ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

কয়েক বছর আগের কথা। রাস্তার পাশে মানুষের জটলা দেখে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম। একটি লোক আধমরা অবস্থায় ফুটপাতে পড়ে আছে, মুখ থেকে বের হওয়া ফেনা শুকিয়ে গালে লেগে আছে। নিভু নিভু চোখ যেন বন্ধ হয়ে যেতে চায়। কৌতূহলি মানুষের নানা রকম প্রশ্ন (ভাই কী হইছে, কেমনে হইছে, বাড়ি কই, ইত্যাদি), বিরবিরিয়ে একটা দুইটার উত্তর দিতে চেষ্টা করেও পারছে না লোকটি।

আমার সাথে থাকা বীরু ভাইকে (এলাকার বড় ভাই) জিজ্ঞেস করলাম কী করব? উনি বলল, তুই দেখ লোকটার পকেটে কোনও কিছু পাওয়া যায় কিনা (ফোন নম্বর/ ফোন বুক/ পরিচয় পত্র, ইত্যাদি) আর আমি থানায় একটা ফোন দেই। লোকটার পকেটে ইমিগ্রেশনের কিছু কাগজ পত্র পেলাম, নাম সেলিম। গত রাতেই কুয়েত থেকে ফিরেছে। বুঝলাম অজ্ঞান পার্টি সেলিমের লাগেজ, মোবাইল আর মানিব্যাগের সাথে ফোনবুকটাও নিয়ে গেছে। কারো সাথেই যোগাযোগ করার উপায় খুঁজে পেলাম না।

অনেকক্ষণ চেষ্টার পরও বীরু ভাই থানার কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারলো না। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। একটা রিক্সা করে আমি আর বীরু ভাই সেলিমকে নিয়ে পাশেই অবস্থিত একটি হাসপাতালে গেলাম, কিন্তু ওরা আমাদের ফিরিয়ে দিল। বলল- এই সমস্যা সমাধান করার ঔষধ তাদের কাছে নাই, তারা আমাদের অন্য আরেকটি হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিল। আমরা ছুটলাম আরেকটি হাসপাতালের উদ্দেশে কিন্তু ওরাও রোগীকে নিতে অপারগতা জানালো। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তারা জানালো এইরকম রোগী নিলে পুলিশ ঝামেলা করে। মামলা- মোকদ্দমা, এবং হয়রানির মিমাংসা রফা করতে হয় অর্থের বিনিময়ে। অতএব জেনেশুনে ঘরে বিপদ আনতে তারা রাজি হল না। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম কী করব? ওরা পরামর্শ দিল ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যেতে।

বীরু ভাই বলল এখন কী করবি? বুঝতে পারছিলাম না কী করব, কোথায় নিয়ে যাবো, নাকি নিজেরাই কোনও বিপদে পড়ব তাও বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শেষে দুইজনে সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাবো, একটা মানুষের জীবনের মূল্য অন্য অনেক কিছুর থেকে অনেক বড়।

হঠাত্‍ একজন এসে বলল, ভাই ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাবেন ভাল কথা কিন্তু ওনার আত্মীয় স্বজন খবর দিছেন? ওনাকে বললাম, ভাই ওনার নিজের পরিচয়ই খুঁজে পাইনি আর আত্মীয় কই পাব! লোকটি বলল, ভাই তাইলে তো ভেজালে পইড়া যাইবেন। ঢাকা মেডিকেলওয়ালরা আপনেগো আটকাইয়া পুলিশে খবর দিব আর আর তারপর বহুত কাহিনী। পড়ে কইবেন,
ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি। ভেজাল না কইরা ওনারে থানায় দিয়া আসেন। আমরা ঘাবড়ে গেলাম, চিন্তায়ও পড়ে গেলাম। সেলিমকে নিয়েই বা কী করব ভাবতে ভাবতে থানার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

রিক্সাওয়ালকে বললাম সেলিমকে ধরে রাখতে আর আমরা থানার ভিতরে গিয়ে দায়িত্ব প্রাপ্ত একজন কর্মকর্তাকে ঘটনাটি খুলে বললাম এবং তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে পাঠানোর অনুরোধ জানালাম। গাড়ি আসলে পাঠিয়ে দেয়া হবে, আপনার লোকটিকে রেখে চলে যান, বললেন সেই কর্মকর্তা। আমরা চলে না গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও তাদের কোন সারা পাওয়া গেল না। আমরা বিরক্ত হয়ে ভিতরে ঢুকলাম ব্যাপার কী জানার জন্য, আমাদের দেখেই সেই কর্মকর্তা ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলেন আপনারা এখনো যান নাই? আপনাদের এবার ঢাকা মেডিকেল যেতে হবে আমাদের সাথে, আপনাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার দরকার হবে। সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত দুইজন কোথাও যেতে পারবেন না।

তারপর….? সে অনেক কাহিনী….।

বুঝেছিলাম কথাটার মানে, ভিক্ষা চাই না কুত্তা ঠেকা!

শাহরিয়ান আহমেদ
২১.০৬.২০১২