ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

উন্নয়ন হলো উপহারের মতো। উপহার পেলে যেমন সবাই খুশি হয়, উন্নয়নের অংশীদার হতে পেরেও আমরা তেমনি সবাই খুশি হই। দেশের উন্নয়ন এমনই উপহার, এটা বিশেষ কারো নয়, সব নাগরিকের। এজন্য সবাই উন্নয়নের সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের সাফল্য ও উল্লেখযোগ্য অগ্রসরতার মূল্যায়ন ও অবস্থানধর্মী বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আমরা সবাই খুশি ও নিজেকে ধন্য মনে করছি।।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটিতে সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ ও ভারতের তুলনা করা হয়েছে, তাতে একটি বিশাল সংখ্যক ভারত-বিদ্বেষীরা চরম খুশি হয়েছে বলে আমি অনুমান করি। অনুমান করি, কারণ এই বিশাল নাগরিক ভগ্নাংশ খুশি হওয়ারই কথা থাকলেও খুশিটা প্রকাশ করছে না। আসলে বলা উচিত, বাংলাদেশের এহেন উন্নয়নে, এবং ভারতকে ছাপিয়ে গেলেও তারা মনের প্রকৃত প্রাণখুলে খুশিটা প্রকাশ করতে পারছে না। কারণ, তারা খুশি হলে, দ্বিতীয়বারের মতো সরকারে থাকা আওয়ামী লীগকে প্রশংসা করা হয়ে যেতে পারে। কারণ এই উন্নয়নের পেছনে বেশির ভাগ অবদান হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারকে স্বীকৃতি দিলে তো আর বিরোধী দলীয় চারিত্র্য থাকে না। ফলে, একটা উভয়-সঙ্কট তাদের জন্য যারা আওয়ামী বিরোধী, আবার ভারত বিদ্বেষী। অন্য দিকে, দেশের এরকম উন্নয়নের বিষয়টিকে অস্বীকারও করা যায় না। ঐ যে বললাম, উন্নয়ন হল, উপহার বা গিফটের মতো যাকে ফেরানো যায় না। আসলে, বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা তো সবাই দেশের নাগরিক। দেশের উন্নয়ন-সাফল্যে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারি না। তাই নীরবে সাফল্য উপভোগ করছি সবাই।

আসল কথায় আসি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ সামাজিক সূচকে ভারতের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এটা আমাদের জন্য মস্তবড় গর্বের খবর। এই গর্ব সবার, বাংলাদেশের সকল মানুষের। উন্নয়নকে যদি সুবাসিত বায়ু বা অক্সিজেনের সাথে তুলনা করি তাহলে এই সুবাসিত বায়ু বা অক্সিজেন সবার কাঙ্ক্ষিত, ও ভালোলাগার, সবার জন্য স্বাস্থ্যকর। এবং এই সুবাসিত বায়ু বা অক্সিজেন কেউ কুক্ষিত করারও উপায় নেই। তাহলে এই গর্ব নিয়ে একটু সাতকাহন করি।

আমরা জানি সামাজিক উন্নয়ন ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সামাজিক উন্নয়ন ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন যে মানুষের জীবনে, সমাজ জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে না তার প্রকৃষ্ট উদাহরণও ভারত। যে ভারতের মানুষ বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি আয় করলেও স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর বাংলাদেশের মানুষ গড়ে তাদের তুলনায় তিন বছর বেশি বেঁচে থাকে। তবে ভারতের তুলনায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে মেয়েরা। ভারতের মেয়েদের তুলনায় বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষার হার ৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি, নারীপ্রতি জন্মহারও দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট কম।

বিশ্বব্যাংক এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গড় আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র ৩৯ বছর, একই সময়ে ভারতের ছিল ৫০ বছর। আর এখন বাংলাদেশের মানুষ গড়ে বেঁচে থাকে ৬৯ বছর, ভারতে ৬৬ বছর। ১৯৭১ সালে প্রতি এক হাজারে ১৫০টি শিশুর মৃত্যু হতো, আর ভারতে ১১৪ জন। আর এখন বাংলাদেশে নবজাতকের মৃত্যুর হার ৩৭ জন, ভারতে ৪৪ জন। পাঁচ বছরের নিচে শিশু মৃত্যুর হার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ছিল হাজারে ২২৫ জন, ভারতে ১৬৬ জন। এখন বাংলাদেশে সেই সংখ্যা অনেক কমে হয়েছে ৪৬ জন, ভারতে ৬৫ জন। কিন্তু অর্থনিতক উন্নয়নে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে পিছিয়ে আছে। তবে উন্নয়ন করেছে বাংলাদেশ। যেমন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৫০ থেকে ৭০ ডলার। আর ভারতের ছিল ১১৬ ডলার। আর এখন ক্রয়ক্ষমতার সমতার (পিপিপি) ভিত্তিতে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৮৮৩ ডলার এবং ভারতের আয় ৩৮৭৬ ডলার। সুতরাং, আয়ের দিক থেকে বড় ব্যবধান থেকে গেলেও সামাজিক সূচকে অনেকটাই এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ।

Bd-India Comparison

আমরা জানি, উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের একটি বিরাট ভুমিকা নিতে হয়। সরকার এটা করে থাকে উন্নয়ন বান্ধব পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবে তা পালনের মাধ্যমে। বর্তমান সরকার ব্যবসা-বানিজ্জ্যের ক্ষেত্রে এই অসুবিধা দূর করেছে, একচেটিয়া ব্যবসায়ী তথা সিন্ডিকেট কলঙ্ক ও ব্যবসার বদলে একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলেছে, জঙ্গিবাদ নির্মূলের মাধ্যমে দেশে সুস্থ্য পরিবেশ রক্ষা করেছে, দুর্নীতিতে গড়া রেকর্ড নামিয়ে এনেছে, অবকাঠামো উন্নয়নে যথেষ্ট অবদান রেখেছে, নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে জঙ্গিবাদ দমন সহ অনেক বাস্তবমুখী পলিসি গ্রহণ করেছে। আর সে কারণেই নারীশিক্ষা, শিশুমৃত্যুর হার, জন্মহার, অপুষ্টির মতো সামাজিক সূচকগুলোতে একসময় যথেষ্ট পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ (এর উন্নয়ন ঘটেছে) বদলে গেছে। তারপরও এসব ক্ষেত্রে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়া বা তার অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া নিশ্চয় বিস্ময়কর। যাই হোক, এই উন্নয়নের ধারা যেন জারি থাকে সে ব্যাপারে সবাইকে চেষ্টা করতে হবে। তাহলে ২০২১ সালের মধ্যে আমাদের মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া অসম্ভব নয়।

প্রশ্ন জাগে, ২০২১ সালের মধ্যে আমাদের মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষণ আছে কি? অবশ্যই আছে। কারণ অর্থনীতিবিদরা মানছেন বাংলাদেশ সেদিকেই যাচ্ছে।জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই এখন ১৮৫১ ডলার, এটা অব্যাহতভাবে ২ দশমিক ১ ভাগ এবং মোট জিডিপি বছরে নিয়মিতভাবে সাড়ে তিন ভাগ হারে বৃদ্ধি পেতে হবে। আর তাহলেই ২০২১ সালে বাংলাদেশ তার ৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উদযাপনকালে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে।’

এই প্রতিবেদনের পর বাংলাদেশ ও তার জনগণকে নিজের শক্তির দিকে নতুন করে নজর দিতে হবে। মনের গহিনে লালন করতে হবে আত্মমর্যাদা ও আস্থা।তাই ঘটেছে মানুষের মনে। নিজ দেশের সাফল্যের কথা পড়ে একজন সিটিজেন বলেছেন, “ইনশাল্লাহ্ বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারবে। এর মূল কারণ এই দেশের মানুষগুলো অসম্ভব সহনশীল ও বিচক্ষণ। সুশিক্ষিত নেতৃত্ব আর আত্মস্বার্থের চাইতে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখতে পারলেই বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়ে যাবে।”
আরেকজন বলেছেন, “আমরা আজ ভারতকে পিছনে ফেলেছি । কাল মালয়েশিয়াকে টপকে যাব কোন সন্দেহ নাই । এখন আর পিছনে তাকিয়ে সময় নষ্ট করা যাবে না । এই বিশ্বব্যাংকই বাংলাদেশের মান সন্মান ভুলুন্ঠিত করে কাল্পনিক অর্থ আত্নসাতের অভিযোগে বাংলাদেশকে চোরের আখরা হিসাবে বহির্বিশ্বে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে । এই রিপোর্ট তৈরীতে তাদের নিশ্চয়ই অনেক শ্রম আর অর্থ ব্যয় হয়েছে যা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে তারা খুশী করতে চাইছে । এর পিছনে নিশ্চয়ই তাদের অন্য কোন কুটকৌশল আছে । সরকারকে এই বিশ্বব্যাংকের ব্যাপারে আরো বেশী সতর্ক হতে হবে ।”
আরেকজন বলেছেন, “এই অগ্রগতি কোন সরকার বা কোন প্রতিষ্ঠানের একার নয়। এই অগ্রগতি দেশের সকল মানুষের ত্যাগ, ধৈর্য ও তিতিক্ষার ফসল। তুমি এগিয়ে যাও বাংলাদেশ। শুধু ভারতকে নয়, সারা বিশ্ব কে পিছিয়ে ফেলে। এখন ভারতের সাথে তারপর চীন, সিঙ্গাপুর, প্রভৃতি দেশের সাথে তুলনা করে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।”

আরেকজন মন্তব্য করেছেন, “দেশের নেতৃত্ব সঠিক হাতে থাকলে, শত প্রতিকুলতা থাকা সত্তেও আমরা ঠিকই চ্যালেঞ্জে উত্তীর্ন হয়ে বিশ্বর বুকে মাথা উচু করে দাড়াব। তখন আমাদের তুলনা ভারতের সাথে নয়, হবে আমেরিকা বা ইউরোপের উন্নত দেশ গুলির সাথে। সে দিন খুব বেশি দূরে নয়। এবং আমরা সে পথেই দ্রুত এগুচ্ছি।”
পরিশেষে, বাংলাদেশের সাফল্য ও সম্ভাবনা একটি বাস্তবতা। আমাদের উন্নয়ন বাস্তবতা দুর্মুখদের জন্য “ কঠিন বাস্তবতা”। কিন্তু এই “ কঠিন বাস্তবতা” তাদের মেনে নিতে হচ্ছে। কারণ সাধারণ মানুষ উন্নয়নকে রাজনৈতিক বিভেদের উর্ধ্বের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে ফেলেছে। দেশের উন্নয়নে কোনো ভেদাভেদ নেই, সবাই নিজেকে মনে করে, আমি বাংলাদেশের নাগরিক, আমিও এর অংশীদার। তাই তাদের কণ্ঠে শুনি, “বিশ্বের সব অর্থনীতিবিদদের নেতিবাচক ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে এগিয়ে যাক আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ সামনের দিকে। জয় হোক বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষের!”