ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

বাংলা সিনেমা বিশেষতঃ নাটকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়–এদেশে যখন বিটিভি চালু হয় তখন ভারতীয় বাঙালিরা আমাদের বিটিভি  এবং বিশেষত আমাদের নাটিকা দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ত।

ভারতীয় বাংলাটিভি তারা তেমন দেখতোই না, বেগম খালেদার শাসনামলে একটা জরিপের সময় ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের কাছে যখন প্রশ্ন করা হয় যে, পশ্চিম বঙ্গের প্রধানমন্ত্রীর নাম কী?

তখন তারা নির্দ্বিধায় জবাব দিয়েছিলো—পশ্চিমবঙ্গের  প্রধানমন্ত্রীর নাম খালেদা জিয়া।

এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছিলো? বাংলাদেশী টিভির প্রভাবেই তারা প্রভাবিত হয়েছিলো বলেই তারা তাদের প্রধানমন্ত্রীর নামও ভুলে গিয়েছিলো। তাই মিডিয়া যা খাওয়াবে আমরা নিরুপায় হয়ে তাই খেতেই বাধ্য, এটাই বাস্তবতা। ভালোমন্দের বাছবিচার তখন থাকেনা।

এখন এবারের ঈদে যেমন পাখি ড্রেসের প্রভাব দেখা গেলো, এটার জন্য কি আমাদের সন্তানরাই দায়ী নাকি যারা এটা পরিকল্পিতভাবে বাজারজাত করেছে, তারাই দায়ী? এ পোশাক বাজারজাত না হয়ে অন্য যেটাই আসতো বাজারে; আমরা কিন্তু সেটাই লুফে নিতাম বাধ্য হয়ে বিশেষতঃ যারা রেডিমেড পোশাকের বাইরে পোশাক বানাতে আদৌ আগ্রহী নই?

তাই এক্ষেত্রে  আমাদের জনগণ নারী বা পুরুষ কারুর দোষ নেই–দোষ হচ্ছে মিডিয়াম্যানদের যারা এসব তৈরি করে, বাজারজাত করে আমাদের যা-ই খাওয়ায় আমরাও অবলীলায় তাই খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি, বাধ্য হই। যেমন-ওয়াসার পানিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ যদি সাধ করে আতর মিশিয়ে দেয়, তবে আমরা কিন্তু আতরের গন্ধও পাবো এবং সেই পানি খেতেই বাধ্য হবো। কিংবা কেউ শয়তানী করে জনগণকে ক্ষমতা দেখাতে যদি ওয়াসার পানিতে নোংরা কিছু ছড়িয়ে দেয়, আমরা কি তা খেতে বাধ্য হবোনা? আমরা এমনিতে প্রায়ই তো পানিতে কেঁচো পাই, মল-মূত্র পর্যন্ত খেয়ে থাকি। প্রতিবাদ করে কিছুই হয়না বা হবেনা। 

সুতরাং স্টার জলসাসহ সব ভারতীয় চ্যানেল বন্ধ করলেও আমাদের লাভছাড়া ক্ষতি হবেনা। আমি তথ্যমন্ত্রণালয়ের অফিসার হিসেবে ফিল্ম সেন্সরবোর্ডের কাজও জানি কিভাবে ভালো-মন্দ ফিল্মগুলো ছাড়পত্র পায়। ফিল্ম ইণ্ডাস্ট্রিজের এ টু জেড পর্যন্ত আমার জানা আছে। সরকার  যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে, আমাদের ডিসলাইন ছাড়া ভারতীয় চ্যানেল চলবেনা বা বন্ধ, তবে তাই হবে, আমরা যতই ভারতীয় চ্যানেলের পক্ষে থাকিনে কেনো? এটাই বাস্তবতা।

ভারতীয় বাংলা চ্যানেলে প্রতিটি সিরিয়ালেই দেখা যায় একটি মেয়ে চারপাঁচটি পুরুষের সাথে ঘর করছে, বিবাহ বা তালাকের বালাই নেই যাকে বলে পরকিয়া-প্রেম। ধর্মের বিরুদ্ধে,নৈতিকতা আর শালীনতার বিরুদ্ধে গিয়ে যত অসামাজিক নোংরামো আছে সবই চালিয়ে দিয়ে আমাদের মন-মানসিকতাকে কব্জা করা হয়। ছেলেদেরও পরকিয়া বা ৪/৫টি অবৈধ সম্পর্ক বা বিবাহকে বৈধ বলেই দেখানো হয়, যা হিন্দুধর্মেও সমর্থনযোগ্য নয়।     

রক্তের সম্পর্কগূলোকে ভেঙ্গেচূরে তাদের মাঝে পারস্পারিক অবিশ্বাস-সন্দেহ-দ্বন্দ্বকে স্বাভাবিক ঘটনা বলেই চালিয়ে দেয়া হয়। সংসারে বড়দের বা শ্বশুর শ্বাশুড়ির সাথে সম্মানজনক আচরণের বদলে অপমানের সংস্কৃতির  শিক্ষা দিয়ে মন্দদিকগুলো তুলে ধরা হয় । অত্যন্ত দুর্বল ও নিম্নমানের অসংগতিহীন গল্পের বেড়াজালে আটকিয়ে সস্তা সিরিয়ালগুলোতে শুধু ভুলশিক্ষা দেয়ার চেষ্টাই চলে। 

download (1)

এটা ঠিক যে, আমাদের লেখক, নাট্যকাররা এমন সস্তা সিরিয়াল যেমন লেখেন না বা লিখলেও তা হালে পানি পায়না যেহেতু এখানে এসকিছু এখনো শিল্পের পর্যায়ে যায়নি কিংবা শিল্পের মর্যাদাও পায়না। আমাদের টিভিগুলোও এমন মেঘাসিরিয়ালের উদ্যোগ নিচ্ছেনা নানাকারণেই। আমার এক বন্ধুর ৩২ পর্বের ধারাবাহিক একটা চ্যানেলে চললেও তিনি এখনো সেই চ্যানেলের নিকট ১৬/১৭ লাখ টাকা পায়। তাহলে বোঝেন ঠেলা!  তাই বলে আমাদের নাটক কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের যা ভারতীয় লেখকসহ বিদগ্ধজনরাই দাবী করে থাকেন।

ভারতীয় সিরিয়াল বিশেষত জলসা আর জিবাংলার নাটকের সাহিত্য-সামাজিক  মান ৪০%ও নেই–কাহিনীর ধারাবাহিকতাবিহীন, বাস্তবতা ও সমাজের সাথে সঙ্গতিহীন বানোয়াট কাহিনী সাজিয়ে কিছুটা দ্বন্দ্ব ও এডভেঞ্চার সৃষ্টি করে আকর্ষণ তৈরি করা হয় মাত্র। তবে ভারতীয় শিল্পীদের নিখুঁত ও অকৃত্রিম অভিনয়ের বলেই তাদের নাটক কিছুটা আকর্ষণ সৃষ্টি করে দর্শকদের মাঝে, এই যা।

অনেকেই হয়তো জানেনা যে, আমাদের চ্যানেল ভারতে নিষিদ্ধ এমনকি আমাদের বই-পুস্তকও সেখানে হালে পানি পায়না। কিন্তু তাদের সবই এখানে বাজারদখল করে আমাদের অর্থনীতিকে শুষে নিচ্ছে। এতে আমাদের কী লাভ হচ্ছে?

কার্টুন চ্যানেলগুলোও শিশুদের নৈতিকতা  ভেংগে দিয়ে মিথ্যাচার, স্কুলফাকিবাজী, শয়তানী কাজই শেখাচ্ছে আমাদের শিশুদের। তাদের  চ্যানেলে সুশিক্ষাবিহীন ও কুশিক্ষায় ভরপুর আনন্দ-বিনোদন ব্যতীত আর কিছুই নেই।

সুতরাং এসব চ্যানেল বন্ধ হলে আমরা সেই আগের মতোই আমাদের টিভি দেখতেই বাধ্য হবো; তবু ডিসলাইন কেউ কেটে দেবোনা জিবাংলা বা ভারতীয় চ্যানেল না দেখার  দুঃখে!

এখন নিচের লিঙ্ক পড়ুন, যা লিখেছেন একজন সহব্লগার ভাই-এখানে ক্লিক করুন