ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

প্রেম-পরকীয়া, একটি প্রাচ্যদর্শন, ধর্মে লীলা, জীবনে খেলা। আসলে কি তাই? সমাজের পরকীয়া আসক্ত কেউ কেউ মনে করেন, পরকীয়া নির্ঝঞ্ঝাট যৌন জীবন ও সুখী সংসার জীবনের অবলম্বন। এরকম কথাও শোনা যায় পরকীয়া প্রেমের সমর্থক-গোষ্ঠি ও অভ্যস্তদের কণ্ঠে : “ চুটিয়ে প্রেম করছি। অফিস করছি। সংসার চালিয়ে যাচ্ছি। খাচ্ছি দাচ্ছি। চক চকে ব্লেডে দাড়ি কামাচ্ছি। এতে সুবিধা হল, আমার/আমাদের স্পাউজের সাথে কোনো দ্বন্দ্ব সংঘাত নেই। ঘ্যানর-ঘ্যানর নেই। প্যানর প্যানর নেই। ঝগড়া নেই। বিবাদ নেই। মারামারি নেই। ঘরেও শান্তি, বাইরেও শান্তি।”

আমার বেশ কয়েকজন চেনা-জানা মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে তারা শুরু থেকেই বৈষয়িকভাবে খুবই সফল, কিন্তু সংসার জীবনটা ছিল স্পাউজের সাথে দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ। ঝগড়া, বিবাদ, মারামারি অশান্তির চরম দৃষ্টান্ত। এখন সেই কুরুক্ষেত্রে কোনো ঝগড়া, বিবাদ, মারামারি নেই, অশান্তি নেই।

তাদের একজনের ভাষায়, “ওর সাথে দ্বন্দ্ব-সংঘাত এড়িয়ে স্বকীয়াকে সংসার, অর্থ, গাড়ি, বাড়ি দিয়ে পরকীয়াকে দিয়েছি প্রেম। হাহ হাহ …।“ সংলাপ শুনে মনে হয় না মানুষটা দারুন আছে! তার মতে, “এই কৌশলী হওয়ার পর আর কোনো সমস্যা নেই সংসারে। নির্ঝঞ্ঝাট আমার যৌন জীবন, সন্তারেরা বেড়ে উঠছে সুন্দর সুখী সংসার পরিবেশে। তারা শিক্ষা-দীক্ষায় সাফল্য পাচ্ছে। আমি ও আমার স্পাউজ সন্তানের সাফল্য উপভোগ করছি। একেকটা জিপিএ ফাইভ ও অন্যান্য এচিভমেন্ট আসে পিরিওডিকেলি। আমরা উদযাপন করি। সন্তানরা নাম করছে। আমার কর্মজীবন তথা পেশা জীবন সফলতায় ভরে উঠছে। জানেন, সবই পরকীয়ার গুনে। হাহ্ হাহ্…”

কী মনে হয় উপরের সংলাপগুলো শুনে? সত্যিকার একজন সফল পরকীয়ায় অভ্যস্ত, সুখে বিশ্বস্ত মানুষের কথা। তার কুরুক্ষেত্র জীবন সংসার সুখী ফুলের বাগান হয়ে গেছে। হাইব্রিড ফসলের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দেখে হিংসা হবে প্রথাবদ্ধ কেউ দেখলে ও তার পেছনে পরকীয়ার অবদানের সিক্রেট-কথা জানলে ও শুনলে। আমি জানতাম, আরও জেনেছি, শুনেছি। কারণ আমার ব্যতিক্রমী কিছু বন্ধু আছে, যারা প্রেমের প্রাচ্য দর্শন অনুসরণ করে আসছে জীবনের শুরু থেকে। তারা সুখী হয়েছে। কারণ তারা মনে প্রাণে জীবনে সুখী হতে চেয়েছে, যেখানে কোনো খাদ নেই। ওরা বলে, “পরকীয়ায় খাদ নেই। আছে প্রেম নিকষিত হেম।”

পরকীয়ায় সুখী আমার বন্ধুটির শেষ সংলাপ দিয়েই শেষ করি: “ভাই, জানেন তো, শৈশব থেকেই আমার মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তন ও ক্ষমতা দুইই, না না, সবই আছে। আমি তাই কৃষ্ণের জীবন তথা প্রাচ্য প্রেমের দর্শন ফলো করছি। ঘরেও শান্তি, বাইরেও শান্তি। প্রাচ্য প্রেমের দর্শনে জীবনানন্দে আছি।”

প্রাচ্য প্রেমের দর্শন পরকীয়া কি সত্যিই সংসার সুখের অবলম্বন?

সমাজে, সংসারে আসলে কী হচ্ছে?

২.

আমি কিছু মানুষের অদ্ভুত সংসার জীবন দেখি। তারা কাকের মতো চোখ বন্ধ করে সংসার চালায়। তাদের স্পাউজ অন্য নারী কিংবা পুরুষের সাথে পরকীয়া প্রেম করে যাচ্ছে, সে জানে, তবুও না দেখার না জানার ভান করে সংসার চালিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, টিল নাউ চালিয়ে যাচ্ছে। স্পাউজও চালিয়ে যাচ্ছে, পরকীয়া বদলে।

এটা আমাদের প্রাচ্যের দর্শন। তাই প্রাচ্যের স্বামী বা স্ত্রী একে অন্যের পরকীয়া বিষয়টি দেখেও না দেখার মাধ্যমে একটি সংসার জীবন অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।

একবার প্রসঙ্গক্রমে এক অধঃস্তন কর্মচারি এক স্বামী বা স্ত্রীকে বললেন আপনার স্পাউজ ওখানে আছেন, সেখানে আরও আছেন অমুক। খাবার পাঠালে তাঁর জন্যও তো পাঠাতে হবে। সাথে সাথে তার বস রেগে ফায়ার। “আমি কি তোমার কাছে জানতে চেয়েছি সেখানে কে কে আছে? কক্খনো এভাবে না জানতে চাইলে বলবে না। ঠিক আছে?”

স্পাউজের পরকীয়াকে মেনে নেওয়া না দেখার না জানার ভান করে সংসার চালিয়ে যাওয়া বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, সারাজীবন চালিয়ে যাওয়া এটাই আমাদের দেশের তথা প্রাচ্যের অন্যতম রীতি যেটা আমাদের একজন মহান দেবতা কৃষ্ণও করেছেন। প্রাচ্যের মানুষ তো করতেই তো পারে। রাধারাও করে। না হলে কৃষ্ণের প্রেম-পরকীয়া নিকষিত হেমে পরিণত হবে কীভাবে?

৩.

আমার বন্ধুটি কয়েক ধাপ এগিয়ে। সে মনে করে, প্রেম-পরকীয়া আছে বলে সে সুখে আছে। এমনকি প্রেম-পরকীয়া আছে বলে তার সুখের সংসার আছে। তার মতে, আমি তো ভাই, সব দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। ঘরে আমি সন্তান দিচ্ছি। তাদের মানুষ করছি। বাইরে প্রেম-পরকীয়া করে আরেকটু ভালো আছি।

প্রাচ্যের প্রেম-পরকীয়া সংসারকে সুখের করছে, এমনকি পরের ঘরকেও। প্রেম-পরকীয়া সমাজকে কী দিচ্ছে? তা নিয়ে ভাবতে হবে।

মোবাইলে ম্যাসেজ টেক্সট পড়ে ফেলল স্পাউজ। তার স্বামী বা স্ত্রীর পরকীয়া জেনে গেল তার স্বামী বা স্ত্রী। এবার ঠেলা সামলাও। জিনিসটা জানাজানি হওয়াতে সংসার হয়ে যেতে পারে কুরুক্ষেত্র অথবা সরাসরি এবার থেকে মানামানি। তাতো প্রাচ্যের দর্শনে অসম্ভব। না-জানার ভান আর স্পাউজের পরকীয়া জেনে মেনে চুপ থাকা সেতো প্রাচ্যের দর্শনে পুরোপুরি যায় না। কিন্তু ও-ক্ষেত্রে উপায় নেই। যদি স্বামী হয় সকল স্পাউজ হয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান বা ক্ষমতাবতী। দেবতা বা দেবীর মতো হয় মানো, না হয় ভাগো। কী হয় সে ক্ষেত্রে? অনেক কিছুিই হয়, হচ্ছে, পত্রিকায় কিছু কিছু পাই।

৪.

যৌন জীবন দ্বিপাক্ষিক। বিয়ের পর কিছু কাল যাওয়ার পর একে নার্সার করা হয় না যখন দুদিক থেকে, একপাক্ষিক হয়ে দাঁড়ায়, অন্যপক্ষ তখন বিকল্প খুঁজতেও কখনো কখনো বাধ্য হয়। বিবাহিত যৌন জীবন দ্বিপাক্ষিক ও পারস্পরিক ইন্টারেস্ট ও চাওয়ার মূল্য দিয়ে নিত্যনতুন রাখা দুজনের দায়িত্ব। সেখানে ঘাটতি ঘটলে, ডেভলপারদের নজরে পড়ে উন্নয়ন-সম্ভাবনাময় ভুমি হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে যখন তখন। মনে রাখবেন, ভূমিদস্যু ডেভলপাররা উন্নয়ন-সম্ভাবনাময় ভুমির খোঁজে থাকে সবসময়। সুতরাং ভূমি ফেলে রাখবেন না। আপনার স্বোপার্জিত জমি কাজে লাগান, কাজে খাটান। দখলে রাখেন। (বিজ্ঞাপনের ভাষায়: টাকা ইউ ক্যাশ করুন। নইলে তো চোর ডাকাতেও নিয়ে যেতে পারে।)