ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

গতকাল যে আমার কাতারে ছিল, সাধারণ সহকর্মী, আজ সে, না-না তিনি, হঠাৎ করে হয়ে গেলেন বস/লীডার, মানে ক্ষমতাবান সহকর্মী নাকি প্রভু। আর আমরা সবাই তার অধস্তন সহকর্মী তথা ভৃত্যের সমান।
নব্য বস মিটিং ডাকলেন, মিটিংএ ঘোষণার মতো করে, কণ্ঠ বদলে বললেন, “পদাধিকার বলে আমি এখন থেকে আপনাদের লীডার। আমি যেভাবে বলবো সেভাবেই হবে, হতে হবে। আজ থেকে আপনারা আ মার মতামত ছাড়া কোনো কিছুই করবেন না। কর্তৃপক্ষ আপনাদের টাইট দেওয়ার জন্যই আমাকে আপনাদের লীডার বানিয়েছে। আমার কথার অবাধ্য হলে কী হতে পারে, আমি কী করতে পারি তা টের পাবেন, উল্টা-পাল্টা করলে। একদম চাকুরি নট।” আমরা ভাবনায় পড়ে গেলাম, কীভাবে বসকে সন্তুষ্ট রাখতে হবে। কোনটাকে উনি ঠিক ভাবেন আর কোনটাকে উল্টা-পাল্টা তাতো বঝে নিতে হবে। না হলে চাকুরি নট। শুরু হল, বসকে বোঝা, বসকে খুশি করার ওপর গুণগত গবেষণা।

গতকালকের সহকর্মী তিনি এখন আর নন। এখন তো তিনি বস, এখন আর আগের মতো তিনি দেখলে সালাম আমাকে দেবেন না। গতকাল পর্যন্ত তিনি সকাল বেলা আমাকে সালাম দিয়ে অফিসে ঢুকতেন । আজকে সকালেও তাই ঘটেছে। কাল থেকে তিনি তৈরি হয়ে থাকবেন সালাম পাওয়ার জন্য। সালাম দিলে উনি ঠান্ডা থাকবেন।
এরকমই দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতা কারো হয়েছে কিনা জানি না। আমার হয়েছে। আমি দুর্ভাগ্যবান ভাবতাম প্রথমে। পরে আমার এক ক্রিয়েটিভ সহকর্মীর টিপস ব্যবহার করে কাজ হয়েছে। তার টিপস হলো: ”বস যখন প্রভুর মতো আচরণ করবে তখন দেখবি যেন এবসার্ড নাটক দেখছিস মজা পাবি “ তারপর থেকে নিজেকে হতভাগ্য না ভেবে একজন অপূর্ব এবসার্ড নাটক এর দর্শক ভাবতে শুরু করলাম। বসকে ভাবলাম তার প্রধান চরিত্র। আমি নিজেও আছি আরেকটি চরিত্রে। িএই যা।

সাধারণ থেকে যখন আমরা লীডার হই, ভাবি অসাধারণ হয়ে গেলাম। সাথে সাথে বদলে যাই অনেকেই, ভাবি, লীডার হওয়ার পর বদলে যাওয়াই নিয়ম। তাছাড়া, বদলে না গেলে লীডার হয়ে কী লাভ। আমরা তাই, লীডার হওয়ার পর অতীতে যেমন লীডারদের দেখেছি নিজেও সেরকম আচরণ করা শুর করি। মনে করি, ওটাই তো আমার এখন করতে হবে। আমাদের সামনে তো আর এর বাইরে ভালো কোনো লীডারের উদাহরণ নেই। আর ভালো কোনো উদাহরণ সৃষ্টি করতেও আমরা চাই না।
আমাদের ধারণা, লীডার হওয়া মানে ক্ষমতাবান হওয়া। এরকমই অধিকাংশের ধারণা। তাই লীডার হওয়ার পর আমরা ক্ষমতা দেখাই। দেখাতে হয়। না দেখালে কেমন লীডার। সাধারণ আর লীডারে পার্থক্য সৃষ্টি করতে গিয়ে লীডাররা নিজেকে অন্য গ্রহেরও কখনো কখনো ভেবে বসেন। কিন্তু এসব লীডারদের তো একসময় আবার সাধারণের কাতারে আসতে হয়। তখন অনেক কিছুই ঘটে। লীডাররা তা ভাবেন না। লীডাররা ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে বড়ত্ব ফলান। ভয় দেখান। আমরাও তাদের ভয় পাই, শ্রদ্ধা দেখাই, শ্রদ্ধা করি না। লীডারকে ভালোবাসা? ভালোবাসার প্রশ্ন ওঠে না, অবান্তর। ভালোবাসার মানে ভুল বুঝলে তো চাকুরি হারাতে হবে নির্ঘাত।

লীডার হয়েছি, দু-চারজন তোষামুদেও তো লাগে। আমার কথার পরে জী স্যার, জী আপা শোনার জন্য কয়েকজনকে পাশে রাখতে হবে। তোষামুদে পরিবেষ্টিত না হলে কি লীডারের মজা হয়? তা্ই দু-চারজন তোষামুদেও চাই চারপাশে।
ক্ষমতা প্রদর্শন, ভীতি সৃষ্টি, তোষামুদে লালন এসব করে তো আর কাজ চলে না। তাই আরও কিছু শ্রমিক গোছের কাজের লোকও চাই। আসলে আমাদের দেশে লীডারদের কত কিছুই না করতে হয়। ক্ষমতা ভোগের জন্য হম্বিতম্বি করা শিখতে হয়। নিজেকে নবাব মীর জাফর আলি খাঁ (যার অনেক রক্ষিতা ছিল) কিসিমের কিছু একটা ক্ষমতাবান ভাবার জন্য কিছু তোষামুদে-খোসামুদে অধস্তন তৈরি বা নিয়োগ দিতে হয়, যারা কাজ করে না করে লীডারের তোষামুদ-খোসামুদ। আবার কর্মী মৌমাছির মতো দক্ষ লোকও লাগে। অনেক হাঙ্গামা। ফাইনালি অনেক কস্টিং, ব্যবসায়ে উন্নতিতে গুড়ে বালি। নেতৃত্বে পতন। তবুও শান্তি যে কদিন হোক মীর জাফরের মতো নবাবির ফলে অনেক ভোগ করার সুযোগ পেলাম বৈকি। এরকম ক্ষমতার ভোগই আমাদের লীডারদের কাঙ্ক্ষিত। খ্যাতি নয়, যশ নয়। দুদিনের ভোগ। জীবনে এটাই তাদের বিশাল প্রাপ্তিযোগ।
কর্মক্ষেত্রে লীডারশিপ সম্পর্কে এটি একটি আংশিক পর্যবেক্ষণ। আপনাদেরও অনেক পর্যবেক্ষণ অভিজ্ঞতা আছে অনেক। যোগ করুন মন্তব্যের মাধ্যমে। আমদের দেশে হবে সেই নেতা কবে? ক্ষমতায় বড় না হয়ে কাজে বড় হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য:
জানতে চাই আপনার অভিজ্ঞতাও। তাই আপনিও আপনার এ-বিষয়ক অভিজ্ঞতা মন্তব্যের ঘরে শেয়ার করতে পারেন।