ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

“নিজে যাকে বড় বলে বড় সে-ই হয়। লোকে কাকে কী কলিল শুনিবার নয়।” আত্মমুখে প্রচার বা আত্মপ্রচার বা নিজের ঢোল নিজের হাতে পেটানো একটি নির্লজ্জ চাতুরি। এতে আত্মপ্রচারকারী শ্রোতার কাছে নির্লজ্জতার দোষে দুষ্ট একজন উপহাসের পাত্র। আত্মপ্রচার একটা বাজে প্রবণতা আমাদের সমাজে বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষ্ করছি। এটা এভাবে দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকলে একটি ‘নির্লজ্জ সমাজ’ গড়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েই যায়। অধিকাংশ মানুষ ধাপে ধাপে র্লিজ্জভাবে আত্মপ্রচারে মেতে উঠেছে। যেমন- নিজের কাজ সম্পর্কে উচ্চ কণ্ঠে দাবি আমার কাজ সবচেয়ে উন্নত। অমুক, তমুক, সবাই বলে, আমি সবার চেয়ে দক্ষতার সাথে কাজ করছি। স্যার, সবাই বলে আমি খুবই নিবেদিত কর্মী। আমার হাতে, আমার সময়ে এই বিভাগে/মন্ত্রণালয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ হয়েছে ও মানের উন্নতি ঘটেছে।

নিজের ঢোল নিজে পেটানোর এই যে সংস্কৃতি তাকে এখন অধিকাংশ মানুষ নির্লজ্জভাবে গ্রহণ করেছে। এটা কখনো কখনো মিথ্যাচারেও পরিণত হতে দেখা যায়। এক সময় এটা ছিল নির্লজ্জতার পরিচায়ক। এখন এটাও আরেকটা সামজিক-সাংস্কৃতিক প্রবণতা যে কোনো কাজে লজ্জা পেতে নেই। লজ্জা সফলতার পথে অন্তরায়। বৈষয়িক উন্নতির জন্য নির্লজ্জতার চূড়ান্ত করাও মনে করা হয় স্বাভাবিক, বুদ্ধিমান কাজ। আসলে এগুলো চাতুরি। চাতুরি সমাজে নতুন নয়, যুগ যুগ এমনকি শতাব্দি ধরে চলে আসছে। তাই বলে তা এত ব্যাপকতা পায়নি কোনো কালে। অতি গোপনে চাতুরি করত চতুর লোকেরা। তারা নিজেরা স্বীকার করত না যে নির্লজ্জভাবে সেকোজটি করছে। কিন্তু আজকাল বুক উঁচিয়ে নির্লজ্জ হওয়ার, চতুরতার, আত্মপ্রচারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে সমােজের অধিকাংশ মানুষ। সবাই নির্লজ্জতার সাথে নিজের ঢোল পেটাচ্ছে। সফলতার জন্য চাতুরি করছে, পঞ্চমুখে মিথ্যা-বানোয়াট কথা বলছে।

আমি একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কী হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে, সমাজে সর্বত্র? আমার সহকর্মীটি জানাল, এটাই পেশাগত নিয়ম। এটাই এখনকার সমাজ-সংস্কৃতি। সে বরং আমাকে এক ঘা দিয়ে দিলেন, বললেন, আপনি ব্যাকড্যাটেড হয়ে মিস করছেন। অন্যেরা আপনার গুণগান করবে, সেজন্য অপেক্ষা করে বসে থাকেন। কাঙ্ক্ষিত পেশাগত উন্নতির গুড়ে বালি,, বালি, বালি।

আমি বিশ্বাস করতে পারি না, আমার মনে হয়, এই নির্লজ্জ সমাজ-সংস্কৃতিটি নিশ্চয় বেশি দিন স্থায়ী হবে না, হতে পারে না। এসব নির্লজ্জতা চর্চাকারীরা জানে সে ভাড়ামো করছে। পুরস্কৃত হয়ে নিজেকে খুবই চতুর ও সফল মনে করছে। আবার কাকের মতো এও নাকি ভাবছে, কেউ কি দেখছে আমি যা করছি। সবাই দেখছে আমার সাফল্য। ভাবনাটা ঠিক নয়, সমাজের প্রতিবেশী, বা সহকর্মীরা কিন্তু দেখছে, বলছে, লোকটা একটা নির্লজ্জ বেহায়া। আসলে তার সাফল্য তাকে সম্মানিত করেনি।

আবার কেউ কেউ ভাবছে, কেউ সামনে এসে তো বলতে পারবে না, সে যে নির্লজ্জ সমাজ-সংস্কৃতির চর্চাকারী একটা বেহায়া। আবার তার ক্ষমতাবান হওয়ার ফলে কারো কি সাহস হবে, বলবে, তুমি নির্লজ্জ সমাজ-সংস্কৃতির চর্চাকারী, বেহায়া।

আবার আত্মপ্রচারকারীদের কেউ কেউ ভাবছে, আমি আমার উন্নতি চাই, যেভাবেই পারি। যারা চালাক-চতুর, বুদ্ধিমান নয়, বোকা তারা পেছনে সমালোচনা করুক। আমার এসব শোনার সময় কোথায়। উন্নতির জন্য কত কিছুই না করতে হয়, ইতিহাসে তার প্রমাণ মেলে। ইংরেজদের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার জন্য তখনকার সমাজের চালাক-চতুর-বুদ্ধিমানরা কি কম করেছে। নির্লজ্জতা কে দেখে, সবাই দেখে আমার সাফল্য। ফলে, আমার বন্ধুটি এও বলল, জানেন, এটা এখন সবাই অনুসরণ করছে। এমনকি, কাঙ্ক্ষিত পেশাগত উন্নতির জন্য আত্মপ্রচার আমাদের সমাজের এক কালের মানি-গুণিরাও অনুসরণ ও চর্চা শুরু করেছেন। নির্লজ্জতার সাথে নিজের ঢোল পেটানোর চাতুরি করছে, পঞ্চমুখে মিথ্যা-বানোয়াট কথা বলার ক্ষেত্রে সমাজটা ধাপে ধাপে নির্লজ্জ হয়ে উঠছে। তার মানে কি এই যে এটি একটি অনুসরণযোগ্য সমাজ-সংস্কৃতি? আমি মানতে পারি না। এটি চর্চাকারীকে যতই পুরস্কৃত করুক সম্মানিত করে না। মনে মনে সবাই তাকে ঘৃণার সাথে বলে, তুমি একটা নির্লজ্জ সমাজ-সংস্কৃতির চর্চাকারী, বেহায়া।

আত্মপ্রচার করে সফলতার মুখ দেখে দেখে কেউ কেউ এত আত্মপ্রেত্যয়ী হয়ে উঠেছে যে তারা সমাজটাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। কারণ এসব নির্লজ্জ সমাজ-সংস্কৃতির চর্চাকারীরা সমাজের নীতি-নির্ধারকের আসনে বসে কাজটি করছে। আশা করি, এসব নির্লজ্জ সমাজ-সংস্কৃতির চর্চাকারীরা সমাজের বিভিন্ন বিভাগে নীতি-নির্ধারকের আসন থেকে সরে যেতে বাধ্য হবেন। কারণ, নিজের যা নেই তা যতই ঢাকঢোক পিটিয়ে প্রচার করা হোক, একসময় এই মিথ্যাচারের পরিণতি দেখা দেবে। প্রচারিত ফল ভালো হতে পারে না। ফলে সমাজে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেবে। প্রমাণিত হবে, মিথ্যাচারের ফলে এই পরিণতি ঘটেছে। মিথ্যাচার বেশি দিন স্থায়ী হতে পারে না, এই বিশ্বাস রাখতে চাই।