ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আমাদের কলেজের প্রিন্সিপাল স্যার ইতিহাস নিয়ে খুবই মাতামাতি করতেন। তিনি বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি সুযোগ পেলেই ইতিহাসের উপর বক্তৃতা প্রদান করতেন। যা কখনো ছিল দারুন চমকপ্রদ আবার কখনো তা ছিল খুবই বিরক্তিকর। একদিন আমাদের বাংলা শিক্ষক অসুস্থতার কারণে কলেজে না আসায় প্রিন্সিপাল স্যার নিজেই ক্লাস নিতে চলে আসলেন। তিনি বাংলা পড়ানো বাদ দিয়ে বরাবরের মত ইতিহাস নিয়ে কথা বলা শুরু করলেন। উনি সেই দিন বলেছিলেন, আমাদের দেশটি এমনকি এক দেশ, যার স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙে জড়িয়ে আছে ভয়াবহ মিথ্যা! আর এই মিথ্যা ইতিহাসেই আমরা বই পুস্তকে লিখে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মিথ্যা শিক্ষা দিচ্ছি। তেমনি একটি মিথ্যা ইতিহাস হল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। এটি কোন ষড়যন্ত্র ছিল না বরঞ্জ এটিই সত্যি ঘটনা। স্যার বললেন, তোমরা যখন নিজস্ব পাঠ্যপুস্তকের বাহিরে গিয়ে প্রকৃত ইতিহাস জানতে চাইবে তখন ঠিক খুঁজে পাবে।

স্যারের সেই দিনের কথা মনে রেখে ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে পেলাম, বাস্তবিক অর্থেই আগরতলা কোন ষড়যন্ত্র মামলা ছিল না। যার প্রমাণ বেশ কয়েকটি বইয়ে পাওয়া যায়। সেগুলোর উদ্ধৃতি তুলে ধরছি। “ ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা শহর সহ সারা দেশে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, পূর্ব পাকিস্তানকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করবার ষড়ষন্ত্রে লিপ্ত থকবার অপরাধে লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ও তাঁর কতিপয় সহচর কে গ্রেফতার করা হয়েছে। সকল জল্পনা-কল্পনা ঘটিয়ে সরকার ৬ই জানুয়ারী (১৯৬৮) এক প্রেসনোটে ঢাকাস্থ হাইকমিশনের প্রথম সচিবের যোগসাজশে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়ষন্ত্রে লিপ্ত থাকবার অপরাধে ১৮ জন সামরিক, বেসামরিক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের সংবাদ জনসম্মুখে প্রকাশ করেন। পুনঃ ১৮্ই জানুয়ারী এক সরকারী প্রেস নোটে ঘোষনা করা হয় যে,রাষ্ট্রদ্রোহী ষড়যন্ত্রে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

২১শে এপ্রিল প্রেসিডেন্ট এক অর্ডিন্যান্স জারি করে পাকিস্তান পেনাল কোডের ১২১ ক ও ১৩১ ধারায় দোষীদের বিচার করবার নিমিত্ত বিশেষ আদালত গঠনের ব্যবস্থা করেন। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার এক আদেশ বলে সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এস.এ.রহমান ইষ্ট পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারপতি মুজিবুর রহমান ও বিচারপতি মকসুদুর হাকিমের সমবায়ে বিশেষ আদালত গঠন করেন এবং অন্য এক আদেশ বলে কেন্দ্রীয় সরকার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টকে বিচারস্থল হিসেবে ঘোষণা করেন।

৬ই জুন (১৯৬৮) গেজেটে ঘোষনা করা হয়, ১৯ শে জুন ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট সিগন্যাল প্রেস প্রাঙনে বিশেষ আদালতে বিচার আরম্ভ হবে। মামলা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। পূর্বে ঘোষনা অনুযায়ী ১৯ শে জুন হতে অভিযুক্ত ৩৫ জন অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয়।

মামলার বিবরণ প্রকাশে আদালত সংবাদপত্রগুলিকে পূর্ণ স্বাধীনতা দান করে। শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা মামলার প্রধান আসামী ছিলেন। প্রখ্যাত আইনজীবি আব্দুস সালাম খান শেখ মুজিবুর রহমানের মামলা পরিচালনা করেন এবং সরকার পক্ষে পরিচালনা করেন প্রাক্তন বৈদেশিক মন্ত্রী ব্যারিষ্টার মনজুর কাদের, এ্যাডভোকেট টিএইচ খান প্রমূখ।” (সূত্রঃ জাতীয় রাজনীতি-অলি আহাদ)

আর এটা যে সত্য সে বিষয়ে প্রথমে মুখ খোলেন প্রয়াত আওয়ামী নেতা আব্দুল রাজ্জাক। তিনি বলেন, “ তিনি (শেখ মুজিবুর রহমান) ভারতের সাথে তার একটা লিংক আপ আগে থেকেই ছিল-১৯৬৬ সাল থেকে। তারা তাদের সবসরকম সাহায্য করবে। তুই ঐ ঠিকানায় দেখা করবি। তখন তিনি চিত্তরঞ্জন সুতারের সাথে দেখা করতে বললেন। সেই প্রথম ভারতের সাথে বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগ করিয়ে দেয়। তবে ১৯৬৯ সালে জেল থেকে বেরিয়ে বঙ্গবন্ধু লন্ডন যান। সেখানে সুতার ও অন্যান্য ভারতের লোক লন্ডনে তার সাথে দেখা করেন। সেখানে বঙ্গবন্ধুর সাথে ভারতের সহযোগিতার বিষয়টি চুড়ান্ত হয়।”
(সূত্রঃ আব্দুর রাজ্জাকের সাক্ষাৎকার নিয়ে সাপ্তাহিক মেঘনার প্রচ্ছদ কাহিনী, ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭)

আর আগরতলা ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শ্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ বলেন, “ ১৯৬৩ সালে আমার ভাই এমএলএ শ্রী উমেশলাল সিংহ সমভিব্যাহারে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ১০ জন ত্রিপুরার পালম জিলার খোয়াই মহকুমা দিয়ে আগরতলায় আমার আগরতলার বাংলোয় রাত ১২ টায় আগমন করেন। প্রাথমিক আলাপ আলোচনার পর আমার বাংলো বাড়ি হইতে মাইল দেড়েক দূরে ভগ্নী হেমাঙ্গিনী দেবীল বাড়িতে শেখ সাহেব আসেন। সেখানেই খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তারপর শেখ সাহেবের প্রস্তাবনুযায়ী আমি আমাদর প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওয়াহের লাল নেহেরুর সাথে দেখা করি। আমার সাথে ছিলেন শ্রী শ্রীরমণ,চীফ সেক্রেটারি। তাকে শ্রী ভান্ডারিয়ার বিদেশ সচিবের রুমে রেখে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করি। তিনি শেখ সাহেবকে ত্রিপুরায় থেকে প্রচার করতে রাজি হন নি। কারণ চীনের লড়াইয়ের পর এতো বড় ঝ৭ুকি নিতে রাজি হন নি। তাই ১৫ দিন থাকার পর তিনি (শেখ সাহেব) ত্রিপুরা ত্যাগ করেন। সোনামুড়া পশ্চিম ত্রিপুরারই এক মহকুমা কুমিল্লার সাথে সংলগ্ন। শেখ মুজিবুর রহগমনাকে সর্বপ্রকার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।” (সূত্রঃ ‘আগরতলা মামলা, মেখ মুজিব ও বাংলার বিদ্রোহ’ লেখক জনাব ফয়েজ আহমেদ)

আব্দুর রাজ্জাক আরও বলেন,“ আমরা ভারতের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছি স্বাধনিতার জন্যে অন্য কোন কারণে নয়।” (সূত্রঃ আব্দুর রাজ্জাকের সাক্ষাৎকার নিয়ে সাপ্তাহিক মেঘনার প্রচ্ছদ কাহিনী,৪ঠা ফেব্রয়ারী,১৯৮৭)

আব্দুল রাজ্জাক সাহেবের এই কথাটির সাথে আর সবার যোগ সাজেশ থাকলেও স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর ছিল না। কারণ তিনি স্বাধীনতার জন্য ভারতের সাথে যোগাযোগ করেন নি। আর তার প্রমাণ বঙ্গবন্ধুর জবানবন্দিতেই পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু জবানবন্দিতে বলেন, “ স্বাধীনতার- পূর্ব ভারতীয় ও বঙ্গীয় মুসলিমলীগের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে আার বিদ্যালয় জীবনের সূচনা হতে আমি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে সংগ্রাম করেছি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এ সংগ্রামে আমাকে আমার লেখাপড়া পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয়েছে। স্বাধীনতা লাভের পর মুসলিমলীগ জনগনের আশা আকাঙ্খার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে, এর ফলে ১৯৪৯ সালে আমরা মরহুম জনাব হোসন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামিলীগ গঠন করি। আওয়ামিলীগ পূর্বেও ছিল এবং এখনও সেইরূপ একটি নিয়মতান্ত্রিকতার পথনুসারী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদ্যমান। ১৯৬৬ সালের এপ্রিলে আমি যখন খুলনায়,একটি জনসভা করে ঢাকায় ফিরতেছিলাম,তখন তারা যশোরে আমার পথ অবরোধ করে এবং আপত্তিকর বক্তৃতা প্রদান এর অভিযোগে ঢাকা হতে প্রেরিত এক গ্রেফতারী পরোয়ানা বলে এইবারের মতো আমাকে গ্রেফতার করে।–
কেবল মাত্র আমার উপর নির্যাতন চালাবার জন্য এবং আমার দলকে লাঞ্জিত অপমানিত ও আমাদেরকে কুখ্যাত করবার জঘন্য মনোবৃত্তি নিয়ে আমাকে এই তথাকথিত ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত করা হয়েছে। আমি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামিলীগের সভাপতি। এটা একটি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। দেশের অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক,ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যার একটি সুনির্দিষ্ট,সুসংগঠিত নীতি ও কর্মসূচী রয়েছে। আমি অনিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে আস্থাশীল নই। আমি কখনো পূর্ব পাক্স্তিানকে পশ্চিম পাকিস্তান হতে বিচ্ছিন্ন করবার জন্য কোন কিছু করি নাই কিংবা কোন দিনও এই উদ্দেশ্যে কোন স্থল, নৌ বা বিমান বাহিনীর কোন কর্মসূচির সংস্পর্শে কোন ষড়যন্ত্রমূলক কার্যে আত্ন নিয়োগ করিনি। আমি নির্দোষ এবং এ ব্যাপারে পরপিূর্নভাবে অজ্ঞ।”(সূত্রঃ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানের লিখিত বিবৃতি;বিচিন্তা,২৫ শে অক্টোবর,১৯৮৭)

অতএব শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে, তিনি বাংলার স্বাধীনতা চাননি। যদিও তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্রের সঙে জড়িত ছিলেন কিন্তু তা বাংলাদেশকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্যে ছিল না।