ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 
পুরো চেহারাটা যে কেউ দেখলে চমকে উঠবেন ।

পুরো শরীরটাই এমন টিউমারে আক্রান্ত।

শরীর জুডে জটিল ব্যাধির নির্দশন দেখাচ্ছেন হোসনে আরা বেগম।

প্রতিবেদকের সাথে কষ্টের কথা ভাগ করছেন হোসনে আরা বেগম।

হোসনে আরা বেগম, বয়স ৬০ বছর পেরিয়ে গেছে । বয়স যখন ৩৫ বছর তখন প্রথমে শরীরের কিছু স্থানে দেখা দেয় বেশ কিছ গুটি, প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও দিনে দিনে তা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ছোট ছোট গুটি এক সময় আকারে বড় হতে থাকে। এই অবস্থায় অবস্থা চরম আকার ধারন করে, আলু আকৃতি  হাজার হাজার টিউমার পুরো শরীর জুড়ে ছরিয়ে পরে । এই টিউমারের ফলে তার নাম ’আলু মানবী’ হিসেবে এলাকায় পরিচিত হয়ে উঠে ।

বিরল রোগে আক্রান্ত হোসনে আরা বেগম এর বসবাস বাংলাদেশের  নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জে । গ্রামের নাম গুতিয়াবো আগারপাড়া। হোসনে আর বেগম ২৫ বছর ধরে  বিরল এই রোগে ভুগছেন। স্বামীহারা, ভিটেবাড়িহারা এই আলু মানবীর জীবন কাটছে করুণভাবে। একমাত্র রিকশাচালক ছেলে সাইফুল ইসলামের সাধ্য নেই মায়ের চিকিতসা করায়।

সরেজমিন আগরপাড়া গিয়ে দেখা যায়, পুরো শরীরের উপর আলুর মতো গুটি গুটি টিউমার। পা থেকে মাথা অবধি হাজার হাজার টিউমার ঝুলে রয়েছে। সবচেয়ে বড় আকৃতি টিউমারের আকার প্রায় একটি ক্রিকেট টেনিস বলের সমান।

পুরো শরীরে জায়গা করে নেয়া এসব টিউমার আকৃতি মাংস পিন্ড নিয়ে আলু মানবী হোসনে আরা বেগম এর জীবন যাপন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। শরীরে প্রতিনিয়ত জ্বালা পোড়াসহ যন্ত্রনা হয়।

লোকের বিদ্রুপ আর স্থানীয়দের বিরুপ মন্তব্যের কারণে ঘর থেকে খুব একটা বের হন না। । অদ্ভুদ এই রোগের কারণে চলাফেরায় নানান সমস্যায় পরতে হয় তাকে।

দেখা যায়, হোসনে আরার শরীরের বিভিন্ন অংশে আলু সাদৃশ্য হাজার হাজার গুটি। মুখমণ্ডলের চোখ, নাক, মুখের কিছু অংশ বুঝা যায়। হাতের পায়ের রানের গুটির অংশগুলো আরো বড়।  পিঠে পেটে, উরুর কাছে অসংখ্য আলু গোটা। শরীরের এমন কোন অঙ্গ আর অংশ নেই যেখানে জটিল এ মাংস পিন্ডের উপস্থিতি নেই।  দেখতেও ভয়ঙ্কর লাগে।মানুষ বলে চিনতেও অনেক সময় ভূল হয়ে যায় । এলাকার ছোট শিশুরা ভয়ে তার কাছে যায় না । ভয় পায় দুরে দুরে থাকে।

হোসনে আরা জানান, যন্ত্রণা শারিরীক মানষিক দুটোই এখন সঙ্গি, প্রচন্ড ব্যথায় প্রায়ই জ্বর হয়- চুলকায়, জ্বালাপোড়া করে। অনেক সময় ঘষা লেগে ছুলে গেলে পচা রক্ত- পানি বের হয়। যন্ত্রণা কমাতে পানিতে গা ডুবিয়ে বসে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।দিনে দু’বারও গোসল করেন কোন কোন দিন। ইতোমধ্যে স্বরণশক্তিও লোপ পেয়েছে তার । কোন কিছু আর আগের মতো মনে রাখতে পারেন না।

অভাব, হতাশা আর যন্ত্রণা নিয়ে জীবনের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করছেন হোসনে আরা। কিন্তু যন্ত্রণা এতই বেড়ে চলছে যে, তিনি আর বেঁচে থাকার সাহস খুঁজে পান না। অর্থাভাবে চিকিতসা করাতে পারেননি কখোনো। যা করেছেন স্থানীয় চিকিতসকের মাধ্যমেই। তারও এর কোন কিছু জানাতে পারেননি এই রোগটি সর্ম্পকে।একবার স্থানীয় একজন চিকিতসক চারটি টিউমার অপারেশন করার চেষ্টা করেন। সে সময় অনেক রক্ত ক্ষরন হয়। হোসনে আরার খরচ হয় ২০ হাজার টাকা। এর পর আর তিনি কোন চিকিতসকের কাছে যাননি। স্থানীয় হোমিও চিকিতসকের শরনাপন্ন হন। এভাবেই টোটকা চিকিতসা করেছেন। বর্তমানে সুস্থ হওয়ার সকল আশা ছেড়ে দিয়েছেন হোসনে আরা।

উপজেলার গুতিয়াব মধ্যেপাড়া গ্রামের মৃত সাইজুদ্দিন মিয়ার মেঝো কন্যা হোসনে আরা। জন্মলগ্নে তার ঠোঁটের বামপাশে ছোট্ট আঁচিলের মতো একটি গোটা ছিল। সেটাই দিনদিন বড় হয়ে আলু আকৃতি ধারণ করেন বলে জানান তিনি । ১৬ বছর বয়সে হোসনে আরার বিয়ে হয় পার্শ্ববর্তী শিমুলিয়া গ্রামের কারখানা শ্রমিক আরজু মিয়ার সঙ্গে। ৮৬ সালের দিকে মানষিক ভারসাম্য হারান। এর কিছু দিন পরেই মারা যায় স্বামী আরজু।

দুই বছরের শিশুসন্তান নিয়ে যখন অভাবের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন ভাইয়েরা তার এবং তার সন্তানের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে হোসনে আরাকে নিয়ে আসে পিতার বাড়ি। এদিকে দিন দিন শরীরের টিউমার সদৃশ্য মাংস পিন্ডটি হতে থাকে। হোসনে আরা বলেন ‘গ্রামের ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু অসুখ কমে নাই। অনেকে বলেছে টিউমার। হোমিওপ্যাথি ওষুধ খেলে ঠিক হয়ে যাবে।  হোমিওপ্যাথি খেলাম অনেক বছর। কোন উপকার পাই নাই।

পরে লোকজনের কাছে  সহযোগিতা নিয়ে স্থানীয় মুড়াপাড়ার রফিক ডাক্তরের কাছে অপারশেন করিয়েছিলাম। হোসনে আরা উদাস হয়ে বলেন, অপারেশনের পর থেকেই শুরু হলো তার অভিশপ্ত জীবন। হাজার হাজার আলু গোটায় ভরে যেতে থাকলো সারা অঙ্গ। হোসনে আরা ফুপিয়ে-ফুপিয়ে কেঁদে বলেন, আমি পোড়া কপালি। আর না হলে ক্যান এমন হবে। স্বামী হারালাম। স্বামীর ভিটেবাড়ি হারালাম। ঠিকমতন পেট ভইরা খেতে পারি না। আর এমন এক রোগ মানুষও কাছে আসে না; ভালোবাসে না । আর শিশু কিশোরেরা আমাকে দেখে ভয় পায় । এখন মরতেও পারি না। খোদায় আমাকে যদি তুলে নিয়ে যেত! এই যন্ত্রণা যন্ত্রনা থেকে মৃত্যুও অনেক ভালো।