ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

জিপিএ-৫প্রাপ্ত কৃতিশিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা, শিক্ষাবিপ্লব ও লিঙ্গবৈষম্যমূলক বক্তব্য:

সম্প্রতি একটি জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ও মা সমাবেশের প্রতিবেদন পড়ছিলাম। তাতে “শিক্ষাবিপ্লব” কথাটা শিরোনামে শোভা পাচ্ছিল। বলতে পারেন এই বিপ্লবের টানে প্রতিবেদনটা পড়তে উদ্বুদ্ধ হই। পড়তে গিয়ে যতই এগুচ্ছি শব্দে শব্দে ঝামা ইটের ঘষা খেয়ে আহত হতে লাগলাম। জিপিএ-৫প্রাপ্ত কৃতিশিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষাবিপ্লবের অনুঘটকের বক্তৃতা থেকে ছুটে আসা বোমার আঘাত খেয়ে এই পোস্ট লিখতে বসে গেলাম।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ও মা সমাবেশে প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “সমাজে মায়েরা সচেতন হলে শিক্ষার বিপ্লব ঘটবে।” শুনে কেমন যেন লাগছে। উপস্থিত পুরুষরা চোখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন। তাদের মনে প্রশ্ন জাগা কি স্বাভাবিক নয়, সন্তানের শিক্ষায় ও দেশের শিক্ষার বিপ্লবে কি বাপদের সচেতন হওয়ার বা অবদান রাখার কোনো দরকার নেই? মায়েরা সচেতন হলেই শিক্ষার বিপ্লব ঘটে যাবে? এধরনের এক চোখা হরিণের মতো বক্তব্য দেওয়া কি সুস্থ ও লিঙ্গসমতাপূর্ণ সমাজ গঠনের পক্ষে সহায়ক?

সেই প্রধান অতিথি এক পর্যায়ে আরো বলেন, “দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, আর এই এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার কন্যা সন্তান অবদান রাখবে…।” আমাদের মনে প্রশ্ন জাগল, এধরনের কথা শুনে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কোমলমতী ছেলেশিশুরা কি নিজেকে বৈষম্যের শিকার বা বঞ্চিত বা ডিপ্র্রাইভড মনে করেনি? এটা তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে বা যে কারোরই কি বলা উচিত?

তিনি আরো বলেন, “বর্তমানে যাদের নাম মেধা তালিকায় উঠেছে, আমি আশা করি আজকের মায়েরা বেশি সচেতন হলে ভবিষ্যতে মেধাবীদের তালিকা আরো বেশি দীর্ঘ হবে।” শুনে আমাদের কারো কারো মনে জেগেছিল, সত্যিকার মেধাবীদের তালিকা দীর্ঘ হলে তো ভালোই হত কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় মেধাবীদের তালিকা তথা জিপিএ-৫প্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের তালিকা বাড়ানো হচ্ছে তাতে সমাজে অপরাধীর সংখ্যাই বাড়বে বৈকি। আর এভাবে তালিকা দীর্ঘ করার প্রণোদনা দিলে লাভ হবে কোচিং ব্যবসায়ীদের। আসলে তা কি শিক্ষা বিপ্লব হবে নাকি অশিক্ষার বিপ্লব হবে ?

আসুন লিঙ্গবৈষম্যহীন দৃষ্টিভঙ্গি ও কথা বলার অনুশীলন করি

আমরা যে যেখানে কথা বলছি, পাবলিক স্পিক দিচ্ছি, যেন ভাবি আমাদের আপাত বিরোধী ও বৈষম্যমূলক বক্তব্যে আমাদের সন্তান, আগামি প্রজন্ম ও গোটা সমাজ বৈষম্যে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে কিনা? যদি ভবিষ্যতের সমাজ বৈষম্যহীন ও সুষম চাই, আমাদের আপাত বিরোধী ও বৈষম্যমূলক বক্তব্য না দেওয়ার অনুশীলন করতে হবে। সচেতনভাবে আপাত বিরোধী ও লিঙ্গ-অলিঙ্গ সব ধরনের বৈষম্যমূলক বক্তব্য ত্যাগ করতে হবে।

যেখানে অভিনেত্রী এমা ওয়াটসন ‘হি ফর শি’ নামের কর্মসূচি নিয়ে প্রচার করছেন, ‘আমি যত বেশি ফেমিনিজম বা নারীবাদ নিয়েকথা বলি, তত বেশি বুঝতে পারি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীর অধিকারের লড়াইকেপুরুষবিদ্বেষী ভাবা হয়। আমি একটা কথাই বিশ্বাস করি, সব ধরনের বিদ্বেষ রুখতে হবে। নারী ও পুরুষের সম–অধিকার ও সমান সুযোগই নারীবাদের ভাবাদর্শ।’ সেখানে কিছু মানুষ  সমাজে বৈষম্য ছড়াচ্ছে। আর তাকে বিপ্লব, বিভিন্ন মতবাদ বলে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করতে চাইছে। “ভুল সবই ভুল; এই সমাজের পদে পদে দেখছি শুধু ভুল।” ভুল নেতৃত্ব, ভুল ভবিষ্যত সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্র। ভূল বাবামা, ভুল পরিবারের ভবিষ্যৎ। আসুন, ভুল থেকে সরে আসি।

“ভুল সবই ভুল; এই সমাজের পদে পদে দেখছি শুধু ভুল।” না, না, ভুল থেকে সরে আসি। আসুন নারীবাদ নয়, সমতাবাদ এর প্রচার ও প্রসার করি সমাজে।