ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

এই শতকের দ্বিতীয় দশকের মাঝামাঝিতেও শুনি বাবামা বলেন, “আমি চাই আমার সন্তান ডাক্তার হোক, সন্তানকে বোঝাচ্ছি, কন্তিু সে তা বুঝতে চাচ্ছে না। আমার সন্তান চায় আইনজীবী হতে।” এরকম দ্বান্দ্বিক চাওয়া, যেখানে মাবাবা চায় একটা, সন্তান চায় আরেকটা। তা আবার লেখাপড়ায় উচ্চশিক্ষিত পরিবারেও দেখছি, ঘটছে, এরকম অহরহ। আমি অসংখ্য ঘটনার প্রত্যক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ থেকে বিষয়টি নিয়ে একটু আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি।

আমার এক পরমাত্মীয় তার যা ভালো লাগে করতে, তা করতে পারেন নি। জীবনে যা হতে চাইতেন হতে পারেন নি। বাবার চাপে ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানে পড়েছেন। তারপর পর্যায়ক্রমে প্রকৌশলী হয়ে পল্লীবিদ্যুতায়নের প্রকৌশলী হিসেবে অর্ধযুগ চাকুরিও করেছেন।এর মধ্যে দুরারোগ্য ব্যাধিতে তাঁর বাবার মৃত্যু ঘটে। তারাপর শুরু হল তার সেই ভালো লাগা বিষয়ক চর্চা। একদিন ঐ বিষয়ে কাজ করতে করতে বাবার পছন্দের প্রকৌশলী পেশা ছেড়ে নিজের পছন্দের কাজে প্রত্যাবর্তন। এবার আর কেউ যেমনম মামা চাচা, বোন ভাই কারো চাপ চেষ্টা-তদবির কিছুই তাকে নিবৃত্ত করতে পারল না। তিনি বীরের মতো তাঁর প্রিয় ভালোলাগা কাজের পেশায় যুক্ত হয়ে গেলেন। আমার জানা মতে তিনি ভালো করছেন ঐ পেশায়। এবং তাঁর ভাষায়, “আমি মজা পাচ্ছি। ভালো আছি আমার পছন্দের পেশায়।”
আর আমি? আমার বাবামা ও পরিবারের বড়রা যা চেয়েছিলেন, আমি তা চাইনি, তারা যা চেয়েছিলেন আমি হই, আমি তা হই নি। হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না্। তারা যা চান আমি তা হতে চাই নি। আমার নিজস্ব পছন্দ ছিল- কী বিষয়ে পড়বো? কী হতে চাই? পেশা হিসেবে কী গ্রহণ করতে চাই? এরকম অনেক প্রশ্নের উত্তর আমি শৈশবেই ঠিক করে ফেলেছিলাম। ফলে, বাবামা ও বড়রা বলে কয়ে, বুঝিয়ে-শুনিয়ে কিছুতেই তাদের কাজ হয় নি। আমি ভালো কি মন্দ আছি জানি না। আমি আমার মতো আছি। মজায় আছি।

আমার শৈশব তো বিংশ শতকের ৮ম-৯ম দশকের। আজকে/ এখন একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক। এ যুগেও মাবাবারা তাদের সন্তানদের উপর তাদের স্বপ্ন, তাদের পছন্দ, তাদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে দিচ্ছেন। অনেক সন্তানের কাছে তা দুঃস্বপ্ন, অপছন্দ, ভুল সিদ্ধান্ত হয়ে দেখা দিচ্ছে, বিষয়টি ভাবলে দুঃখ হয়।

আসলে এ ব্যাপারে বাবামার ভূমিকা হওয়া উচিত সহায়কের। সন্তানের ইচ্ছেকে মূল্য দেবেন তাঁরা এবং সে ইচ্ছে পূরণে সহায়তা করবেন। সেই দিন নেই যে শিল্পী, খেলোয়াড় বা এরকম কিছু হলে সন্তান না খেয়ে থাকবে। শিশুর যা মন থেকে চায় তাতে যদি বাবামার সহায়তা পায় তাহলে ওতেই শিশু সুখী হবে জীবনে। এটা পর্যবেক্ষেণে দেখা যায়। আর তা যদি না করা হয় তার উল্টো যে কত ভয়াবহ অসুখী জীবনে সন্তানকে নিক্ষিপ্ত করা তা-ও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়। কারণ ব্যক্তির চাওয়া ইচ্ছে বা স্বপ্ন তো মরে না। বরং ব্যক্তির চাওয়া ইচ্ছে বা স্বপ্নের মরণের সাথে তার মানসিক মৃত্যু ঘটতে দেখা যায়।