ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

নেত্রীকে কারাগার থেকে মুক্ত করার জন্য ও দলের প্রতি দেশের মানুষের সহানুভূতি বৃদ্ধির জন্য বিএনপি যখন ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে আসছে, তখন বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিগুলোতে বাধা দিয়ে প্রতিবাদ করার সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই আমরা দেখে আসছি যে, রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দলের মুখোমুখি হতে ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দলকে কঠোর হস্তে দমনের জন্য মামলাকে প্রধান হাতিয়ার হিসাবে বেছে নেয়। তখন বিরোধী দলও প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয় হরতাল, অবরোধ ও ধ্বংসাত্মক সব কর্মকাণ্ডকে। কিন্তু ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশে বিরোধী দলের রাজনীতিতে বিএনপি নিয়ে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বিএনপি ক্ষমতাসীনদের মামলা মোকাবেলায় হরতাল ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে এসেছে। ক্ষমতাসীনদের মামলা মোকাবেলায় বিএনপির এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি আমেরিকা ও ইউরোপের ভদ্র রাজনীতির সাথে তুলনা করা যেতে পারে। বিএনপির এই কর্মসূচি নিঃসন্দেহে প্রসংশার দাবি রাখে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যদি একতরফা ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করে, বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার জন্য বিরোধী দলের প্রতি কঠোর দমন-পীড়ন নীতি বাদ দিয়ে নমনীয় হয়, তাহলে দেশে সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হতে বেশি সময়ের প্রয়োজন নেই বলে আমি মনে করি।

কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলেও সত্য যে, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রোজ রোববার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপ-কমিটির প্রথম সভার বক্তব্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়েদুল কাদের বিএনপির মহাসচিব মীর্জা ফখরুলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “রাস্তা বন্ধ করে কোনো সভা-সমাবেশ করা যাবে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করে মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করছেন। আপনারা যদি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেন তাহলে ঘরে বসে করুন, অফিসে করুন। রাস্তায় জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছেন কেন?” ২০১৪-১৫ সালের সহিংস আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ওবায়েদুল কাদের বলেন, “৫ জানুয়ারির মতো কার্যক্রম করা কি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন?”

আমি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়েদুল কাদেরকে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলতে চাই, ২০০৬ সালের ২৮, ২৯ ও ৩০ অক্টোবর আপনার দল আওয়ামী লীগ যে লগি-বৈঠার আন্দোলন করেছিল, সেটা কি ঘরে বসে করেছিল নাকি পার্টির অফিসে বসে করেছিল? সেই লগি-বৈঠার আন্দোলন কি রাস্তা কিংবা রাজপথে জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করেনি? বিএনপির ২০১৪-১৫ সালের সহিংস আন্দোলন কি ২০০৬ সালের ২৮-২৯-৩০ অক্টোবরের চেয়ে বেশি ধ্বংসাত্বক ছিল?

২০০৬ সালের অক্টোবরে রাজনীতির নামে লগি-বৈঠার আঘাতে বলি হওয়া সাধারণ মানুষের করুণ আর্তনাদের কথা কি কাদের সাহেব ভুলে গেছেন? যাতে রক্তাক্ত হয়েছিল দেশ, কলুষিত হয়েছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতি, বিপন্ন হয়েছিল মানবতা, কলঙ্কিত হয়েছিল দেশ, ধ্বংস হয়েছিল মনুষ্যত্ববোধ, বিকশিত হয়েছিল প্রতিহিংসা, নির্মমতা, নৃশংসতা, বর্বরতা আর উগ্ররাজনীতির। সেই লোমহর্ষক ও বর্বর দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়েছিল গোটা দেশ, থমকে দাঁড়িয়েছিল কোটি কোটি মানুষ, হতভম্ব ও বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল দেশের আপামর জনতা। সেই ঘটনায় শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের হৃদয় নাড়া দিয়েছিল। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব থেকে শুরু করে সারা বিশ্বে ওঠেছিল প্রতিবাদের ঝড়। অবাক হয়েছিল বিশ্ববিবেক। ঘৃণা ও নিন্দা জানিয়েছিল তারা। সেই দিনগুলোর কথা কি কাদের সাহেব ভুলে গিয়েছেন?

সামর্থ্য নেই বলে বিএনপি দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে জোরালো কর্মসূচিতে যেতে পারছে না বলেও উসকানি দিয়ে বিএনপির শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সংঘাতের সৃষ্টি করতে চাইছেন আওয়ামী লীগের এই সাধারণ সম্পাদক।

আমি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়েদুল কাদেরকে বলব, আপনারা বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে উসকানি দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত করে তুলবেন না। মেনে নিলাম রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হলে কাদের সাহেবদের কোনো ক্ষতি না হলেও আমাদের মত সাধারণ মানুষদের জানমালের বিরাট ক্ষতি হয়। যেমনটা হয়েছিল ২০০৬ সালের ২৮, ২৯ ও ৩০ অক্টোবরে। যেমনটা হয়েছিল ২০১৪ ও ২০১৫ সালে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির দায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দণ্ডিত হলে এই রায় মেনে নিয়ে আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে বিএনপি নেতাকর্মীদের পরামর্শ দেন আওয়ামী লীগ নেতারা। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালত যখন সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে মুখ খোলেন, তখন আওয়ামী লীগ নেতারা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতিকে জোর করে অসুস্থ বানিয়ে ছুটিতে পাঠিয়ে আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন!

বিরোধী দল বিএনপি সুস্থ রাজনীতিতে একধাপ এগিয়ে এসেছে। ক্ষমতাসীনদেরও উচিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা করতে বিরোধী দলের প্রতি দমন-পীড়ন নীতি ত্যাগ করে বিরোধী দলের প্রতি নমনীয় হওয়া।