সাজ্জাদ সে ছাত্রলীগের একজন এক্টিভিস্ট ছিল। জানালার ফাঁক দিয়ে এই দৃশ্য দেখে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। হোস্টেলের ভিতরে গিয়ে সাজ্জাদকে বললাম, কিভাবে তোরা কলেজ হোস্টেলে বসে মদ খাস? আমি নিজে গিয়ে অধ্যক্ষকে সব বলে দিব। একথা বলার সাথে সাথেই ওদের একজন আমাকে ও জাকারিয়াকে ভিতরে রেখে রুমের দরজা বন্ধ করে দেয় এবং আমাদের দুজনকে মারধর করতে থাকে। মারধর করার একপর্যায়ে তারা আমাদের দুজনকে জোর করে হা করিয়ে আমাদের মুখে মদ ঢেলে দেয়। এবং চাকু দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে আহত করা হয় জাকারিয়াকে। সেই দিনের নির্মম স্মৃতি আমি আজও ভুলতে পারিনা।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্সকে বলব, ছাত্রলীগ শুধুমাত্র “সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসে গাঁজা ও মদ খায়না”। ছাত্রলীগ দেশের প্রত্যেকটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যান্টিন ও হোস্টেলে বসে মদ ও গাজা খেয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসানের কাছে জানতে চাইবো, আপনারা যখন পিতা বা শিক্ষককে বিভিন্ন অজুহাতে লগিবৈঠা দিয়ে পিটান, তখন কি কিচ্ছু হয়না? ভাই সাহেব, আপনাদের সামান্য কিছু ক্ষমতা দিয়ে আপনাদের দল আপনাদের মানবতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা করছে। এসব ছেড়ে শান্তির পথে ফিরে আসুন।

ছাত্র রাজনীতির নামের ছাত্রলীগের সাথে যে জিনিসগুলো আমাদের সামনে চলে আসে তা হল- গুলিসহ অমুক ছাত্রলীগ নেতা আটক, হল দখল নিয়ে ছাত্রলীগ দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্যকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ…। এভাবেই ছাত্র রাজনীতি অস্থির করে তুলেছে দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। মা তার ছেলেকে কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে চিন্তা করতে থাকে, তার ছেলে জীবিত ফিরবে তো? কারণ, শিক্ষাঙ্গনেও এখন নষ্ট রাজনীতি ঢুকে গেছে। রাজনীতিবিদরা নিজেদের স্বার্থে ছাত্রদের ব্যাবহার করা শুরু করেছে।

একজন ছাত্রের কাছে বইয়ের পরিবর্তে অস্ত্র কেন? সহপাঠীদের সাথে বন্ধুত্বের পরিবর্তে বৈরি সম্পর্ক কেন? একজন ছাত্রের প্রধান কাজ হল মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করা। লেখাপড়া করলে একজন ছাত্রের মাঝে মনুষ্যত্ব জাগ্রত হয়। ছাত্র রাজনীতির সাথে যারা জড়িত তাদের মনুষ্যত্ব নেই। যদি মনুষ্যত্ব থাকতো তাহলে সহপাঠীদের পশুর মত পেটাতো না। যদি মনুষ্যত্ব থাকতো তাহলে আধিপত্যকে কেন্দ্রকরে পশুর মত সংঘর্ষে লিপ্ত হতো না।

এখন অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে রাজনীতি কে করবে? উত্তর, রাজনীতি ঐ ছাত্ররাই করবে, কিন্তু সেটা হবে ছাত্র জীবনের পরে। পরিশেষে রাজনৈতিক দলগুলোকে বলব, আপনারা নিজেদের স্বার্থে এসব কোমলমতি ছাত্রদের ব্যবহার করবেন না। দয়া করে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করুন, ছাত্রদের ব্যবহার করা বন্ধ করুন।