ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বিষয় নিয়ে দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা জনগনকে ক্রমেই অতিষ্ট করে তুলছে। দেশে বিরাজমান প্রতিটি রাজনৈতিক দলই জনগনের চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারে উদাসীন। জনগন প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। দু’দিন পর পর বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে বিরোধী দল কর্তৃক দেশ অচল করার কর্মসূচী এবং ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক মনগড়া সিদ্ধান্ত আর কেউ চায় না। জনগন শান্তি চায়। দু:খের বিষয়, দেশের জনগন নিয়ে কোন রাজনৈতিক দলই ভাবে না। তারা তাদের স্বার্থ নিয়ে ব্যাস্ত। ভোট দিয়ে যেন তাদের ০৫ (পাঁচ) বছরের জন্য ব্যাক্তিগত এবং রাজনৈতিক স্বার্থে কাজ করার অধিকার নিশ্চিত করেছে জনগন। যে যায় লঙ্কায় সে-ই হয় রাবন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতিহারে তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার কোন কথা বলা ছিলনা, কিন্তু তারা এখন সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। অথচ নির্বাচনী ইশতিহারে উল্লেখিত ভিশন -২০২১ বাস্তবায়নের ধারে কাছেও তারা নেই। চিরকালের জন্য কিভাবে ক্ষমতা আকড়ে ধরে রাখা যায়, তা নিয়েই ব্যাস্ত তারা।

আজকে যে তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থার ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সেই সরকার ব্যবস্থা ছিল আওয়ামী লীগের আন্দোলনেরই ফসল। সর্বপ্রথম জামায়াত এবং তারপর আওয়ামীলীগ ১৯৯৩ সালে তত্ত্ববধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিল সংসদ সচিবালয়ে পেশ করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, জাতীয় নির্বাচনকে অবাধ ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে সংযোজন করা উচিত। বি এন পি প্রথম থেকেই এ দাবীকে অসাংবিধানিক বলে আসছিল। ”পাগল এবং শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ হতে পারেনা” -তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রসঙ্গে বেগম জিয়া এমন মন্তব্যও করেছিলেন বলে জানা যায়। অত:পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এর অধীনে নির্বচনের দাবীতে অসহযোগ আন্দোলনসহ অন্যান্য কর্মসূচী এবং ১৯৯৫ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে একটানা ০৭ দিন হরতালের মত কঠোর কর্মসূচীও পালন করেছিল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। আজ সেই আওয়ামী লীগ বলছে- ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিষয়ে আদালতের রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার কোন সুযোগ নেই। অথচ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারের কাঠ গড়ায় দাড় করানো জামায়াতের এসব নেতৃবৃন্দের সাথে সুর মিলিয়ে তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে আন্দোলন করেছিলেন। আজ সুযোগমত সুর পাল্টিয়ে আদালতের রায়কে অজুহাত হিসাবে উপস্থাপন করছেন।

সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে আদালতের রায় মেনে নেয়া যদি বাধ্যতামুলক হয়, তবে আদালতের রায়ে তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে আরো দুটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করার কথাওতো বলা ছিল, সেদিকে নজর নেই কেন? জনগনের নির্বাচিত সংসদের হাতেই সংবিধান সংশোধনের সম্পূর্ন ক্ষমতা। তবে গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গনভোটের আয়োজন করতে হয় বলেই আমি জানি। এ ব্যাপারে সংবিধান বিশেষজ্ঞগন আরও ভালো বলতে পারবেন। ক্ষমতাসীনরা গনভোটের আয়েজন না করে আদালতে কেন গেলেন, সেটা আমার বোধগম্য নয়। সম্পূর্ন নিরপেক্ষ নির্বাচন, তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে সম্ভব কি না জানি না, তবে আমার মনে হয়, মন্দের ভালো হিসাবে জনগনের মনে এ ধরনের সরকারের ব্যাপারে আগ্রহ যেমন আছে, তেমনি আছে আবেগও । জনগন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পূর্বের নির্বাচনগুলোতে নির্ভয়ে অংশগ্রহন করেছেন। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো রাজনৈতিক কারনে যেসব অন্যায়, দূর্নীতি এবং দখলদারদের প্রশ্রয় দিয়েছিল। অতীতের তত্ত্ববধায়ক সরকারগুলো সেসবের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে এবং তাতে জনগনের সমর্থনও ছিল। জনগনের ভালোর জন্য এবং দেশে স্বচ্ছভাবে গনতন্ত্র অনুশীলনের লক্ষ্যে সংবিধান পরিবর্তন করার প্রযোজন হতেই পারে এবং এটাই স্বাভাবিক। সংবিধান সংশোধনে সমস্যা নেই। বড় সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার মানসে সংবিধান সংশোধন করা। আসলে রাজনৈতিক দলগুলো জনগনকে ক্ষমতার উৎস হিসাবে দেখে না। তারা জনগনকে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার এবং অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসাবে দেখে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে, জনগনকে ক্ষমতার অংশ হিসাবে দেখে, তাহলে এদেশে আর এত সমস্যা থাকত না। রাজনীতিকরা জনগনের কল্যানে কাজ করলে, জনগন অবশ্যই ভালো কাজের মুল্যায়ন করবে। এভাবে ফাঁক ফোঁকর বের করে ক্ষমতা পাকা পোক্ত করার ফন্দি ফিকিরের প্রয়োজন হত না।

জনগনের ভোটে নির্বাচিত হয়েই ক্ষমতায় যেতে পারতেন। ক্ষমতাসীন দল কি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারীর ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন? ২৩ মার্চের জনতার মঞ্চ এর কথাও কি মনে পড়ে না? ক্ষমতাসীনরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত তাদের মনগড়া সিদ্ধান্তে অটল থাকলে হয়তবা বি এন পি নির্বাচনে অংশগ্রহন করবেনা। আর বি এন পি নির্বাচনে অংশগ্রহন না করলে, জনগন সে একদলীয় নির্বাচনের ফলাফল গ্রহন করবে না। আবারও তৈরী হতে পারে জনতার মঞ্চ। আবার শুরু হতে পারে অসহযোগ আন্দোলন। ক্ষমতাসীনরা এখন যে আদালতের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করলেন, সে আদালত কি জনগনকে দমাতে পারবে। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব জনগন সংসদকে দিয়েছে, আদালতকে নয়। যাই হোক, জনগন বর্তমান প্রধান দু’টো রাজনৈতিক দলকে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হিসাবেই বিবেচনা করে। তারপরও জনগন নিরপেক্ষ (যতটুকু সম্ভব) নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতার পালাবদল দেখতে চায়। অন্তত ক্ষমতার পালাবদলের ক্ষেত্রে হলেও জনগনের চাওয়া-পাওয়ার মূল্য দিতে হবে। রাজনীতিকদের মনে রাখা উচিত, অস্ত্রের মুখে, পেশি শক্তি প্রয়োগ করে, জরুরী অবস্থা জারী করে অথবা আদালতের রায়ের অজুহাত দেখিয়ে সাময়িকভাবে ক্ষমতা আকড়ে রাখা গেলেও এর পরিনতি হবে অত্যন্ত করুন। কারন জনগনই সকল ক্ষমতার উৎস।