ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

এখন রমজান মাস। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য মাসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সওম সাধনার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায় সর্বাত্মক চেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছে। রমজান সওম সাধনার মাস, কারো ব্যক্তিগত বা মসজিদ- মাদ্রাসা উন্নয়নের মৌসুম নয়। এ মাসের শুরু থেকেই মসজিদের সামনে একটি টেবিল এবং একটি মাইক ইতোমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে। ”দিয়ে যান ভাই দিয়ে যান- পবিত্র রমজান মাস………….” ইত্যাদি। আবার কিছু ভিন্নমতাবলম্বী সংগঠন যেমন- দেওয়ানবাগ, জাকের পার্টি ও চরমোনাই ইত্যাদি ধরনের ইসলাম প্রচারকগন আসছে রমজান উপলক্ষে ওয়াজ- মাহফিলের আয়োজন শুরু করে দিয়েছে। নি:সন্দেহে ইহা উত্তম কাজ। কিন্তু এসব ওয়াজ- মাহফিলের আয়োজন করতে গিয়ে মাহফিল স্থলে ১০ জন লোক নাহলেও মাইকের বিস্তৃতি পুরো মহল্লা জুড়েই করা হয়ে থাকে এবং এ মাহফিল রাত ১২টা অবদি চলে। স্কুলগামী শিক্ষার্থীর পড়াশুনার ক্ষতি হতে পারে, সদ্য ভূমিষ্ট শিশু এবং তার মায়ের বিরক্তির কারন হতে পারে বা কোন মৃত্যু শয্যায়শায়িত অসুস্থ ব্যাক্তির জন্য যন্ত্রনাদায়ক হতে পারে এ মাইকের আওয়াজ। সেদিকে লক্ষ্য রেখে কোন তথাকথিত মাওলানাকে মাইকের ব্যবহারকে সীমিত করার ব্যাপারে নির্দেশ দিতে আজও শুনা যায়নি।

মাইক্রোফোন পেলে নিজেকে জাহির করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কিন্তু এ আওয়াজ, আরেকজন অসুস্থ ব্যাক্তি, যিনি এখনই নামাজ পড়ে বিছানায় যেতে চান তার নামাজে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, সেদিকে কারো বিন্দুমাত্র নজর নেই। নামাজ শুরু হবার এক- দেড় ঘন্টা আগে থেকে এবং সেহরীর সময় থেকে ফজর নামাজ পর্যন্ত মসজিদের মাইকগুলোতে ধর্মীয় আলোচনার কোন কমতি থাকে না এবং মাইকে উচ্চ শব্দ করে সেহরীর সময়ের জানান দিয়ে থাকে। আপাত দৃষ্টিতে ইহা অত্যন্ত ভালো কাজ বলেই মনে হয়। কিন্তু মাইকের এ আলোচনা এবং উচ্চ শব্দ করে সেহরির সময়ের জানান দেয়া যে আরেকজন ব্যক্তির বিরক্তির কারন হতে পারে, তা কি কেউ ভেবে দেখেছেন?

আমরা সবাই যার যার নিজের মত। আমাদের ধর্ম এবং কর্মের ধরনও স্বতন্ত্র। রমজানের পরে ঈদ। এ মাসে এমন অনেক লোক আছেন, যারা অতি ব্যাস্ত সময় কাটান। অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের জন্য অনেক রাত অবধি কর্মে নিয়োজিত থাকেন এবং খুব সকালে উঠে আবারও কর্মে জড়িয়ে পড়েন। এ ধরনের ব্যস্ত লোককে দেখা যায়, রাতে ঘুমানোর আগেই সেহরী খেয়ে ঘুমান এবং সূর্যোদয়ের পূর্ব মহুর্তে ঘুম থেকে ওঠে ফজরের নামাজ আদায় করেন। এছাড়া কিবা করার আছে। ঈদে বাড়তি খরচ মেটাতে তো বাড়তি উপার্জন ছাড়া কোন গতি নেই। আর বাড়তি উপার্জন করতে হলে তো বাড়তি কাজ- ই করতে হবে। কিন্তু এ বাড়তি কাজ করতে যেয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন, কারন মাইকের আওয়াজে রাতে ঘুম হয় না। আর দিনে তো ঘুমানোর সময়- ই নেই।

এ মাইকের আওয়াজ মায়েদেরও অনেক যন্ত্রনা দিয়ে থাকে। সেহরির জানান দেয়ার উচ্চ শব্দে ছোট বাচ্চাটি যখন ঘুম ভেঙ্গে কাঁদতে থাকে। ”মা” তখন কি করবে? পরিবার-পরিজনের সেহরির ব্যবস্থা করবে নাকি বাচ্চা সামলাবে? আর গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য এ মাইকের আওয়াজ মৃত্যুর কারনও হতে পারে। তাছাড়া এদেশ একশভাগ মুসলমানের আবাস নয়। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য বিরক্তির কারন হতে পারে এমন কাজ করা ইসলাম সমর্থন করে কিনা আমার জানা নেই। তবে সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ অনুসারে মৌলিক অধিকার হিসাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা যেহেতু সংবিধান সমর্থিত, সেহেতু অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের বিরক্ত করা নিশ্চয়ই সংবিধান পরিপন্থী।

এ তথ্য প্রযুক্তির যুগে মাইক বাজিয়ে কাউকে জানানোর কি আদৌ প্রয়োজন আছে? যে জানতে চায়, সে নিজের ইচ্ছায় জেনে নিবে। যে সেহরী খেতে চায়, সে ঠিকই খেয়ে নিবে। তাছাড়া সেহরির সময়ে ঘুম থেকে জাগানোর প্রযুক্তি প্রতি ঘরে ঘরেই আছে, যার যার সময় মত জেগে যাবে। জোর করে কাউকে ধর্ম পালনে বাধ্য করা সংবিধান সমর্থন করে না। আবার অহেতুক কাউকে বিরক্ত করা বা কষ্ট দেয়াও নিশ্চয়ই কোন পুণ্যের কাজ নয়।

এখন যদি ক্ষমতাসীন দল এসব নিয়ে কথা বলেন, বিরোধী দল বিপরীতমুখী বিবৃতি ছড়িয়ে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্ঠা করবে। অতএব সরকারের আশায় না থেকে মসজিদ কমিটির- ই উচিত রমজানে মাইকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রন করা।