ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য বা দিকনির্দেশনা না দিয়ে ডিনস কমিটি বা ভর্তিপরীক্ষা কমিটির সভা করে– এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে ‘এখন থেকে কেবল একবারই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা যাবে’। এটা মাথা ব্যথা সারাতে মাথা কেটে ফেলার মত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এটি একটি অন্যতম কান্ডজ্ঞানহীন ও দায়-এড়ানো ‍সিদ্ধান্ত মনে হচ্ছে আমাদের কাছে।

যেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের কত বেশি বার ভর্তিপ্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া যায়, তাদের যাচাই করে যোগ্যতমদের অন্তর্ভুক্ত (ইনক্লুশন) করা যায়, সেই চেষ্টা করার নির্ভরযোগ্য প্রক্রিয়া আবিষ্কার করা উচিত, তা না করে শিক্ষার্থীদের বাইরে রাখা বা অন্তর্ভুক্ত যেন না হতে (এক্সক্লুশন) পারে সে চেষ্টা করার প্রতিবন্ধী বা খোঁড়া যুক্তি- “দ্বিতীয়বার ভর্তির সুযোগ দেওয়া হলে অসম প্রতিযোগিতা হয়। এছাড়া ভর্তি-বাণিজ্যের সুযোগ…” যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মহোদয়ের মুখে টিভি নিউজে শুনে আমি বিস্মিত হয়েছি। পত্রিকায় (প্রআ) এরকম উদ্ধৃত করা হয়েছে, তিনি দাবি করেছেন, “দ্বিতীয় বার যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়, তাদের দীর্ঘ প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে পরীক্ষায় একটি অসম প্রতিযোগিতা হয় এবং কোচিং-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। দ্বিতীয় বার ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করলে আসন খালি থাকার সংখ্যাও কমবে বলে মনে করেন উপাচার্য।” ভর্তি-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে, কোচিং এর বিরুদ্ধে তো সারাদেশ। তাছাড়া, সমস্যা আছে সমাধান করতে হবে। তাই বলে এমন কান্ডজ্ঞানহীন ও দায়-এড়ানো ‍সিদ্ধান্ত!? আসল জায়গায় কাজ না করে, দোষীর শাস্তি না দিয়ে বিচার-প্রার্থীর শাস্তি ঘোষণা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ!

শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় বার ভর্তিপরীক্ষার সুযোগ দেওয়াকে নীতিগতভাবে সমর্থন করলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় তা অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করছে। তবে তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নতুন সিদ্ধান্ত আগামী বছরের পরিবর্তে ২০১৬ থেকে কার্যকরের পক্ষে মত দেন।

এটা ঠিক, ভর্তির সুযোগ একবারই করার পক্ষেও যুক্তি আছে। কিন্তু যারা দুইবছরের সুযোগের পক্ষে তাদের যুক্তিগুলিও শুনে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। যেমন, ড. রাহমান নাসির উদ্দিন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, দুই বছরের সুযোগের পক্ষে তিনটি মূল্যবান যুক্তি হাজির করেছেনঃ “ক.ঘোষণাটি যদি এ বছর ভর্তিপরীক্ষার আগে নেওয়া হত, তাহলে পরীক্ষার্থীরা আগে থেকেই অধিকতর সচেতন হত, যাতে একজন শিক্ষার্থী আগেই জানত যে, ভর্তিপরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য তার একবারই সুযোগ আছে, দ্বিতীয়বার কোনো সুুযোগ নেই। ফলে সে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে ভর্তিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হত। কিন্তু ভর্তির সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করে, ভর্তিপরীক্ষা শেষ করে, এমনকি ফলাফল ঘোষণা করার পর যখন সিদ্ধান্ত জানানো হয় যে, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা আর দ্বিতীয় বার পরীক্ষা দিতে পারবে না, তখন এটা তাদের প্রতি এক ধরনের অবিচার। খ.এক ঘণ্টার একটা ভর্তিপরীক্ষা আদৌ একজন শিক্ষার্থীর মেধা যাচাইয়ের জন্য যথযাথ কিনা তা নিয়ে আমার গুরুতর সন্দেহ আছে। ফলে কোনো কারণে একজন শিক্ষার্থী যথেষ্ট মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও একবার পরীক্ষা দিয়ে কৃতকার্য না-ও হতে পারে। তাই বলে, তার জীবনের সব স্বপ্ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করবার সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যাবে? সে কি আরেকবার নিজেকে পরীক্ষা করার সুযোগ পাবে না? তাকে আরেকবার তার মেধা যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়? গ.আমরা এমন একটা সমাজে বাস করি যেখানে যে কোনো সময় যে কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে। সড়ক দুর্ঘটনা তো আমাদের নিত্যদিনের জীবনের অংশ যা সংবাদপত্রের কমন নিউজ আইটেম। তাছাড়া রোগ-শোকের বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।উদাহরণ হিসেবে মনে করি, পরীক্ষার দিন সকালে কোনো পরীক্ষার্থীর মা বাবাবা মারা গেল (খোদা কারও ক্ষেত্রে এটা না করুক), সে কি তখন মা বা বাবারলাশ ফেলে পরীক্ষা দিতেযাবে? এই যে আকস্মিক ঘটনা বা দুর্ঘটনা, তার জন্য কিসে দায়ী? কিন্তু দ্বিতীয়বার সুযোগ না থাকার ফলে, সে শিক্ষার্থী যথেষ্ট মেধাবী হওয়ার পরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ তার জীবনে আর কোনো দিনআসবে না। এটা কি তার প্রতি অন্যায় ও অবিচার নয়? জীবন তো একটাই, তার কি আরেকবার সুযোগ পাওয়া উচিত নয়?” (বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম)।

বিকল্প প্রস্তাব এসেছে, ঢাবি কতৃপক্ষ “প্রয়োজনে দ্বিতীয়বারের পরীক্ষার্থীদের জন্য নম্বর কর্তনের ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে। কিন্তু তাঁদের পরীক্ষা দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেখাদেখি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় অনুরূপ সিদ্ধান্ত নিলে (ইতিমধ্যেজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে) অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। পোয়াবারো হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের “ (প্রআ, সম্পাদকীয় ১৮.১০.২০১৪)।
অন্য দিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পাবলিকের প্রতি এর দায় অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে ভিন্ন ও বেশি। যারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েপড়ার চেয়ে নানা কারণে এক বছর নষ্ট করতে আগ্রহী, তাদের কথাও ভাবতে হবে, বিবেচনায় আনতে হবে।
আবার এমন জন/পাবলিক-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে/ইস্যুতে হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়াও ঠিক হয়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে দুই পক্ষের যুক্তিগুলি বিবেচনায় এনে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কর্তৃপক্ষ শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা করে অধিকতর গ্রহণযোগ্য একটি উপায় বের করতে পারে। (প্রআ, ঐ)।

‘এখন থেকে কেবল একবারই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষায় অংশগ্রহণকরা যাবে’। শিক্ষাক্ষেত্রে এটা বিচ্ছিন্ন নয়। প্রতিদিন শিক্ষাক্ষেত্রে এমন  কান্ডজ্ঞানহীন ও দায়-এড়ানো ‍উদ্যোগ, প্রস্তাবনা ইত্যাদি শুনে, পড়ে ও দেখে আমাদের ভীষণ হতাশ লাগছে। বিশেষ করেআমাদের সন্তান, দেশের আগামি প্রজন্মের জন্য ভীষণ হতাশাজনক ভবিষ্যৎদেখে খারাপ লাগছে। আতংক জাগছে। আমাদের সমাজ কি দিনে দিনে যুক্তি-বুদ্ধিবিবর্জিত, কান্ডজ্ঞানহীন ও দায়-এড়ানো সমাজে পরিণত হতে চলেছে?!!

আশা করি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ যুক্তি, কান্ডজ্ঞান ও সামাজিক দায় ফিরে পাবেন, এমনকি শিক্ষাবিদসৈয়দ মনজুরুল ইসলাম  স্বীকৃত নৈতিক বিবেচনা জাগ্রতহবে, সেই সাথে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবেন।