ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

যে বৈষম্যের অবসানের জন্য বাঙালিরা দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, আজ সেই স্বাধীন দেশেও একই রকমের বৈষম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে সরকারি অফিস-আদালত থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ পর্যন্ত মেধাহীনদের রাজত্বে পরিণত হয়েছে। আজ স্বাধীন দেশেই সাংবিধানিকভাবে কোটা পদ্ধতির প্রবর্তন করে বৈষম্যের সৃষ্টি করা হয়েছে।

একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মেধা অনুযায়ী চাকরি পাওয়ার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কোটা পদ্ধতির কারণে আজ মেধাবীরা তাদের সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চাকরি পাওয়ার জন্য তার যোগ্যতা হোক মেধা, কোনো কোটা পদ্ধতি নয়।

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে দেখা যায়, শতকরা ৫৬ ভাগ নিয়োগ দেয়া হয় কোটা দিয়ে। এই ৫৬ শতাংশের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী (উপজাতি) ৫ শতাংশ ও প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পদ্ধিতে নিয়োগ দেয়া হয়। বাকি থাকে ৪৪ শতাংশ। কিন্তু এই ৪৪ শতাংশের মধ্যেও রয়েছে, ক্ষমতাসীনদের দলীয় কোটা, মন্ত্রী-এমপিদের আত্মীয় কোটা, লবিং বা মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশ কোটা, ঘুষের কোটা। মেধাবীদের স্থান কোথায়? কোটার ফান্দে আজ মেধাবীরা বন্দী হয়ে গেছে। এসব কারণেই মেধাবীরা আজ বড় অসহায়! এইভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ মেধা প্রতিবন্ধী রাষ্ট্রে পরিণত হবে বলা যায়।

সাধারণত যেকোন দেশে কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে সুযোগ দেওয়া হয় পিছিয়ে পড়া জনগণকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। কাজেই নারীদের জন্য ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর (উপজাতি) জন্য ৫ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ, এই ১৬ শতাংশ কোটা নিয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সন্তান ও তাদের নাতি-নাতনিদের জন্য ৩০ শতাংশ ও জেলা কোটা ১০ শতাংশ নিয়ে আমার ভীষণ আপত্তি রয়েছে।

 

 

বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে যারা যুদ্ধ করেছেন, রক্ত দিয়েছেন, পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে আমাদেরকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বা দেশ উপহার দিয়েছেন তারা অবশ্যই দেশের সূর্যসন্তান। তারা প্রকৃত দেশপ্রেমিক। তারা যুদ্ধ করেছেন দেশের প্রেমে, পাকিস্তানি শাসক চক্রের বৈষম্যমূলক অন্যায়ের বিরুদ্ধে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতন থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করার জন্য। তাদের প্রতি জাতি বিনম্র শ্রদ্ধাবনত। তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ সম্মান দেওয়া হচ্ছে এবং সবসময়ই দেওয়া হোক। তাদেরকে ‘স্বল্প’ ভাতার পরিবর্তে মোটা অংকের সম্মানী দেওয়া হোক। তাদেরকে বিনা পয়সায় আজীবন চিকিৎসা সেবা দেওয়া হোক। তাদের জন্য জাতীয় সংসদে আসন রংরক্ষিত করা হোক। কিন্তু সেটা কোটার মাধ্যমে তাদের ছেলে-মেয়ে কিংবা নাতি-পুতির জন্য নয়। বাবার অপরাধে তার ছেলে-মেয়ে কিংবা তার নাতি-নাতনিদের যেমন শাস্তি দেওয়া যায় না, তেমনি বাবার কোনো ভালো কাজের জন্যও তার ছেলেকে কিংবা তার নাতি-নাতনিকে পুরস্কৃত করার যুক্তি নেই।

মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলে-মেয়ে কিংবা নাতি-নাতনিরা যদি নিজের যোগ্যতায় পুরস্কৃত হওয়ার জন্য মেধা অর্জন করতে পারে, তাহলে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু পিতা কিংবা দাদা-নানার যোগ্যতা দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করার সুযোগ নেওয়া অন্যায়। আর যারা এই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন, তারাও চরম অন্যায় করেছেন।

এতদিন জানতাম যে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের গঠনমূলক কোনো কিছুর সমালোচনা করলেই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা রাজাকার বা রাজাকারের ছেলে-মেয়ে বলে ট্যাগ দেন। এখন দেখতেছি, কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে কিছু বললেও মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলে-মেয়ে এবং নাতি-নাতনিরাও রাজাকার বা রাজাকারের ছেলে-মেয়ে বলে ট্যাগ দিচ্ছেন!

শুনেন হে মুক্তিযোদ্ধার ছেলে-মেয়ে ও নাতি- নাতনিরা, শুধুমাত্র আপনাদের পিতা-মাতাই মুক্তিযোদ্ধা নন। পত্যক্ষভাবেই হোক কিংবা পরোক্ষভাবেই হোক, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এদেশের শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষেই মুক্তিযোদ্ধা ছিল। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের মাথামোটা ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদেরকে আবু জাফর সামসুদ্দিনের লিখিত ‘কলিমুদ্দি দফাদার’ গল্পটি একটু পড়ে দেখার পরামর্শ দিচ্ছি। লেখক অত্যন্ত নিখুতভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ সম্পর্কে ফুটিয়ে তুলেছেন।

একাত্তরের যুদ্ধের সময় ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল আমাদের ডাকবাংলোতে আশ্রয় নিয়েছিল। কারণ আমাদের বাড়িটি ছিল সুরমা নদীর পাড়ে। ওই নদী হয়ে পাক বাহিনী লঞ্চযোগে সুনামগঞ্জ থেকে সাচনাবাজার ও জামালগঞ্জে আসা-যাওয়া করতো। মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পনা করেছিলেন আমাদের ডাকবাংলা থেকে পাক বাহিনীর লঞ্চে আক্রমণ করবেন। আমার পরিবার ওইসব মুক্তিযোদ্ধাদের দশদিন যাবত থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারের জন্য বাজার থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আনতে গিয়ে আমার বাবাকে পাক বাহিনীর প্রচণ্ড নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। পাক বাহিনী বাবাকে গুলি করে হত্যা করার জন্য লাইনে দাঁড় করিয়েছিল। পরে স্থানীয় একজন মাওলানা পাক বাহিনীর কাছ থেকে লাইনে দাঁড় করানো সাধারণ মানুষদেরকে মুক্ত করে দেন।

আমি মনেকরি, আমার পরিবারেই মতো একাত্তরের যুদ্ধের সময় দেশের শতকরা ৯৮ জন মানুষই পত্যক্ষভাবেই হোক আর পরোক্ষভাবেই হোক স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তাই ব্যক্তিস্বার্থে কাউকে রাজাকার বা রাজাকারের ছেলে-মেয়ে বলে ট্যাগ দেওয়ার আগে একটু চিন্তা করে ট্যাগ দেওয়া দরকার।

পরিশেষে বলব, অবিলম্বে এসব কোটা পদ্ধতি বাতিল না করলে বাংলাদেশ ‘মেধা প্রতিবন্ধী’ রাষ্ট্রে পরিণত হতে বেশি সময় লাগবে না। আর বাংলাদেশের মানুষ ইতিমধ্যে এর কিছু আলামতও দেখতে পাচ্ছেন। আমি বাংলাদেশ সরকারকে বলব, এসব কোটা পদ্ধতি বাতিল করে মেধার মূল্যায়নে এগিয়ে আসতে। চাকরির যোগ্যতা হোক মেধা, কোনো কোটা নয়- এই আবারো প্রত্যাশাই ব্যক্ত করছি।