ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

বেশ কিছু দিন ধরে একটা বিষয় খেয়াল করছি, আমাদের দেশে যে কোন ইশ্যুতে দুইটা পক্ষ তৈরী হয়। সেটা নিয়ে আমার কোন অভিযোগ নেই কারন পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষের স্বাধীন ভাবে চিন্তা করার  এবং তা প্রকাশ করার অধিকার আছে। কিন্তু যখন দেখি কোন অন্যায়, অসত্য এমন কি অপরাধের সাথেও কেউ শুধুমাত্র বিতর্কের জন্য আপোষ করে তখন সত্যিই হৃদয়ের গভিরটা রক্তাক্ত হয়।

একটু আগের থেকে আসি, বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে নানা অনিয়ম নিয়ে নানা মানুষের পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলতে শুনেছি। সবসময় মনে হয়েছে একেক জন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি একেক রকম, এমনটা হতেই পারে। কিন্তু যখন দেখলাম রাজাকারের বিচার চাওয়ার সময় কিছু মানুষ বলল ‘এখন বিচার করার কি দরকার? কি লাভ এই বুড়া বুড়া মানুষ গুলারে টানা হেছড়া করে? কেউ বলে তারা ইসলামিক ব্যক্তিত্ব!’ যাহোক, সেখানেও বিপক্ষ তৈরী হল। এভাবে উল্লেখ করলে অসংখ্য ঘটনা উল্লেখ করা যাবে, কিন্তু এত বিষদ ব্যাখ্যায় যেয়ে প্রবন্ধের আকার বড় করতে চাইনা। অতিসম্প্রতি যে ঘটনাটি ঘটল তা নিয়ে একটু আলোকপাত করতে চাই। ক্রিকেট বাংলাদেশের খুব প্রিয় একটি খেলা। এই খেলাটি এখন আর নিছক লেখাতে সিমাবদ্ধ নেই। ক্রিকেটকে ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের একটা আবেগের জায়গা তৈরী হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেটকে ভিশন ভালবাসে। ক্রিকেটকে ভালবাসলে খুবই স্বাভাবিক ভাবেই ক্রিকেটারদের জন্যও ভালবাসাটা তৈরী হয়।

বেশ কিছুদিন আগে থেকে বাংলাদেশে ক্রিকেট ফিক্সিং নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বিপিএল এর ম্যাচে ফিক্সিং নিয়ে আলোচনা করতে করতে বেরিয়ে আসলো আন্তর্জাতিক ম্যাচেও ফিক্সিং হয়েছে এবং তাতে আমাদের, বিশেষ করে আমার খুব প্রিয় একজন খেলয়াড় মোহাম্মদ আশরাফুল বিভিন্ন ভাবে প্রমানীত হল সে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক এবং বিপিএল ম্যাচে ফিক্সিং করেছে। যখন তার শাস্তির ব্যাপারে বিসিবি এবং আইসিসি একমত পোষন করলো  তখন আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ ব্যাপারটাকে ইতিবাচক ভাবে নিলেও কিছু মানুষ ব্যাপারটাকে আশরাফুলের সাথে অন্যায় করা হয়েছে বলে মনে করলো। তাদের কাছে কোন যৌক্তিক যুক্তি ছিলনা শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে তারা আশরাফুলের পক্ষ নিল, একটা অন্যায়, গুরুতর অপরাধকে সমর্থন করলো। ঠিক একই রকম ঘটনা দেখলাম শ্রিলংকা সিরিজে যখন সাকিব-আল হাসান ক্যামেরার সামনে বাজে অঙ্গভঙ্গী করার কারনে তিন ম্যাচ নিষিদ্ধ হল তখনও কিছু মানুষ বিসিবি’র সেই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে হাত তুললো। এখন আবার সাকিব বিসিবি’র অনুমতি না নিয়ে বিদেশে খেলতে চলে গেলো। মাঝপথে কোচের সাথে তার উতপ্ত বাক্য বিনীময়, এমনকি সে বলে বসলো যদি তার ইচ্ছে মত সবকিছু না হয় তাহলে দেশের হয়ে আর খেলবে না।  এছাড়াও সাকিবের বিভিন্ন সময়ের অখেলোয়াড়োচিত আচারনের জন্য সাকিব কে তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে এবং বিসিবি সভাপতি সাংবাদিকদের সামনে তার শাস্তির ব্যাখ্যাও দিয়েছেন কি কারনে সাকিবের এই মাত্রায় শাস্তি হয়েছে। এগুলো জানার পরেও কিছু মানুষ সাকিবের পক্ষ নিয়ে কথা বলছে, পত্রিকায় বিবৃতি দিচ্ছে, মানব বন্ধন করছে এমন কি একজন দেখলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছে “আমি আগামী ৬ মাস বাংলাদেশের কোন খেলা দেখবো না। আমার একান্ত কাম্য থাকবে এই ৬ মাস যেন বাংলাদেশ প্রত্যেকটা ম্যাচ হারে।”

কি আজব আমাদের প্রতিক্রিয়া…!!

এখানে আমাদের বোঝা দরকার সাকিবকে কেন এই শাস্তি দেওয়া হোল। সাকিব অনুমতি না  বিদেশে খেলতে গেল এজন্য সাকিবকে এই শাস্তি দেওয়া হয়নি। সাকিব কোচের সাথে তর্কের একপর্যায় দেশের হয়ে ক্রিকেট না খেলার হুমকি দিয়েছে। আমাদের অনুধাবন করা উচিৎ একজন মানুষ কি পরিমান স্বেচ্ছাচারী হলে এমন কথা বলতে পারে। ভারত সিরিজ চলাকালে ড্রেসিং রুম থেকে বের হয়ে বখাটে পেটানোর ঘটনায় তাকে জিঞ্জেস করলে সে বললো “খেলা চলাকালিন সময় ড্রেসিংরুম থেকে বের হওয়া যায়না। আমি এই নিয়ম জানিনা।” এটা কি ভাবে সম্ভব? একজন খেলয়াড় যে কিনা বিকেএসপি থেকে লেখাপড়া শেষ করে প্রায় ১০ বছর একটা টেস্ট খেলুড়ে দলের নিয়মিত সদস্য। তাছাড়া সে বিশ্বের প্রায় সকল বড় বড় লীগে খেলছে সে এই অতি সাধারন নিয়ম জানেনা। এটা কি মানা যায়।  এছাড়াও আগে-পরে’র বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে তাকে এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

আমি অবাক হয়ে যায় যখন মানুষ অন্যায় কে ন্যায় বলে মেনে নেয়। আমরা অন্যায়কে ন্যায় হিসাবে মানতে শুরু করলে কাল থেকে যদি আরও কয়েকজন ক্রিকেটার বলে প্রাকটিস করতে ভাল লাগেনা, প্রাকটিস করবো না। তাহলে আমরা কি কোরবো? আমরা আমাদের খেলয়াড়দের ভালবাসি। তাদের যে কোন সফলতায় আমরা আনন্দিত হয়। যে কোন ব্যর্থতায় আমরা ব্যাথিত হয়। কারন তারা আমাদের দেশের প্রতিনিধি। তারা আমাদের দেশকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করে। তাইবলে যদি তারা কোন অন্যায় করে তাহলেও আমরা তাদের সমর্থন করবো? সেটাতো কোন ভাবেই যৌক্তিক নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের ক্রিকেটে সাকিবের অবদান অনেক কেশি তাই আমরা সাকিবকে ভালবাসি। কিন্তু ক্রিকেটিয় নিয়ম-কানুন না মেনে চলতে থাকলে তো ক্রিকেটই থাকবেনা তখন সাকিবের অবদানই স্বীকার করার মত কোন উপলক্ষ আমরা পাবো না।

আমাদের সমাজে যখন অন্যায় হয় তখন সেটা এক পর্যায়ে থাকে কিন্তু যখন আমরা অন্যায়কে ন্যায় ভাবতে বা বিশ্বাষ করতে শুরু করি তখন যা ঘটে তা মূল্যোবোধের অবক্ষয়। আর আমাদের মানসিকতার এই নেতিবাচক পরিবর্তন যদি চলমান থাকে তাহলে সকল অনিয়মই একসময় নিয়মে পরিনত হবে। যা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার জন্য চরম হুমকি।

তাই সবার কাছে আকূল আবেদন, আমরা যেকোন অন্যায়কে অন্যায় আর ন্যায়কে ন্যায় বলার মানসিকতা তৈরী করি। অন্যায়কারী আমার বা আমাদের যতই আপন কেউ হন না কেন, আমরা অন্যায়কে অন্যায় বলার অভ্যাস করতে চাই। তাহলেই আমরা এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম একটি সুস্থ সমাজ পাবো।

 

শাহরিয়ার আরিফ

বিশেষ কেউ নই