ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

Bijoy-1Bojoy-2

শিশুকে দেশপ্রেমের পাঠ দিন শৈশব থেকেই, বলুন বিজয়-গাথা, হাতে তুলে দিন বিজয়-পতাকা। ঘরে ঘরে গড়ে উঠুক দেশপ্রেমিক নতুন প্রজন্ম। এই শিশুরাই তো আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের গর্বিত উত্তসুরী, আমাদের জাতি ও জাতীয় চেতনার প্রতিনিধি। তাই ওদেরকে সুকৌশলে প্রারম্ভিক শৈশব থেকেই দিতে হবে দেশপ্রেমের পাঠ। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ঘটনা, আমাদের গভীর দেশপ্রেম থেকে উৎসারিত একটি অতল আবেগপূর্ণ বীরত্বগাথা। যা চিরকাল আমাদের মনে দেশপ্রেমের আবেগ জাগিয়ে যাবে। তাই বিজয়ের মাসে ওদের হাতে তুলে দিতে হবে লাল-সবুজের পতাকা, ওরা যার গর্বিত অধিকারী। ওদের শোনাতেই হবে বিজয়ের কথা, আমাদের গৌরব গাথা, ওরা যার গর্বিত অংশীদার, ওরা যার ধারক, বাহক ও উত্তরাধিকার।

সুকোমল মনের অধিকারী শিশুর মনে দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি ভালোবাসার উন্মেষ ঘটানোর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তাদের সামনে জাতীয় ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস, জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে ধারাবাহিকভাবে পরিচিত করানো দরকার। ক্ষুদে শিশুদের কাছে উপস্থাপিত এসব বিষয় যাতে সহজবোধ্য হয় এবং শিশু সেগুলো আনন্দের সাথে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে, মুখস্থ করতেনা হয় সে দিকে লক্ষ্য রেখে মজার কাজ, আকর্ষণীয় কৌশল, আনন্দদায়ক শেখার পদ্ধতি দিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। এর মানে তা যেন না হয় তথাকথিত অআকখ পাঠ; বরং তা যেন আনন্দ-গানে, খেলতে খেলতে, দেখতে দেখতে, গল্প-ছড়ায় শুনতে শুনতে, বলতে বলতে মজায় মজায় দেশও জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা-গল্প-গাথা।

গল্পে গল্পে শিশুদের জানাতে হবে যে ডিসেম্বর আমাদের গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের মাস। সে যেগর্বিত জাতির প্রতিভু, সেই বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবের দিন ১৬ই ডিসেম্বর, আমাদের বিজয় দিবস। তাদের বলতে হবে, এ দিবসটি অর্জনের কাহিনী, কীভাবে এ দিনটি রচিত হয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে ৯ মাস যুদ্ধের পর। এদিনটি আমরা পেয়েছি কত রক্তের বিনিময়ে – “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনল যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না।” তাদের বলতে হবে যে আমরা শুধু কি বহির্শত্রুর সাথে যুদ্ধ করেছি তা নয়; সেই হানাদার পাকিস্তানিদের দোশর নিজ দেশের দালাল- রাজাকার, আলবদর আলশামস নামে নানা স্বাধীনতার শত্রুবাহিনী তথা ঘরের শত্রু বিভীষণদেরও মোকাবেলা করতে হয়েছিল তখন। তবুও বাংলা মায়ের বীরসন্তানেরা বুকি উঁচিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন ৯ মাস ধরে। কিন্তু পিছু হটেননি। অসীম সাহসে লড়াই করে পরাজিত করেছেন দখলদার পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনীকে। অবশেষে, অনেক রক্ত, অপমান সহ্য করে আমরা অর্জন করি কাঙ্ক্ষিত বিজয়।

পরিবার থেকে শুরু হোক দেশপ্রেমের অনুশীলন

বিশেষ করে এই ডিসেম্বর জুড়ে বিজয়ের মাসে আমরা শিশুকে বিজয়ের লাল-সবুজের পতাকার মাধ্যমে আমাদের বিজয়ের ধারণা দিতে পারি। লাল-সবুজের পতাকার গাঢ় উজ্জ্বল রঙে রঙিন হয়ে যাবে শিশুর মন। যে রঙ দেশের সবুজ আর সূর্যের রঙে রাঙা, রক্তের ত্যাগে ও দেশপ্রেমের আবেগে সমুজ্জ্বল। তাই আমাদের লাল সবুজের পতাকা হাতে তুলে দিন আপনার সন্তান আমাদের নতুন প্রজন্মের হাতে। ওদের দেশকে ভালোবাসার সূচনা হোক আপনারে/আপনাদের হাতে, ঘর/ পরিবার থেকে।

বিদ্যালয়ে চালু থাক দেশপ্রেমের পাঠ

পরিবারের পর দেশপ্রেমের পাঠ ও অনুশীলন চালু হোক বিদ্যালয়ে।ধাপে ধাপে সে হয়ে উঠুক দেশপ্রেমসহ সুযোগ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নাগরিক। এজন্যই আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমে ও পাঠ্যসূচিতে “বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়” নামে একটি বিষয় আছে। শিক্ষাক্রমে বলা হয়েছে একেবারে প্রথম শ্রেণি থেকেই শিশুকে “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা ও এর চেতনায় দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত হওয়া” এর জন্য শিখন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। আরও বলা হয়েছে, শিশুকে “বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জানা এবং এগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ও ভালোবাসা” জাগিয়ে তোলার জন্য বিদ্যালয়ে কাজ করতে হবে।

ক্ষুদে শিশুকে দেশপ্রেমের পাঠ দানের কৌশল

কিন্তু এটি করতে হবে সমন্বিতভাবে ও সমন্বিত কৌশলে। কিন্তু সেজন্য প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে কোনো বই নেই। আছে নির্দেশনা- পরিকল্পিত কাজ ও কী কী সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করা যেতে পারে তা। দুঃখের বিষয়, এ বিষয়গুলো শিশুকে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও কৌশলগত দিকটি বাবামার কাছে পৌঁছায় না। এমনকি, শিক্ষকের প্রশিক্ষণেও বার্তাটি ঠিক মতো যায় না। ক্ষুদে শিশু শিক্ষার্থীকে মজা করে কীভাবে শেখাতে হবে তা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। তবে মুষ্টিমেয় কেউ কেউ চেষ্টা করেন তাদের জন্য ধন্যবাদ।

শিশুকে শৈশব থেকেই ধাপে ধাপে শিশুর দেশপ্রেম, ইতিহাস ঐতিহ্য জ্ঞান দিতে হলে সেটি মাবাবা ও  শিক্ষককে জানতে হবে সবার আগে। শুধু জানলেই হবে না। তাদেরকে শিশুর মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী কীভাবে জানাতে হবে তাও বুঝিয়ে দিতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে হাতে কলমে কাজ করিয়ে সিমুলেশনের মাধ্যমে কাজটি যে করা যায় সে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে দিতে হবে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষককে। এমনকি এটা শিশুর প্রথম শিক্ষক মাবাবাকেও দিতে হবে, দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুর সুনাগরিক হয়ে ওঠার গুণাবলি অর্জন করতে তাকে ধাপে ধাপে মাবাবাকে বিষয়গুলো জানতে হবে, তাদের শিশুসন্তানকে জানাতে হবে; তাদেরকে হাতে কলমে অনুশীলনের, ঐতিহাসিক স্থান পর্যবেক্ষণের, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে।

শিশুকে আকর্ষণীয়, বাস্তব, নিকট পরিবেশের উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে শৈশব থেকেই ধাপে ধাপে শিশুর দেশপ্রেম, ইতিহাস ঐতিহ্য জ্ঞান দিলে তা তার কাছে বোধগম্য হবে ভালোলাগার সাথে হৃদঙ্গম হবে। এই শৈশবে প্রোথিত দেশপ্রেম, ইতিহাস ঐতিহ্য জ্ঞান নিয়ে যাবে সে পরের প্রজন্মের কাছে। তাই নিচে কিছু সংক্ষিপ্ত পরিকল্পিত কাজ ও সম্ভাব্য সহায়ক উপকরণের তালিকা দেওয়া হল:

  • পর্যবেক্ষণ: মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী স্থান, স্থাপনা (স্থাপত্য-কীর্তি যেমন শহীদ মিনার স্মৃতিসৗধ ইত্যাদি) পর্যবেক্ষণে শিশুদের নিয়ে যাওয়া ও সেখানকার ঘটনা / ইতিহাস শিশুদের বলা যেতে পারে।
  • গল্প বলা: শিশুর কাছে প্রাঞ্জল করে, শিশুর উপযোগী করে মুক্তিযোদ্ধার জীবন কাহিনী, মুক্তিযুদ্ধের কথা (ইতিহাস) ও এর চেতনায় দেশপ্রেমের কথা ও জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত হওয়ার মতো ঘটনা গল্পাকারে তুলে ধরা যেতে পারে।
  • গানে শিশুদের সক্রিয় অংশগ্রহণ:জাতীয় সংগীত, দেশের গান, স্বাধীনতার গান, শিশুদের শুনিয়েও তার মধ্যে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বোধ ও জাতীয় চেতনা জাগানো যেতে পারে।
  • চিত্র/ ছবি প্রদর্শন: শিশুদের আঁকা চিত্র /ছবি প্রদর্শন করে প্রত্যেককে উৎসাহিত করা ও অন্যদের আঁকা চিত্র/ছবির সাথে পরিচিত হওয়া অন্যের প্রশংসা করা ও স্বীকৃতি দেওয়ার (এপ্রিসিয়েশন) মতো ভদ্র আচরণ রপ্ত করা।
  • টিভি দেখা: দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বোধ ও জাতীয় চেতনা উদ্দীপক অনুষ্ঠান দেখিয়ে শিশুর সাথে চলমান অবস্থায় ও পরে আলোচনা করা যেতে পারে।
  • রেডিও, টিভি, পত্রিকায় উপস্থাপিত নির্দেশনা শুনে মাবাবা ও বড়দের সাথে বলা ও শ্রেণিতে বর্ণনা করা ও মহড়া দেয়া।

নিচের সহায়ক উপকরণসমূহ শিশুদের দেখিয়ে বা ব্যবহার করতে দিয়েও তাদের মধ্যে দেশপ্রেম, ইতিহাস ঐতিহ্য জ্ঞান দেBijoy -6ওয়া যেতে পারে: জাতীয় দিবসের ছবি (বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, মাতৃভাষা দিবস)দেখিয়ে কথা বলা ও আলোচনা করা। বুদ্ধিজীবীদের পোস্টার, বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি/পোস্টার, শহিদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধের বড় সাইজের ছবি, ফ্লিপ চার্ট, জাতীয় পতাকা, জাতীয় প্রতীক (ফল, ফুল, মাছ, পশু, পাখি), ছবি, স্বদেশ ও বিশ্বের মানচিত্র ইত্যাদি দেখিয়ে কথা বলা ও আলোচনা করা।

খাতা, পেন্সিল, রং, গাম, কাঁচি, লাল সবুজ কাগজ, কাঠি দিয়ে শহিদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি আঁকতে দেওয়া যেতে পারে।দেশাত্মবোধক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্পের বই পড়তে দেওয়া ওগল্পের ভিডিও এবং গানের বই/ সিডি দেখতে দিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

শিশুর দেশপ্রেমের সূচনা হোক আপনার/আপনাদের হাতে, ঘর তথা পরিবার থেকে। তারপর বিদ্যালয়ে। ধাপে ধাপে সে হয়ে উঠুক দেশপ্রেমিক সুযোগ্যনাগরিক। জাতীয়তাবোধের ভিত্তিমূল মজবুত হলে ধাপে ধাপে তার মধ্যে আন্তর্জাতিকতা বোধও তৈরি হোক, তাতে ক্ষতি নেই; মানবতারই কল্যাণ। তাতেই আমাদের মাবাবা হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে সাফল্য।

(লেখাটি ”রাইজিংবিডিরিউজডটকম”-এ প্রকাশিত হয়েছে, শৈশব থেকেই শুরু হোক দেশপ্রেমের পাঠ“ শিরোনামে, উদ্দেশ্য- আরও বেশি সংখ্যক মাবাবা, শিক্ষক ও অন্যান্যদেরকে উদ্বুদ্ধ করা)

Bijoy-8Bijoy-3Bijoy-7