ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

কী নাম এই কুকর্মের আমি জানি না। আমরা কোথায় এসে নেমেছি, মানবিকতা হার মেনেই চলেছে পাশবিকতার কাছে। মারামারি অথবা গণ পিটুনিতে নিহত হওয়ার ঘটনা এদেশে নতুন নয়। কিন্তু এ কেমন নির্যাতন যা শুনতেই গা শিউরে উঠে, লোম খাড়া হয়ে শরীরে ঝাঁকুনি লাগে! এগুলো আসলে পাশবিকতাও তো না, অন্য কিছু। এই কুকর্মের নাম আমি জানি না।

দৈনিক প্রথম আলোতে [১০-০৫-২০১২] , সিলেটে পাশবিক নির্যাতন করে যুবককে হত্যা লেখাটি পড়ে আমি আসলেই ঝাঁকুনি খেলাম। চোর সন্দেহে একটি ছেলেকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হল, তাও যদি এমন হতো যে গণ ধোলাই সেটাও না হয় বুঝতাম যে উত্তেজিত জনতা ঝোকের বসে পিটিয়েছে। ভোর আটটার দিয়ে চোর সন্দেহে ফয়েজ নামের আটাশ বছরের ছেলেটিকে আটক করে বাড়ির ছয় তলার একটি রুমে নিয়ে যায় বাড়ির মালিক আফরোজ মিয়া এবং ওই বাড়ির মেসের দুই তিন জন ভাড়াটিয়া। প্রায় তিন ঘণ্টা নির্যাতনের পর অর্ধ মৃত ছেলেটিকে বাড়ির নিচ তলায় ফেলে রাখে ওরা। খবর পেয়ে পুলিশ এসে ছেলেটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। নির্যাতনের যন্ত্রনা সইতে না পেরে কিছুক্ষণ পরেই দেহটাকে নিথর করে রুহটা বেরিয়ে যায়। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়ে থাকে অসভ্য অমানুষদের কুকীর্তির একটি জঘন্য নিদর্শন।

ফয়েজের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ” ফয়েজের ডান হাতের কনুই ও ডান পায়ের হাঁটু থেঁতলানো। দুই হাতে, বুকে, পেটে ও কোমরে খুন্তির ছ্যাঁকার একাধিক ক্ষতচিহ্ন, মলদ্বারে পোড়া ক্ষত এবং রক্তক্ষরণের চিহ্ন, মুখের ডান দিকের দাঁত ভাঙা, ডান হাতের দুটো আঙুলের নখ উপড়ানো দেখা গেছে। “

নখের মাথায় একটু আঘাত লাগলে জান বেরিয়ে যাবার মত অবস্থা হয় সেখানে একটি ছেলের দুইটি নখ তুলে ফেলা হল…। কতটা কষ্ট সে পেয়েছে আমি অনুমানও করতে পারব না। বার বার নখ উঠিয়ে ফেলার কথাটা আমার মনে পড়ছে আর মাথার ভেতরটা কামরাচ্ছে। সারা শরীরে খুন্তির ছ্যাঁকার ক্ষত। হাত পা থেঁতলানো, দাঁত ভাঙ্গা…. অত্যাচারের আর কী কোনও পদ্ধতি বাকি ছিল..? আহ! মলদ্বারে পোড়া ক্ষত এবং রক্তক্ষরণের চিহ্নের কথাটা পড়ার পর আমি আর পারলাম না। ওই ছেলেটাও তো একটা মানুষ। এটা কী ধরনের আচরণ একটা মানুষের প্রতি। এরকম ঘৃণ্য ও অমানুষিক আচরণ মেনে নেয়া যায় না, সহ্য করাও যায় না।

ফয়েজ যদি চোরই হতো তাহলে তাকে বাড়ির ষষ্ঠ তলায় একটি রুমের মধ্যে লুকিয়ে মুখে কাপড় গুজে অমানুষিক নির্যাতন করা হতো না। আমি জীবনেও শুনিনি চোরকে কেউ ঘরের ভেতর নিয়ে পিটিয়েছে, চোরকে তো মানুষ রাস্তায় এনে পেটায়। ফয়েজদের পরিবারে আর্থিক দৈন্য দশাও ছিল না, ‘ক্ল্যাসিক কালার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং’ নামে তাঁদের একটি ছাপাখানা রয়েছে। সেখানে নিয়মিত বসতেন ফয়েজ। আর কেউ সত্যি চোর হয়ে থাকে তাহলে কী তাকে মেরে ফেলতে হবে? তাও আবার এভাবে..। ছিঃ !

আমি বিচার চাই, দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি হোক অপরাধীদের। মানুষ হত্যার মত নিকৃষ্ট অপরাধ তাও আবার সর্ব নিকৃষ্ট এবং জঘন্য উপায়ে.. কঠোর এবং দৃষ্টান্ত মূলক সাজাতো হতেই হবে। দু তিনজন অসভ্য অমানুষদের কাছে আমরা পরাজিত হতে পারি না। পাশবিকতার কাছে মানবিকতার হার কী করে সইবো আমরা।

লেখক…
শাহরিয়ান আহমেদ।