ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

জাষ্টিস গাজী শামসুর রহমান এর রচিত বই ‘বিচারক জীবনের স্মৃতিকথা’ একটি ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন। সম্ভবত ঘটনাটি ছিল পাবনায়। পাবনার একটি গ্রামে দু’ভাই থাকতো। তাদের বাবা মা দু’জনেই মারা গেছেন। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার আগে তাদের মাঝে সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারা করে দিয়ে যাননি। যার কারণে, এই সম্পত্তি নিয়ে তাদের দু’ভাই এর মাঝে হরদম ঝামেলা লেগেই থাকতো। এর মাঝে একদিন, বড় ভাই ছোট জনকে বিপদে ফেলার জন্য কুট বুদ্ধির ফাঁদ পাতলো। বড় ভাই তার ৯ বছরের ছেলেকে নিজ হাতে হত্যা করে ছোট ভাই এর বাড়ির পিছনে মাটি চাপা দিয়ে রাখল। উদ্দেশ্য ছোট ভাই এর ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে তাকে জেলে বন্দি করে রাখবে। আর সম্পত্তির পুরোটা সে একাই ভোগ করবে। এরপর বড় ভাই থানায় গিয়ে অভিযোগ করল যে, তার ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর পুলিশ নিয়মমাফিক অনুসন্ধানে নেমে পড়ল। অনুসন্ধান করতে গিয়ে পুলিশ, ছোট ভাই এর বাড়ির পিছনে সেই ছেলেটির লাশ খুঁজে পেল। সাক্ষী নির্ভর আইনে যা হবার তাই হল। ছোট ভাই এবং ছোট ভাই এর বউকে কোমরে দড়ি বেঁধে পুলিশ থানায় নিয়ে গেল।

সম্প্রতি বাড্ডায় পবিত্র কোরআন পোড়ানোর ঘটনাটিকেও একই ঘটনা মনে হচ্ছে।

ভারতের আরএসএস তথা বিজিপি এর দোষ ঢাকতে এবার আপন গোত্রের ক্ষতি করতেও কুন্ঠাবোধ করছে না মন্দিরের পুরোহিতরা। এটা সবারই জানা, বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ প্রচন্ড ধর্মভীরু! ধর্মের উপরে আঘাত আসলে তারা কোন ভাবেই সেটাকে বরদাস্ত করবে না। আর সেই সুযোগ নিয়ে একদল পুরোহিত পবিত্র কোরআন পুড়িয়ে বাংলাদেশে দাঙ্গা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। যাতে করে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অথর্ব আরএসএস সেনাদের সাম্প্রদায়িক উগ্র কর্মকান্ডগুলোকে বিশ্বের চোখে ধামাচাপা দেয়া যায়! যেমনটা করা হয়েছিল, তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’ নামক বইটি দিয়ে। লজ্জা বইটিকে ভারত কয়েকটি ভাষায় অনুবাদ করে গোটা ভারত সহ গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে প্রমাণ করতে চায়- দেখুন, আমাদের চেয়ে বাংলাদেশের মুসলিমরা কতো উগ্র আর সাম্প্রদায়িক। এগুলো শুধু আমার একার কথা নয়, স্বয়ং আহমদ ছফাও একই কথা বলে গেছেন।

আহমদ ছফা তাঁর “আনুপূর্বিক তসলিমা এবং অন্যান্য স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ” বই এর ১৬ পৃঃ লিখেছেন, “ বাবরী মসজিদ ধ্বংস এবং সংগঠিত গণহত্যার পর পৃথিবীর দেশে দেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশসমূহে যেখানে ভারতের ব্যবসা বাণিজ্যের স্বার্থ অনেক বেশী, সেক্যুলার ভারত রাষ্ট্রের ইমেজটি ভয়ঙ্কর ভাবে মার খেয়ে যায়। সকলে একবাক্যে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিন্হিত করতে থাকে।

তসলিমার বইটি যখন তাদের এলো তারা পৃথিবীকে বুঝাতে চেষ্ঠা করলেন আমরা সন্ত্রাসী নই। আসলে সন্ত্রাস চলছে বাংলাদেশে। এই যে দেখুন তাদের একজন লেখক বই লিখে সব কথা জানিয়েছেন। ভারতীয় শাসক এবং বিজেপি চেলারা নিজেদের সন্ত্রাসী মূর্তি আড়াল করার জন্য তসলিমার বইটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। নয়তো তাদের নিজেদের দেশে সংঘটিত অত্যাচার নির্যাতন পাইকারী গণহত্যা এগুলো চেপে রেখে তসলিমার বইটি প্রচার করতে এতখানি আদাজল খেয়ে উঠে পড়ে লাগলেন কেনো? কংগ্রেসের গৌহাটি সম্মেলনে যে প্রতিবেদন লেখা হয়েছে তাতে তসলিমার বইয়ের বিবরণ পুরা তিনটি পৃষ্ঠা জুড়ে স্থান পেয়েছে। বিজেপি দিল্লির লালালাজ পথ নগরে তসলিমার ছবি টাঙ্গিয়েছে। এসব ভারতবর্ষ কেনো করছে? বাংলাদেশ যতো বদমাশ দেশই হোক শায়েস্তা করার জন্য ভারতের এতোখানি উদ্যম উদ্যোগে ব্যয় করার প্রয়োজন নেই। নিজের সন্ত্রাসী চেহারার উপর ভদ্র আবরণ হিসেবে তারা তসলিমাকে শিখন্ডি হিসেবে ব্যবহার করে যাচ্ছেন”।

আর যারা একান্তই তসলিমা অনুরাগী কিংবা তার প্রেমে হাবুডুব খাচ্ছেন তাদেরকে বলছি, তসলিমা কখনো এই দেশটিকে ভালোবাসতে পারেনি। ভালোবাসলে সে কখনো বাংলাদেশকে অপমান করে আনন্দ বাজার পুরষ্কার গ্রহণ করত না। কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকা প্রথমে ঠিক করল তারা বাংলা একাডেমীকে আনন্দ বাজার পুরষ্কার দিবে। একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রিয় প্রতিষ্ঠানকে এহেন অপমান করার স্পর্থা আর কেউ দেখিয়েছে বলে আমার জানা নেই। বাংলা একাডেমী সে পুরষ্কার গ্রহণে অস্বাীকৃতি জানালে দু’দিন পর তারা সেই পুরষ্কারের জন্য তসলিমার নাম ঘোষনা করে। আর তসলিমাও ঠ্যাং ঠ্যাং করে নাচতে নাচতে পুরষ্কার গ্রহণ করতে যায়! একটি বারও দেশের মান সম্মানের কথা ভাবলো না। আর এই কথা গুলো শ্রদ্ধেয় আহমদ ছফার লেখাতেই পড়ে দেখুন।

আহমদ ছফা উপরেল্লিখিত বই এর ৬ পৃঃ লিখেছেন, “আনন্দ বাজার পত্রিকা প্রথমত আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীকে এ পুরষ্কার প্রদান করে। সংবাদ পত্রে যখন এ ঘোষনাটি দেখলাম আনন্দবাজার পত্রিকার দুঃসাহস এবং স্পর্থা দেখে বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। আনন্দবাজার একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। আর বাংলা একাডেমী আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান। একুশের শহীদদের রক্ত থেকেই বাংলা একাডেমীর জন্ম। আনন্দবাজার কি করে বাংলা একাডেমীকে পুরষ্কার দেবার মত দুঃসাহস দেখাতে পারে। বাংলাদেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মুক্তধারা যতোগুলো বই প্রকাশ করেছে আনন্দ প্রকাশনার প্রকাশিত কইয়ের সংখ্যা নিশ্চয়ই তার অধিক নয়। প্রকাশিত গ্রন্থের উৎকর্ষ অপকর্ষ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। মুক্তধারা কতৃপক্ষ যদি ভারতের জাতীয় প্রতিষ্ঠান সাহিত্য একাডেমীকে একটি পুরষ্কার দিয়ে বসে, সাহিত্য একাডেমী কি সে পুরষ্কার গ্রহণ করতে ছুটে আসবে? বাংলা একাডেমী বিনয়ের সাথে এ পুরষ্কার প্রত্যাখ্যান করেছে। এ সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হবার দু’দিন পরেই আনন্দ বাজারের নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানা গেল। আনন্দ বাজার তসলিমা নাসরিনকে সে বছরের জন্য আনন্দ পুরষ্কারের জন্য নির্বাচিত করেছে”।

এরপর ৯ পৃঃ আরও লিখেছেন, “তারপর আনন্দ বাজার পত্রিকা তসলিমাকে নিয়ে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। তাতে পশ্চিম বাংলার খ্যাতনাম বুদ্ধিজীবী শ্রী শীব নারায়ন রায়, বিলেতে অবস্থানরত বাঙালি লেখিকা শ্রীমতি কেতকী বুশারী ডাইসন প্রমুখ লিখেছেন। এ সংবাদটি শুনে আন্দ বাজারের প্রকৃত অভিসন্ধীটি বুঝতে আমার বেগ পেতে হলো না। আনন্দবাজারকে কোন কলকাতা লেখক সাহিত্যিকদের ওপর ক্রোড়পত্র প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। ভারতে কি বড় মাপের কবি সাহিত্যিকদের অভাব আছে? তাদের নিয়ে কি আনন্দবাজার এ ধরনের উলঙ্গ প্রচারণায় নেমেছে? আমি জানি না কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়ানের পর আনন্দবাজার এরকম একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন কিনা। আমি বরতে পারবো না। কারণ তখন আমার জন্ম হয় নি”।

এই হলো আপনাদের দেশ্রপমিক তসলিমা নাসরিনের অবস্থা! দেশকে নিয়ে তসলিমার ফেসবুক ষ্ট্যাটাসে প্রেম যেন উতলে পড়ে! কিন্তু দেশের বুকে লাত্থি দিতে তার এক বিন্দুও বুক কাপে না! সেই শান্তপূর্ন দেশটিকে নিয়ে আবারও হয়তো কোন নতুন ফন্দি ফিকির করতে যাচ্ছে তসলিমা নাসরিন এবং তার ভারতীয় প্রভূরা। আমরা শান্তিপ্রিয় মানুষ। আমরা কোন দাঙ্গা-হাঙ্গামা চাই না। এই দেশে সকল ধর্মের মানুষের বসবাস করবার অধিকার আছে। আর সেই সম্প্রীতিকে ভেঙ্গে দিতে বা্ডায় এরকম একটি ঘটনা ঘটিয়ে তসলিমা হয়তো আরও একটি লজ্জা লিখতে চান।