ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
53_PSC+exam_23112014_04

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমার অনেক দিনের পর্যবেক্ষণে আপনি একজন শিশু-বিকাশ-বান্ধব রাষ্ট্রপ্রধান। সারাবিশ্বে আপনার মতো শিশু বিষয়ে আন্তরিক রাষ্ট্রপ্রধান দ্বিতীয় কাউকে পাওয়া যাবে না। এটা আমার বিশ্বাস। সুতরাং আপনি আমাদের যন্ত্রণাটা বুঝতে পারবেন। আপনার প্রতি জনগণ হিসেবে আমারও আস্থা অসীম। তাই আপনাকে এই লেখা। আমার পরিচয়, আমি একজন শিশুর বাবা ও সেই সাথে শিক্ষা সেক্টরের একজন সেবক। ফলে আমার যন্ত্রণাটা একটু বেশি। সর্বোপরি, আমি একজন সচেতন দেশপ্রেমিক নাগরিক। তাই ক্ষোভ নয়, বিনয়ের সাথে পিএসসি-র মতো একটি ভুল পদক্ষেপের অবসান কল্পে দাবি জানিয়ে যাচ্ছি। দাবির পক্ষে যুক্তি হল, এর কারণে ও প্রভাবে আমাদের শিশুদের জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মা-বাবাদের জীবন দুশ্চিন্তায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা সন্তানের শিক্ষা ও ভবিষ্যত নিয়ে বড় উদ্বিগ্ন ও অসহায় অবস্থায় আছি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের জাতির মেরুদণ্ড হল শিক্ষা, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা, যাকে খামছে ধরেছে একটি দুষ্ট-চক্র। তাদের মধ্যে অনেকে আছে: কোচিং ব্যবসায়ী, নোটবই গাইডবই ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ, ফেরেব্বাজ, মোসাহেব, সুবিধাভোগী ভোল পাল্টানো সব রাজনীবিদসহ স্কুল দখলকারী চক্র, স্কুলের ফান্ড লুটেরা ও আরেও অনেকে। শিক্ষার দুরবস্থা দেখে, এই দুরবস্থায় কী করবে, জাতি যখন  দিশেহারা তখন একমাত্র দিশা ঠিক রেখে কাজ করে যাচ্ছে এই চক্রটি।

এই পরিস্থিতে, এহেন দুরবস্থায়, আমরা আপনার সহায়তা চাচ্ছি। সবার আগে আপনি দয়া করে পিএসসি নামক পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থাটা বন্ধ করুন, শিশুদের রক্ষা করুন, জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচান।

শিক্ষানীতি-বহির্ভূত একটি পাবলিক পরীক্ষা-পিএসসি বা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে- এ থেকে শিশুরা আসলে কি শিখছে? কিছু পাচ্ছে? নাকি সব/চরিত্র হারাচ্ছে? এরকম প্রশ্ন উঠছে চারদিকে থেকে। শিশুরা অমূল্য কিছু হারাচ্ছে, যা হারালে শিশু-জীবনের ভিত্তিতেই ধ্বংস হয়ে যায়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর পিএসসি-র নেতিবাচক প্রভাবের কারণে একে এখন শিশুদের সুস্থ-স্বাভাবিক বিকাশের পরিপন্থী, শিশুদের দূর্নীতি শেখার মাধ্যম বলে মনে করা হচ্ছে। এটি যে শিক্ষানীতি বহির্ভূত একটি পাবলিক পরীক্ষা তা প্রমাণ করেছেন ড মুহম্মদ জাফর ইকবাল ( ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল,কৈশোরের আনন্দটুকু ফিরিয়ে দিন, নভেম্বর ২১, ২০১৪)। তিনি শিক্ষানীতি কমিটির অন্যতম সদস্য। তাঁর উপস্থাপিত প্রমাণ অকাট্য। তিনি সর্বসাম্প্রতিক লেখায় লিখেছেন, “আমাদের শিক্ষানীতিতে পঞ্চম শ্রেণির শিশুদের জন্যে কোনো পাবলিক পরীক্ষার কথা বলা নেই, আমলারা নিজেদের উর্বর মস্তিষ্ক থেকে এটি বের করে জোর করে এটা চালিয়ে যাচ্ছেন।” (ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, দোহাই, আমাদের শিশুদের ক্রিমিনাল বানাবেন না, নভেম্বর ২৭, ২০১৪)। তিনি দুঃখ করে লিখেছেন, “ছোট ছোট শিশুদের অন্যায় করতে শেখানো হচ্ছে। সারা পৃথিবীর কোথাও এই নজির নেই, যেখানে একটি রাষ্ট্র তার দেশের শিশুদের অন্যায় করতে শেখায়। একটা দেশের মেরুদন্ড পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার কি এর চাইতে পরিপূর্ণ কোনো পদ্ধতি আছে? নেই। সারা পৃথিবীতে কখনও ছিল না, ভবিষ্যতেও কখনও থাকবে না। শুধুমাত্র আমাদের দেশেই কিছু আমলা আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা একটা শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করার একটা প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। যে জাতি শৈশবে অন্যায় করতে শিখে বড় হয় সেই জাতি দিয়ে আমরা কী করব।” এরকম আরও অনেকে লিখেছেন। তাদের মধ্যে আবুল মোমেন, মনির হাসান প্রমুখ অন্যতম।

এভাবে শিক্ষাবিদ, শিক্ষাকর্মী সবাই দাবি করছেন- প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শিশু, মাবাবা, শিক্ষক, শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের উপর চাপিয়ে দেওয়া একটি ভারবাহী পাবলিক পরীক্ষা যার কোনো সুফল নেই কুফল ছাড়া।

পিএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস ও পরীক্ষার সময় নানান অপকর্মকে উদাহরণ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে অনেকে মত প্রকাশ করছেন, আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা নাকি একটা ভবিষ্যতের জন্য যুগোপযোগী দূর্নীতিগ্রস্থ শিক্ষিত সমাজ উপহার দিচ্ছে (দ্রষ্টব্য: প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা কিছু এলাকায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ)।

সাধারণ মানুষের পারসেপশন ও আশঙ্কা হল, এত ছোট বয়সেই দূর্নীতির সাথে শিশুর হাতেখড়ি হলে বড় হয়ে এদের থেকে কী আশা করা যাবে? আসলে, এটা একটা ভাবনার বিষয়।

একজন শিক্ষাবিদ ড. শহীদ ইকবাল খুদে শিশু ও তার বাবামার অসহায়ত্ব তুলে ধরেছেন, “ইতোমধ্যেই শৈশব হারিয়ে ফেলছে। … বইয়ের বোঝায় তারা পর্যুদস্ত। এসব বইয়ের প্রতিটির পেছনে আছে ডজন ডজন মাস্টার, প্রাইভেট টিউটর, কোচিং সেন্টার। মাস্টাররা তাদের নোট দেয়, পড়া মুখস্থ করায়। জিপিএ ফাইভ পাওয়ার জন্য ‘কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানো’র সব রকম মহৌষধ প্রয়োগ করে। অনেকটা ট্যাবলেট গেলানোর মতো বিদ্যাকে গেলানোর চেষ্টা করায়।অভিভাবকরাও এসব খুদে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যারপর নাই চিন্তিত। যদি ভালো কিছু না করে তাহলে সমাজেমুখ দেখানো মুশকিল। অপ্রস্তুত হতে কে চায়! ক্রমাগত এসব টেনশন-টর্চার এক পর্যায়ে খুদে পরীক্ষার্থীর ঘাড়ে এসে পড়ে। তখন সেও সেভাবেই অনুভব করতে শেখে সব কিছু। জন্মেই সে একটি প্রতিযোগিতামুখর শাসিত পৃথিবী মোকাবেলা করতে থাকে। বিস্ময়কর ও ত্রাসিত পৃথিবীতে সে একা, তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বিশাল সম্মান আর লজ্জার ভার। এভাবে তাকে কথিত হাইব্রিড হয়ে নিষ্ঠুরতার মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
এসব প্রতিধ্বনিত বাস্তবতার ভেতরে যখন পরীক্ষার আগের রাতগুলো ভয়ার্ত তখন প্রশ্নপত্র নিয়ে আরেক ‘নাটক’ তৈরি হচ্ছে।” সবকিছু বিবেচনা করে তিনিও মনে করেন, “খুব কী প্রয়োজন আছে পঞ্চম শ্রেণিতে এ রকম একটি সার্টিফিকেট পরীক্ষা নেওয়ার। আমি মনে করি এর কোনো প্রয়োজন নেই।” (ড. শহীদ ইকবাল, শিশুদের পরীক্ষায় ফাঁস-বেফাঁস প্রশ্নপত্র, আমাদের সময়, ২৯/১১/১৪)

তাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি দয়া করে পিএসসি পরীক্ষা পদ্ধতি বন্ধ করে দিন। সেই সাথে এই সেক্টরের দুরবস্থা দূর করার লক্ষ্যে একজন তরুণ তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ দিন। এক্ষেত্রে আমাদের ভাই সজীব ওয়াজেদ জয় হতে পারেন সবচেয়ে পছন্দের যোগ্যতম। তিনি অনেক ভাবছেন দেশের উন্নয়ন নিয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে।সফলতার মুখ দেখেছেন। জাতিকে এখন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, ইয়ং বেঙ্গল সংগঠন গঠন করেছেন। এটি একটি সময়োপযোগী গুণগত মানসম্মত পদক্ষেপ।

সজীব ওয়াজেদ জয়কে কি একটুখানি শিক্ষার উন্নয়নের জন্য কাজে লাগানো যায়। এখানে তরুণ (ইয়াং), আধুনিক, উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেটধারী (হারানো নয়, আছে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, ডেডিকেশন ও সার্টিফিকেট সবই আছে ঠিকঠাক) এমন তরুণ তত্ত্বাবধায়ক দরকার।

আমার এ দাবি নতুন নয়, অগণতান্ত্রিক নয়, আমি একজন সরকার-বিরোধীও নই, যা প্রমাণিত সত্য। দেখুন- শিক্ষা-সেক্টরে জয়ের মতো একজন তরুণ তত্ত্বাবধায়ক দরকার, ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, রবিবার ১৬ নভেম্বর ২০১৪, অপরাহ্ণ ১০:৪৩ । সেখানে আমি আরও কিছু যুক্তি ও মত তুলে ধরেছি এর পক্ষে। কারণ, আবারও বলছি, আমি একজন শিশুর বাবা ও সেই সাথে শিক্ষা সেক্টরের একজন সেবক। দেশকে ভালোবাসি। ফলে আমার যন্ত্রণাটা একটু বেশি। তবুও ক্ষোভ নয়, বিনয়ের সাথে পিএসসির মতো এই ভুল পদক্ষেপের অবসান কল্পে দাবি জানিয়ে যাচ্ছি বহু দিন ধরে। আমার দাবির পক্ষে লেখা অন্যান্য পোস্ট: শিশু-শিক্ষার্থীদের পক্ষে একটি গণমোনাজাত বা প্রার্থনার খসড়া, ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, বুধবার ২৯অক্টোবর২০১৪, অপরাহ্ণ ১০:২৭; শিক্ষা বনাম পরীক্ষা, টেক্সটবুক বনাম টেস্টবুক, ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, শনিবার ১১অক্টোবর২০১৪, অপরাহ্ণ ০৯:৫৩

আমি একা নই, নিঃসঙ্গ নই। আমার মতো অন্যরাও মনে করে, “… এখন আমাদের এই বিপদ থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব বর্তায় একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর উপর। … মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে গোটা দেশবাশির পক্ষে আমার আকূল আবেদন “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একবার চিন্তা করুন আপনার ছোট ভাই রাসেলের মত নিশ্পাপ শিশুদেরকেও আমরা অপরাধী হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারছি না। … সেই স্বপ্ন আমাদেরকে দেখিয়েছিলেন আপনার বাবা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা আমাদের সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে চাই। দয়া করে আমাদেরকে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে একটা সুশিক্ষিত জাতি হিসাবে গড়ে উঠতে সহায়তা করুন। … আপনার কাছেই আমাদের প্রার্থনা দয়া করে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এই কলঙ্ক দূর করুন।” (শাহরিয়ার আরিফ, আমরা স্টুপিড হতে চাই না, সোনার বাংলা গড়তে চাই, ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, শুক্রবার ২৮নভেম্বর ২০১৪, অপরাহ্ণ০৬:২৪)