ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষা –

– মাবাবার জন্য কি গর্বের?

– সরকারের জন্য নাকি সাফল্যের?

– শিশুদের জন্য নিঃসন্দেহে আতঙ্কের, বঞ্চনার ও বিকাশের পখে প্রতিবন্ধক, আর

– জাতির জন্য দুর্ভাগ্যের।

“আমার মেয়ে জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। শতকরা ৯৩.৫ করে নাম্বার পেয়েছে। ৬০০ এর মধ্যে ৫৬১ নম্বর পেয়েছে।” পিইসি পরীক্ষার রেজাল্ট পেয়ে একজন বাবা উপরের কথাটি জানালেন তার সহকর্মীদের। তাঁর কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ছিল পেঁজা পেঁজা তুলোর মতো গর্ব। এই বাবাটি গর্ব করতেই পারেন, এরকম সব মাবাবাই পিইসি পাবলিক পরীক্ষায় শিশুসন্তানের অধিক নাম্বার, জিপিএ ফাইভ প্রাপ্তিতে গর্ব করতে পারেন। কারণ তিনি বা তাঁরা সন্তানের পিইসিতে ছাত্রদের অধিক নাম্বার, জিপিএ ফাইভ পাওয়ার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। সন্তানকে বছরের পর বছর অনেক কিছু ত্যাগ করিয়েছেন। এমনকি এই ত্যাগ কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুর কাছে বঞ্চনার পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তার শৈশব মাটি হয়ে গেছে। সে খেলা খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কিন্তু আজ যে তার জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্টে অনেক নাম্বার যোগ হয়েছে তা তো ঐ ত্যাগ, বঞ্চনারই কারণে। সে কিছু হারালো বিনিময়ে কিছু পেল। আসলে কী হারালো বিনিময়ে কী পেল? যা হারালো তাতে কী ক্ষতি হবে? ক্ষতির ভাবনা কেউ ভাবছি না। ভাবছি, গর্ব করছি এই অধিক নাম্বার নিয়ে কিন্তু এই অধিক নাম্বার তার জীবনকে কী দেবে? নগদ প্রাপ্তি সমাজে এজন্য গর্ববোধ করা। কিন্তু কিসের বিনিময়ে এই মাবাবার জন্য গর্ব? কিসের বিনিময়ে সরকারের সাফল্য প্রচার? শিশুসন্তানের বঞ্চনা আর জাতির জন্য ধ্বংসের পিএসসির বিনিময়ে নয় কি? বাবামা ও সরকারকে এত নির্মম স্বার্থপর হওয়া কি উচিত? শিশুসন্তানকে বঞ্চিত করে আর জাতির ভবিষ্যৎ নষ্ট করে বিকৃত গর্ব বিকৃত সাফল্য প্রকাশ ঠিক নয়। এ-এক ভয়ানক অদূরদর্শিতা।

আমরা মাবাবারা শিশু-সন্তানকে সবচেয়ে ভালোবাসি। শিশুসন্তানের প্রতি বাবামার ভালোবাসা সবসময় সুবিধাজনক হয় না। শিশুসন্তানের জন্য তা ক্ষতিকর কিনা তা ভেবেচিন্তে বুঝে শুনে প্রয়োগ করা উচিত নয়। আমি আমার শিশুকে যেমন সবকিছু খাওয়াতে পারি না, ভাবি যা খাওয়াবো তা িখাদ্য না অখাদ্য? ফরমালিন যুক্ত নাকি ফরমালিন মুক্ত?

পিইসি পরীক্ষায় ছাত্রদের অধিক নাম্বার, জিপিএ ফাইভ মাবাবার গর্ব হয়, স্কুলের সুনাম হয়, সরকারের সাফল্যের তালিকায় একটি পয়েন্ট যুক্ত হয়, এজন্যেই কি পিএসসি শিশুদের ঘাঁড়ে চেপে থাকা দরকার?

আসলে পিইসি একটি স্ট্রেস বা চাপ শিশুদের উপর, যা শিশুর সুস্থভাবে বিকশিত হওয়ার পথে বিরাট বাধা। এজন্যই শিশুর বয়সের দিক দিয়ে নীতি গর্হিত ও শিক্ষানীতি বহির্ভূত সত্ত্বেও। এজন্যই এব্যাপারে আমাদের যত মাথা ব্যথা। কিন্তু আমরা মাবাবা স্কুল ও সরকার সবাই নিজ নিজ গর্ব, সুনাম ও সাফলের জন্য পিইসি নামক পাবলিক পরীক্ষা চাপিয়ে দিয়েছি ছোট ছোট শিশুদের ঘাঁড়ে, যা শিশুর বয়সের দিক দিয়ে নীতি গর্হিত ও শিক্ষানীতি বহির্ভূত সত্ত্বেও। অথচ শিশু অধিকার সনদে উল্লিখিত (সিআরসি…) ধারা অনুসারে আমাদের উচিত (ছিলে) শিশুর মতামত ও শিশুর ভালোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পিইসি নামক পাবলিক পরীক্ষাটি ছোট শিশুদের ঘাঁড় থেকে নামিয়ে ফেলা, যা (আবারও বলি) শিশুর বয়স ও বিকাশগত দিক বিবেচনায় নীতি গর্হিত ও সর্বশেষ শিক্ষানীতি বহির্ভূত।

আমাদের নীতিনির্ধারকগণ যদি বলেন, সর্বশেষ শিক্ষানীতি বহির্ভূত হোক আর শিশুর বয়স ও বিকাশগত দিক বিবেচনায় নীতি গর্হিতই হোক আমরা এটা কিছুই মানব না আমরা পিএসসি নামক পাবলিক পরীক্ষাটি চালিয়ে যাব। তাঁদের কে থামাবে? আল্লাহ ছাড়া কারো সাধ্য নেই।

জাফর ইকবাল সাহেবের “একটা দু:খের গল্প” যদি এইসব কোমলমোতি সন্তানদের বাবা-মায়েরা না বুঝতে পারেন, যদি এখুনি তারা নিজেরা সতর্ক না হন, যদি সরকার জাতির ভবিষ্যতের কথা না ভাবেন, তাহলে কার কী করার আছে? পরিণামে, বর্তমান ভৌতিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে তিন কোটি কাগুজে ইন্টারমিডিয়েট পাশ তরুন প্রজন্ম সমাজের ঘাড়ে সওয়ার হয়েছেন, তাদের সঙ্গে এই সন্তানদের তালিকাই কেবল যোগ হবে । তাই বলছি, সাধু সাবধান !!!!

পিএসসি নামক পাবলিক পরীক্ষাটি ছোট শিশুদের ঘাঁড় থেকে নামিয়ে ফেলার জন্য আমার সংগৃহীত যুক্তিনির্ভর পূর্ববর্তী ইনডেফথ পোস্ট পড়তে পারেন:

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিশুদের রক্ষা করুন, পিএসসি পরীক্ষা পদ্ধতি বন্ধ করুন