ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

সদ্য পাওয়া খবর (স্ক্রলে): “নীলফামারি ও লালমনিরহাটে এর মধ্যে প্লাবিত হয়েছে ৯টি গ্রাম।
শিশু: “প্লাবিত” কী মা?

খবর : ১০ নং বিপদ সংকেত থাকায় বন্দরে জাহাজ থেকে মালামাল খালাস করা আপাতত বন্ধ আছে।
শিশু: মা “খালাস” কী?

একটি ছোট্ট শিশু স্ক্রলে সদ্য পাওয়া খবর দেখতে দেখতে বা খবর শুনতে শুনতে এরকম প্রশ্ন করার অভিজ্ঞতা আমার / আপনার অনেকের আছে। জন্মের পর থেকে শিশুর কৌতূহলকে পরিচর্যা করা হয়, তাহলে এরকম অপরিচিত, না-বোঝা শব্দের অর্থ ও কথার ব্যাখ্যা জানতে চাইবে। খবরে পঠিত বা লিখিত অপরিচিত,নাবোঝা, দুর্বোধ্য শব্দ বা শব্দবন্ধের তাৎক্ষণিক অর্থ বা ব্যাখ্যা শিশুকে তার চাহিদামতো দিতে হয়। তাহলে এভাবে খবর শুনতে শুনতে বা দেখতে দেখতে দেখতে শিশুর শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধি হয় তথা ভাষার বিকাশ হয়।

মাবাবার সাথে টিভিতে শিশুর খবর দেখা, মাবাবার ধারণায় খবরের যে ঘটনা-অংশ শিশুর কাছে নতুন, অপরিচিত হিসেবে মনে হবে তা বিশেষভাবে দেখার জন্য বলা যেতে পারে।শিশুর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ঘটনাটির ব্যাখ্যাও দেওয়া যেতে পারে সে সময়। অন্য দিকে রাতে শুয়ে ছোট্ট শিশুটিকে ঘুমানোর আগে খবরের ঘটনার ওপর কথোপকথন হতে পারে। এভাবে টিভি দেখা শিশুর ভাষা ও জ্ঞানের বিকাশে সহায়ক হতে পারে। এত গেল ইতিবাচক উদাহরণ।

শিশুর টিভি দেখার নেতিবাচক দৃষ্টান্তও আছে। যেমন- অনেক বাবা মা শিশুসন্তানকে সাথে নিয়ে /পাশে বসিয়ে অথবা খাওয়াতে বসে একসাথে টিভি দেখে-সিরিয়াল নাটক, মোভি, ঢালাও বিচার-বিচেনাহীন খবর দেখে না বুঝে ইত্যাদি।বিশেষ করে ছুটির দিনে শিশুকে পাশে নিয়ে লম্বা সময় ধরে বড়দের জন্য প্রযোজ্য সিনেমা দেখে যা নাচে-গানে ভরপুর-ঝুমুর ঝুমুর। এগুলো শিশুর টিভি দেখার নেতিবাচক দৃষ্টান্ত।প্রশ্ন জাগতে পারে, এগুলো নেতিবাচক দৃষ্টান্ত কেন?

প্রথমত, বড়দের অনেক জটিল (পুরনো এবং বর্তমান উভয় অর্থে) দৃশ্য, ঘটনা ও সম্পর্ক শিশুরা দেখে মানসিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না। যেমন, ইন্ডিয়ান সিরিয়ালে কিংবা কখনো কখনো এদেশীয় নাটকেও সম্পর্কের জটিল-কুটিল সমীকরণ দেখানো হয়। দেখানো হয় কঠোর-নির্মম ঘটনার দৃশ্য। আসলে বড়দের সহজপাচ্য ঐ সব জিনিস শিশুদের জন্য খুবই দুষ্পাচ্য।সহজ করে বললে বলা যায়, ঐসব দৃশ্য, ঘটনা, সংলাপ, শিশুদের কোমল মনকে ধ্বংস করে। ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে তার স্বাভাবিক বিকাশ।
বড়দের টিভি শো দেখতে দেখতে শিশুর শিশুত্ব তথা শিশুসুলভ স্বভাব-আচার-আচরণ নষ্ট হয়ে যায়। সব কিছু পাকার একটা পর্যায় আছে। ধাপে বয়সে বা সময়ে ফল পাকে, মানুষ বয়স-প্রাপ্ত হয়। অসময়ে পাকলে তাকে বলে “পচন”, কাঁচাবয়সে বয়স্ক হয়ে গেলে সবাই তাকে বলে “পতন” বা “অধঃপতন”। ভুল করেও, আমরা নিশ্চয় আমাদের সন্তানদের অকালে বা কাঁচা বয়সে “পচন” ও “পতন” কিছুই চাই না।

অনেক / কোনো কোনো বাবামা শিশুকে বাইরে খেলতে কিংবা বেড়াতে কিংবা কোনো শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ও সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমে নিয়ে যেতে না পেরে বিকল্প হিসেবে বাসায় টিভি মা কম্পিউটারে কার্টুন দেখা বা গেইম এর সুযোগ করে দেন। ভাবেন, অন্ততঃ শিশু-সন্তান ব্যস্ত থাকল তো। আবার কেউ কেউ আরও কয়েক ডিগ্রি উপরের স্তরে উঠে যান। তাঁরা শিশুর হাতে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে দেন। ফলে, ধাপে ধাপে শিশুর মধ্যে টিভি দেখার আসক্তি তৈরি হয়ে যায়। একবার যদি শিশুর মধ্যে এটা / টিভি দেখার আসক্তি তৈরি হয়ে যায়, তাহলে শিশুটি শুধু এ-ধরনের টিভি দেখার সুযোগ খুঁজবে। কারণ তার অন্য কিছুর প্রতি কৌতূহল নষ্ট হয়ে যাবে। সে নিজের বাসায় চেষ্টা করবে সারাক্ষণ টিভি দেখতে। পাশের বাসায় চেষ্টা করবে। যেখানে বেড়াতে যাবে বেড়াবার বিষয়, ঘুরে দেখার বিষয় বাদ দিয়ে শুধু টিভি দেখায় মত্ত হয়ত চাইবে। এমনকি শিক্ষার সাথে তার মনের যোগ করা যাবে না।বিয়োগ ঘটবে। সমস্ত মনের যোগ টিভি আসক্তিতে গিয়ে ঠেকবে, শিক্ষা থেকে যাবে সরে। সুতরাং মাবাবাগণ শিশুর সাথে নেতিবাচক টিভি দেখা বাদ দেবেন। শিশু একাকী, অতি স্বাধীনতা নিয়ে যেন দীর্ঘ সময় ধরে টিভি না দেখে সেদিকে খেয়াল রাখবেন।

আমাদের দেশের টিভিতে খবরে এমনসব দৃশ্য দেখানো হয় যায় যা শিশুর সংবেদনশীল মনের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ২০১৩ সালে জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন, নির্মম-নৃশসংসভাবে মানুষ হত্যার খবর টিভিতে টানা দেখানো হত। আমার জানামতে অনেক শিশুর মানসিক সমস্যা হয়েছে।

অনেক নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হল। এবার দু-একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত দিয়ে শেষ করি।

টিভিতে অনেক ভালো জিনিস দেখানো হয়। বাবা হিসেবে আমাকে শিশুর জন্য কোনটা উপযোগী (কোনটা অনুপযোগী তা এখানে আলোচ্য বিষয় নয়) তা জানতে হয়। যদিও তার কোনো ট্রেনিং পাবেন না। আপনাকে নিজ থেকেই অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জেনে নিতে হবে। টিভিতে ভালো জিনিস, শিশুর উপযোগী অনুষ্ঠান শিশুকে সঙ্গে নিয়ে উপভোগ করুন। যেমন – আমার শিশু-সন্তানকে আমি ঐতিহাসিক ডকুমেন্টারি চললে দেখাই, সাথে নিজেও দেখি। প্রদর্শিত বিষয়, চরিত্র, ঘটনা নিয়ে পারস্পরিক আলোচনা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করি। তবে তাতে যেন ডকুমেন্টারি দেখার মজাই নষ্ট না হয় সে দিকেও খেয়াল রাখি। বলতে পারেন মাবাবা ও সন্তান মিলে শেয়ার্ড টিভি দেখার চর্চা হয় আমাদের ড্রয়িং রুমে।

পরিশেষে বলছি, অল্প বয়স থেকে শিশুকে যদি মাবাবা টিভি দেখার ক্ষেত্রে নেতিবাচক চর্চা করতে না দেন, নিরুৎসাহিত করেন, বুঝিয়ে ও নিজে না দেখে রোল মডেল স্থাপন করেন তা শিশু মান্য করবে। তবে সুস্থ বিনোদনধর্মী, শিশু-বয়সউপযোগী প্রোগ্রাম ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে মাবাবার সাথে সংবাদ/খবর নিজে দেখা ও শিশুকে দেখিয়ে ঐ বিষয়ে আলোচনা করার মাধ্যমে টিভি দেখাকে শিশুর বিকাশে সহায়ক হিসেবেও কাজে লাগান যেতে পারে।