ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

গত ১১ নভেম্বর সকালে রাজধানীর উপকন্ঠ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা পশ্চিমপাড়ায় স্কুলে যাবার সময় মা, বোন ও গাড়ি চালককে গুলি করে সিনেমা স্টাইলে পরাগ মন্ডলকে অপহরন করে সন্ত্রাসীরা। এমন একটি ঘটনা যখন ঘটেই যায়, তখন রাষ্ট্রের কর্তব্য কি? প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, গত ৫ আগষ্ট ২০১০ এ চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোর প্রায় ৭২৫ কিলোমিটার উত্তরে কোপিয়াপো শহরের কাছে সানজোস খনির একটি সুরঙ্গ ধসে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৭ শত ২ মিটার গভীরে আটকা পড়েছিল ৩৩ জন খনি শ্রমিক। দু- মাসের বেশী সময় ধরে সফলভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে ৩৩ জন খনি শ্রমিককেই অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার এবং একই সাথে একজন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের কর্তব্য সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সম্যক ধারনা প্রদানেও সক্ষম হয়েছিল চিলি সরকার। এ সফল উদ্ধার অভিযানের জন্য প্রশংসার ঝড় উঠেছিল সারাবিশ্বে এবং ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল চিলির প্রেসিডেন্ট সেবাস্টিয়ান পিনেরা ।

এ ঘটনাটি বিবিসিসহ গোটা বিশ্বের বেশিরভাগ গণমাধ্যমেই খুব গুরুত্ব সহকারে প্রচার করেছিল এবং চিলিকে বিশ্বের অনুপ্রেরনা হিসাবেও অভিহিত করেছিল কেউ কেউ। বিষয়টি জনসেবকদের জন্য অত্যন্ত অনুপ্রেরণার হলেও আমাদের দেশের তথাকথিত জনসেবকগন কেন অনুপ্রাণিত হয় না? রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি কর্তব্য পালনের মাধ্যমে কি দৃষ্টান্ত স্থাপন করার ইচ্ছা জাগে না, আমাদের দেশের তথা কথিত জনসেবকদের? তবে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপনের কোন প্রয়োজন-ই হবে না, যদি আগে থেকে প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়। এবং ইহাই দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাম্য। প্রকৃতপক্ষে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র কোন দূর্ঘটনা ঘটার আগে যেমন প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহন করে না। ঠিক তেমনি দূর্ঘটনা ঘটে গেলেও সেটাকে আবার বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাবার চেষ্ঠা করে। গত ১৩ নভেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় রাজধানীর আগারগাঁও কোস্টগার্ড হেড কোয়ার্টার্স পরিদর্শন করে পরাগ মন্ডল অপহরনের ব্যাপারে সাংবাদিকদের বলেন ”বিএনপি’র এককালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকার বুকে একটি শিশুকে গুলি করে মারার পরে বলেছিলেন-আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে। আমরা সেকথা বলছি না। আমরা বলছি -এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় বোধ হয়, নিজেকে খুব বুদ্ধিমান মনে করেন অথবা জনগনকে একটু বেশী বোকা মনে করেন। অপহরণ ঘটনাটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে আখ্যায়িত করাই যেন তার দায়িত্ব। বিএনপি’র তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মক্তব্যকে প্রসঙ্গ টেনে তিনি নিজের বক্তব্যটিকে একজন সফল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যথোপযুক্ত বক্তব্য হিসাবে-ই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তিনি এদেশের জনগনকে যতটা বোকা মনে করেছেন, আসলে এদেশের জনগন ততটা বোকা নয়। জনগন সবই বোঝে কিন্তু বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের পালা বদল ছাড়া দেশে শক্ত কোন বিকল্প নেই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের মত জনসেবকগন বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে আখ্যায়িত করেই দায়িত্ব শেষ করতে পারেন। কিন্তু যে মা পরাগ মন্ডলকে গর্ভে ধারন করেছিলেন, সে-ই গর্ভধারিনী মা, জন্মদাতা পিতা অথবা তার স্বজনরা কি পারে, এত সহজে দায়িত্ব শেষ করতে? গুলিবিদ্ধ মা হাসপাতালের বিছানায় ব্যাথায় কাতরালেও অপহৃত শিশু সন্তানটির জন্য তার প্রান যে কতটা ব্যকুল ছিল, তা কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় উপলব্ধি করতে পারবেন? হাসপাতালের বিছানায় তার হাহাকার থামানো সম্ভব না হওয়ায়, তাকে ঘুমের ঔষধ পর্যন্ত খাওয়াতে হয়েছিল চিকিৎসকদের। তারপরও কিছুক্ষন পর পর জেগে উঠেছিলেন পরাগের খোঁজে। অপহরণের তিন দিন পর পরাগ মন্ডলকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে- রাষ্ট্রের কোন সংস্থা কর্তৃক পরাগ মন্ডল মায়ের কোলে ফিরে আসে নি। সে ফিরে এসেছে তার বাবার প্রদ্ত্ত ৫০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে। পরাগ মন্ডল জীবিত উদ্ধার হয়েছে এর কৃতিত্ব নিতে এবং ৫০ লক্ষ টাকা মুক্তিপন প্রদানের বিষয় নিয়ে ধুম্রজাল তৈরীতেই রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ ব্যপারে র‌্যাব এবং পুলিশের বক্তব্যেও ছিল ভিন্নতা। এ ধুম্র জাল কেন? ইহা কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তার অধীনস্ত সংস্থাগুলোর দুর্বলতাকে আড়াল করার চেষ্ঠা? শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। পরাগ মন্ডলকে উদ্ধার করেছে তার বাবা। রাষ্ট্রের কোন সংস্থা নয়।

বিভিন্ন গনমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে জনগনকে যা-ই বুঝানো হোক না কেন, পরাগ মন্ডলের বাবা যেহেতু তাকে উদ্ধার করেছেন, এ সূত্র ধরে ৫০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণের বিষয়টি বুঝে নেবার পর্যাপ্ত জ্ঞান জনগনের আছে বলে আমি মনে করি। পরাগ মন্ডল উদ্ধারে রাষ্ট্র তার কর্তব্য পালনে অবহেলা করেছেন। আর যদি বলা হয়- রাষ্ট্র অবহেলা করেনি, তবে আমি বলব রাষ্ট্র ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অন্যথায় পরাগ মন্ডলকে রাষ্ট্রই উদ্ধার করতে পারত। রাষ্ট্রের ব্যর্থতা বা অবহেলার জন্য যদি কোন নাগরিককে ৫০ লক্ষ টাকা গচ্ছা দিতে হয়, তবে তার দায়ভার কি রাষ্ট্রের বহন করা উচিৎ নয়?। রাষ্ট্রতো শুধু পরাগ মন্ডলকে উদ্ধারেই ব্যর্থ হয়নি, তাত্ক্ষনিকভাবে মুল হোতা গ্রেফতার করতেও ব্যর্থ হয়েছিল? অপহরনের মুল হোতা কি এতই ক্ষমতাবান ছিল, যার সাথে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো পেরে উঠতে পারছিল না? নাকি মদদ দাতাদের নাম বেরিয়ে আসবে বলে ইচ্ছা করেই তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছিল না? এখন যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সে মূল হোতা কিনা, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে ধূম্রজাল। এ গ্রেফতার যদি নতুন করে জজ মিয়া বা কালা মিয়া তৈরীর পাঁয়তারা হয়। তবে কেন? কার স্বার্থে? জনগনের স্বার্থে কাজ করাই একটি রাষ্ট্রের প্রধান এবং নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিৎ। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, যে জনগনের কষ্টার্জিত অর্থে মাস শেষে দেশের মন্ত্রী-এমপিসহ প্রতিটি সরকারী কর্মকর্তা- কর্মচারীর বেতন হয়। আর সে-ই জনগনের স্বার্থে তাদের কাজ না করা কি স্বার্থপরতা নয়?