ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

সরকারের বিনামূ্ল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ:
নতুন বছরের প্রথম দিনে ছাত্র-ছাত্রীদের বিনামূল্যে বই বিতরণ গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি সুন্দর রেওয়াজ বা উৎসবে পরিণত হয়েছে। এটি সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। নতুন বছরের প্রথম দিনে ছাত্র-ছাত্রীদের বিনামূল্যে বই পেয়ে গেছে। অথবা যারা পায়নি তারাও বই পেয়ে যাবে।

ব্যবসায়ীদের চড়ামূল্যে গাইডবুক/প্র্যাকটিচ বুক/নোটবই বিক্রয়:

অন্যদিকে নিষিদ্ধ গাইড/প্র্যাকটিচ বুকওয়ালারা? তারা নাকি আরও আগে থেকে তৎপর ছিল। জানা যায়, “বছরের শুরু না হতেই পঞ্চম শ্রেণির প্রায় সব শিক্ষার্থীই অন্তত একটি গাইড বই কিনেছে। একই উদ্দেশ্যে অনেক বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরাও গাইড কিনতে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করছেন। আবার কোথাও স্কুল কর্তৃপক্ষ একাধিক গাইড কিনতে বাধ্য করছে বলে অভিযোগ করেন অভিভাবকেরা।”(দিলরুবা সুমী, “প্রাথমিকে যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্ন কদর বেড়েছে নিষিদ্ধ গাইডে”, সকালের খবর, বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৮ ২০১৪।)। প্রতিবেদনটি পাঠ করে মনে হল, এনসিটিবি ও জিপিডিসি-বি (গাইড পাবলিকেশনস এন্ড ডিসট্রিবিউশন কোম্পানীজ বাংলাদেশ) দৌড়-প্রতিযোগিতায় আছে। সরকার অল্প কদিনের মধ্যেই প্রতিযোগিতা থেকে সরে যাবে। তারপর সারা বছর মাঠে দখল থাকবে গাইডবুক/প্র্যাকটিচ বুক/নোটবই ব্যবসায়ীদের হাতে। তারা মূল্যের বিনিময়ে এমনকি চড়ামূল্যেও বিক্রয় করবে তাদের মহামূল্যবান গাইডবুক/প্র্যাকটিচ বুক/নোটবই।

দেখে-শুনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নটি জাগে, নতুন বছরে নিষিদ্ধ গাইড বিক্রি বনাম বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের দৌড় প্রতিযোগিতায় কে আগে আছে? কে পিছে?

আরেকটি প্রশ্ন: গাইড, নোটবই কি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের প্রয়োজন?  যদি প্রয়োজনই হয়, যদি গাইড/প্র্যাকটিচ বুক, নোটবইয়ের উপযোগিতা থাকে (মনের কথা নয়, ক্ষোভের ভাষায় বলি), তাহলে সরকার (এনসিটিবি) কেন বিনামূল্যে গাইড/প্র্যাকটিচ বুক, নোটবইও দিচ্ছে না? বিনামূ্ল্যে পাঠ্যবইয়ের সাথে বা পরে বিনামূল্যে গাইড/প্র্যাকটিচ বুক ও নোটবইও দেওয়া উচিত। আর যদি গাইড, নোটবইয়ের উপযোগিতা না থাকে তাহলে কঠোরভাবে তা বন্ধ করা হোক।

সকালের খবর এর প্রতিবেদনটিতে আরও আছে, “নোট-গাইড প্রকাশকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন নিয়েই স্কুল কর্তৃপক্ষ এমন কাজ করছে বলে মনে করেন অভিভাবকরা।” এরকম, রাজাকারদের নিয়ন্ত্রণে আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে বই উৎসব, যোগ্যতাভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতি ও সৃজনশীল প্রশ্ন-পদ্ধতি ইত্যাদির মরণাবস্থা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরাজয় নয়?

বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশে মানবতার শত্রু তথা নব্যরাজাকাররা শিক্ষার মতো জাতির মেরুদণ্ডে কালো থাবা বিস্তার করেছে। যেমন একাত্তরে এ-দেশে জন্ম নেওয়া কিছু লোক বাংলাদেশের জন্ম বিরোধিতা করে অস্ত্র হাতে আমাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশের শত্রু পাকিস্তানি হানাদারদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছে রাজাকার নামধারণ করে। কিন্তু একাত্তরের পর আমরা তাদের শাস্তির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারিনি। তাদের পাওনা শাস্তি নিশ্চিত করতে পারিনি। ফলে আবারও স্বাধীন দেশে দেশের শত্রু, মানবতার শত্রু নব্যরাজাকারের উদ্ভব হয়েছে। বর্তমান স্বাধীন দেশে উদ্ভূত নব্যরাজাকাররা আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে আমাদের মুখোমুখি হয়েছে। তারা আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে নিষিদ্ধ গাইড লেখা-প্রকাশ বিক্রি বিপণন ও ব্যবসায় ও শিক্ষাবেনিয়াগিরির মাধ্যমে নেমেছে তাতির মেরুদণ্ড ধ্বংসে। এরা আমাদের শিক্ষাসেক্টরে নব্যরাজাকার।

শিক্ষাসেক্টরে এসবনব্যরাজাকারদের সম্মিলিত অপচেষ্টায় আমাদের প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, এমনকি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা-ব্যবস্থাও ‘গাইড-নির্ভর’ হয়ে পড়েছে। দেশজুড়ে এভাবে নব্যরাজাকারদের হাতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, যোগ্যতাভিত্তিক পরীক্ষাপদ্ধতি, সৃজনশীল প্রশ্ন-পদ্ধতির মতো শুভ উদ্যোগসমূহের ধ্বস তথা মুক্তিযদ্ধের চেতনার মতো শুভ কাজগুলোর পরাজয় দেখে আমরা আশঙ্কিত ও আতঙ্কিত বোধ করছি।

কিন্তু শর্ষের মধ্যেই তো ভুত। একদিকে, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে বছরের প্রথম দিনে পাঠ্যবই দেওয়া হয়। অন্যদিকে গাইড কিনতে বাধ্য হচ্ছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সবাই। একদিকে যোগ্যতাভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতি ও সৃজনশীল প্রশ্ন-পদ্ধতি, অন্যদিকে কোচিং ও গাইড-নির্ভরতা বন্ধ করার দাবি উঠলেও কোনো কঠোর উদ্যোগ আয়োজন চোখে পড়ে না। এ এক চরম স্ববিরোধিতা চলছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়। পাঠ্যবইয়ের আগে গাইডবই সংগ্রহ সম্পন্ন হয়ে গেছে কোথাও কোথাও। শুনে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই, ছাত্র-শিক্ষক-পাঠ্যবই উন্নয়কারী সবাই ‘গাইড-নির্ভর’ হয়ে পড়েছে।

আরেকটি ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে, বাস্তবে দেখা যায়, স্বয়ং পাঠ্যবই উন্নয়নকারী ও শিক্ষকেরই যেখানে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি নিয়ে যথাযথ ধারণা নেই, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এই পরিস্থিতিতে উল্টো ফল হয়েছে। বেড়েছে গাইড বই, কোচিং ও সাজেশন নির্ভরতা। ‘গাইডনির্ভর’ হয়ে পড়ছে সৃজনশীল পশ্ন পদ্ধতি। প্রমাণ চান, পাঠ্যবই লেখক,শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের কাজের ও পড়ার টেবিল চেক করুন। আর অভিভাবকদের সাথে কথা বলুন। পাঠ্যবই উন্নয়কারী ও শিক্ষকদের সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি সম্পর্কে দক্ষ করতে না পারায়ই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তারা গাইড বই দেখে এ পদ্ধতির প্রশ্ন প্রণয়ন করেন।

জানা যায়, বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার জন্য শিক্ষকরা বাইরে থেকে প্রশ্ন কেনেন। অথচ শিক্ষামন্ত্রণালয়ের আদেশানুযায়ী বাইরে থেকে সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশ্নপত্র কেনা নিষেধ। কিন্তু শিক্ষকরা মন্ত্রণালয়ের এ আদেশ মানছেন না।

যেখানে পাঠ্যবই উন্নয়কারী ও শিক্ষকরাই এই পদ্ধতি পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারেননি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, পাঠ্যবই উন্নয়কারী ও শিক্ষকদের অগ্রগতিতেই যদি এই দশা; তাহলে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়ন হবে কি করে?

অন্যদিকে এরই সুযোগে আমাদের শিক্ষা ও সৃজনশীল প্রশ্ন-পদ্ধতির নিয়ন্ত্রন চলে গেছে নব্যরাজাকার গাইড লেখক ও কোচিং ব্যবসায়ীদের হাতে। তাই আবারও প্রশ্নটি পুনরাবৃত্ত করছি, এটা কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযদ্ধের চেতনার পরাজয় নয়?

একটা শোষণহীন, বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যে একাত্তরে মুক্তিকামী বাঙালি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে। রাজাকার আলবদররা তা চায়নি বলে এর বিরোধিতা করেছে। দেশের শিক্ষক, সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর আবার দেশের শাসন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে নেয় স্বাধীনতাবিরোধী সেই মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধপথে নিয়ে যেতে থাকে।

এখনও যারা দেশের শত্রু নব্য রাজাকার তারা একটা শোষণহীন, বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠন যাতে ব্যাহত হয় সে উদ্দেশ্যে সংবিধানে উল্লিখিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়তে দিচ্ছে না। সাম্প্রতিক শিক্ষানীতিতে নেই এমন ব্যবস্থাই শিক্ষাক্ষেত্রে চাপিয়ে দিচ্ছে। সমস্ত ভালো নীতিমালা বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। কিছু নব্য রাজাকারদের অপকর্মের কারণে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মরণাবস্থা ও সৃজনশীল প্রশ্ন-পদ্ধতির মতো শুভ উদ্যোগ ধ্বংস হতে চলেছে। এদের রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ কাজে জড়িত থাকাটা এতটাই দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর যে তা মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারদের শত্রুর পক্ষে হয়ে কাজ করার চেয়ে কোনো অংশে কম ক্ষতিকর নয়।

সামাজিকভাবে এসব নিষিদ্ধ গাইড ব্যবসায়ী ও এধরনের বেনিয়ারা নব্য রাজাকার হিসেবে আখ্যায়িত করা উচিত। এরা পোশাকে-আশাকে দেশপ্রেমিকের আলখাল্লা পরে সুন্দর করে কথা বললেও দেশের শিক্ষার বিরুদ্ধে এতটাই দেশদ্রোহমূলক ও অপকর্মে লিপ্ত যে নতুন বছরে এদের নব্যরাজাকার নামে খেতাব দেওয়া হোক।

সরকারের প্রতি আমাদের অনুরোধ, স্বাধীন দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এসব নব্যরাজাকারদের চিহ্নিত করুন, প্রাপ্য খেতাব দিন, এদের নিয়ন্ত্রণ থেকে শিক্ষা বাঁচান, জাতিকে বাঁচান।

সেই সাথে আসুন, আমরাও শিক্ষাক্ষেত্রে এসব দেশ ও জাতির মেরুদণ্ড ধ্বংসকারীদের নব্য রাজাকার সম্বোধন করতে শুরু করি। এসব গাইডব্যবসায়ী, শিক্ষাকে যারা নিষিদ্ধ পণ্যের মতো ব্যবহার করে বা এধরনের বেনিয়ায় জড়িত সমাজে তাদের চিহ্নিত করি, তারপর জাতীয়ভাবে এদের ঘৃণাভরে ডাকি নব্য রাজাকার। বলি, তুই রাজাকার।

লেখাটি একটি নিউজ ওয়েবপোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে এই শিরোনামে: নববর্ষে পাঠ্যবই ও গাইডের দৌড়-প্রতিযোগিতা