ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

শিক্ষানীতি-বহির্ভূত পাবলিক পরীক্ষা-পিএসসি বা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা থেকে শিশুরা আসলে কি শিখছে? কিছু পাচ্ছে? নাকি চরিত্র হারাচ্ছে? এরকম প্রশ্ন উঠছে চারদিকে থেকে। শিশুরা অমূল্য কিছু হারাচ্ছে, যা হারালে শিশু-জীবনের ভিত্তিতেই ধ্বংস হয়ে যায়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর পিএসসি-র নেতিবাচক প্রভাবের কারণে একে শুধু এখন শিশুদের সুস্থ-স্বাভাবিক বিকাশের পরিপন্থী, শিশুদের দূর্নীতি শেখার মাধ্যম বলে মনে করা হচ্ছে। একে শিক্ষানীতি বহির্ভূত একটি পাবলিক পরীক্ষা বলে প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন ড মুহম্মদ জাফর ইকবাল ( ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল,কৈশোরের আনন্দটুকু ফিরিয়ে দিন, নভেম্বর ২১, ২০১৪)। তিনি শিক্ষানীতি কমিটির অন্যতম সদস্য। তাঁর কথা ও প্রমাণ অকাট্য। তিনি সর্বসাম্প্রতিক লেখায় লিখেছেন, “আমাদের শিক্ষানীতিতে পঞ্চম শ্রেণির শিশুদের জন্যে কোনো পাবলিক পরীক্ষার কথা বলা নেই, আমলারা নিজেদের উর্বর মস্তিষ্ক থেকে এটি বের করে জোর করে এটা চালিয়ে যাচ্ছেন।” (ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, দোহাই, আমাদের শিশুদের ক্রিমিনাল বানাবেন না, নভেম্বর ২৭, ২০১৪)।তিনি দুঃখ করে লিখেছেন, “ছোট ছোট শিশুদের অন্যায় করতে শেখানো হচ্ছে। সারা পৃথিবীর কোথাও এই নজির নেই, যেখানে একটি রাষ্ট্র তার দেশের শিশুদের অন্যায় করতে শেখায়। একটা দেশের মেরুদন্ড পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার কি এর চাইতে পরিপূর্ণ কোনো পদ্ধতি আছে? নেই। সারা পৃথিবীতে কখনও ছিল না, ভবিষ্যতেও কখনও থাকবে না। শুধুমাত্র আমাদের দেশেই কিছু আমলা আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা একটা শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করার একটা প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। যে জাতি শৈশবে অন্যায় করতে শিখে বড় হয় সেই জাতি দিয়ে আমরা কী করব।”

এভাবে শিক্ষাবিদ, শিক্ষাকর্মী সবাই দাবি করছেন- প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শিশু, মাবাবা, শিক্ষক, শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের উপর চাপিয়ে দেওয়া একটি ভারবাহী পাবলিক পরীক্ষা যার কোনো সুফল নেই কুফল ছাড়া।

পিএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস ও পরীক্ষার সময় নানান অপকর্মকে উদাহরণ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে অনেকে মত প্রকাশ করছেন, আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা নাকি একটা ভবিষ্যতের জন্য যুগোপযোগী দূর্নীতিগ্রস্থ শিক্ষিত সমাজ উপহার দিচ্ছে (দ্রষ্টব্য: প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা কিছু এলাকায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ)।

সাধারণ মানুষের পারসেপশন ও আশঙ্কা হল, এত ছোট বয়সেই দূর্নীতির সাথে শিশুর হাতেখড়ি হলে বড় হয়ে এদের থেকে কী আশা করা যাবে? আসলে, এটা একটা ভাবনার বিষয়।

আমার সহযোগী ব্লগার গোলাম রসুল খান লিখেছেন, “আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই বিমুখ করে, চোর হিসেবে তৈরী করা হচ্ছে। কিভাবে প্রতারণা করে, চুরি করে পাস করা যায় সেই শিক্ষা দেয়া হচ্ছে।” আমি তার সাথে সম্পূর্ণ একমত। পড়ুন তাঁর ব্লগ: শিক্ষা ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঢোকানোর প্রতীক্ষা

কেউ কেউ উপহাসজনক মন্তব্য করতে শুনি, “যা (অপরাধ) বড় হয়ে করতে হবে তা শৈশবে শিখে ভিত্তি মজবুত-পাকাপোক্ত করে বড় হওয়া ভালো না? ভালো তো!”

কিন্তু, আমার মতো ভীরুদের ভাবনা অন্যরকম। আমার মতে, নিজেদের স্বার্থেই এই অপরাধপ্রবণ মজবুত পাকা পোক্ত অপরাধী প্রজন্ম আসার পথটাও কিন্তু রোধ করা দরকার। নইলে আমরা নতুন মেধাবী মজবুত পাকা পোক্ত অপরাধী প্রজন্মের সাথে পেরে উঠব না। এমনিতেই প্রজন্মের গ্যাপ বলে তো একটা কথা আছেই তার ওপর এভাবে জীবনের শুরু থেকেই অপরাধ অনুশীলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি প্রজন্মের কাছে আমাদের কী উপায় হবে জানি না।

আসলে শিশুরা শিক্ষানীতি-বহির্ভূত পাবলিক পরীক্ষা-পিএসসি থেকে শিশুরা কিছুই পাচ্ছে না; বরং হারাচ্ছে অনেক। হারাচ্ছে শৈশবের সুস্থ-স্বাভাবিক-আনন্দপূর্ণ বিকাশ। চাপে পড়ে তারা শিশুত্ব হারিয়ে অকাল বয়স্ক এক অস্বাভাবিক মানুষ হয়ে বেড়ে ‍উঠছে। ….

….

পরিশেষ-মতামত হলো,শিক্ষানীতি বহির্ভূত প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষাটি শিশু, মাবাবা, শিক্ষক, শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে যা নিয়ে দেশজুড়ে সবার উদ্বিগ্নতা, নানান পারসেপশন ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

যেহেতু বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ, পিএসসি সম্পর্কে বাবামা, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদগণের মতামত, শিক্ষানীতির নির্দেশনা সর্বোপরি গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা ও শিশু ও শিশুব্যবস্থায় পিএসসি-র প্রভাবকে সংশ্লিষ্ট মন্তণোলয়ের আমলে নেওয়া উচিত।