ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

কয়েকদিন আগে লতিফ সিদ্দিকী’র বিতর্কীত বক্তেব্যের পরে সংবাদ মাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে হজ্বের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। আমার ফেইজবুক ফ্রেন্ডলিস্টে সকল মতাদর্শের মানুষ আছেন। কেউ কট্টরপন্থি মুসলিম, কেউ সাধারন মুসলিম, কেউ মৌলবাদী মুসলিম, কেউ নামধারী মুসলিম, কেউ অসাম্প্রদায়িক মুসলিম, কেউ ইসলাম বিদ্বেষী, কেউ জামাতী, কেউ হিন্দু, কেউ খৃষ্টান, কেউ বৌদ্ধ, কেউ নাস্তিক। ইদানিং কালে অনেককেই খুব গর্বভারে ফেইজবুকে স্টাটাস দিতে দেখেছি। ‘যারা আমার ফ্রেন্ডলিস্টে অমুক-অমুক গ্রুপের লোক আছেন তারা আমার ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে চলে যান, নাহলে আমি তাদের ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে বাদ দেব’ এই ধরনের আর কি। আমি কখনও এধরনের কিছু বলিনি, ভবিষ্যতেও বলবোনা, এবং যারা বলে তাদের এই ধরনের বক্তব্যকে অগ্রহনযোগ্য বলে মনে করি। কারন, আপনার যদি কোন প্রতিপক্ষ না থাকে তাহলে বিতর্ক করবেন কার সাথে। আপনার নিজের ধারনারও কোন পরিবর্তন হবেনা, আর আপনি যা ভাবছেন তা কখনও ভিন্নভাবে ভাবা কোন মানুষের মধ্যে সঞ্চার করতে পারবেন না। তাই আমি সকলকেই আমার ফ্রেন্ডলিস্টে স্বাগত জানাই শুধুমাত্র যারা খারাপ(পর্ণ) ছবি বা ভিডিও পোষ্ট করে তাদেরকে বাদে।

যেহেতু আমার ফ্রেন্ডলিষ্টটি একটি বহুমাত্রিক ও বহুজাতিক, সংগত কারনে আমি মোটামুটি সকল মতের মানুষের অনুভুতি জানতে পারি। আমার ফ্রেন্ডলিষ্টের বেশকিছু ইসলাম বিদ্বেষী লোক আছে যারা নিজেদেরকে নাস্তিক বলে প্রচার করে। আমার ধারনা তারা নাস্তিকতার সংঙ্গাই জানে না। কারন তারা চরমভাবে ইসলাম বিদ্বেষী, তাদেরকে আমি কখনো দেখিনি ইসলাম ছাড়া অন্যকোন ধর্মের কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে কথা বলতে। (তারা ইসলামের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে কথা বলে তাইবলে আমি বলছিনা যে, তারা যেগুলো বলে সেগুলো আসলে ইসলামের ত্রুটি-বিচ্যুতি। বরং আমি দৃহঃ ভাবে বিশ্বাষ করি, ইসলাম হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান।) তারা সবসময় ইসলামের বিপক্ষে কথা বলে। অথছ পৃথিবিতে প্রচুর তথাকথিত ধর্ম আছে যেগুলো আপাত দৃষ্টিতেই বোঝা যায় যে, সেগুলো কতটা খামখেয়ালীপনায় পরিপূর্ণ। এইসব ইসলাম বিদ্বেশীরা কখনোই ইসলাম বাদে অন্যকোন ধর্ম নিয়ে আলোচনায় যায়না। আর সম্প্রতি লতিফ সিদ্দিকী’র হজ্বের বিপক্ষে বক্তব্য প্রদানের সাথে সাথে মোটামুটি তারা ইসলামের বিপক্ষে কথা বলার মত দারুন মুখোরোচক একটা ইস্যু পেয়েছে। যারা হজ্বের বিপক্ষে কথা বলছে তাদের প্রধান এবং একমাত্র যুক্তি হচ্ছে, বাংলাদেশের মত দেশে যেখানে প্রায় ৪০% মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে সে দেশের মানুষের এতগুলো টাকা খরচ করে হজ্বে যাওয়ার দরকার কি? বরং তারা তাদের টাকাগুলো দেশের মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিলে এদেশের মানুষ উপকৃত হবে।

এখন তাদের খোড়া যুক্তিগুলোর খন্ডনপূর্বক আলোচনা করা যাকঃ

প্রথমত, ইসলাম শুধুমাত্র বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়, ইসলাম সারা বিশ্বের সকল মানুষের জন্য। তাই কেউ যদি শুধুমাত্র বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামকে বিবেচনা করে তাহলো তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে।

 

দ্বিতীয়ত, যারা হজ্বের বিপক্ষে কথা বলছেন, তারা হজ্ব আসলে কি সেটা জানেন কিনা সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে তাই এ বিষয়ে একটু বলতে চাই, ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের(১. কলেমা, ২. নামাজ, ৩. রোজা, ৪. জাকাত, ৫. হজ্ব) একটি হলো হজ্ব।  আপনারা(হজ্বের বিরুদ্ধে অবস্থারকারী ইসলাম বিদ্বেষী)  যে কথা বলে মানবতার দ্বার উন্মোচোন করার জন্য উথাল-পাতাল করছেন তা হলো হজ্বের টাকা দিয়ে মানুষের সেবা করার জন্য। কিন্তু ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ(৫টির মধ্যে ১টি) স্তম্ভ হচ্ছে যাকাত। যেখানে ৮টি খাতে(১.ফকির, ২. মিসকিন, ৩. যাকাত আদায়ে নিযুক্ত কর্মী, ৪. অমুসলিম, ৫. ক্রীতদাস (মুক্তির জন্য), ৬. র্্নগ্রস্থ, ৭. প্রবাসী(ইসলামের জন্য), ৮. মুসাফির(যারা ইসলাম প্রচারের জন্য এক স্থান থেকে অন্যত্র ঘুরে বেড়ায়)(পবিত্র আল-কুরআন-এর সূরা-ত্বাওবাহ, আয়াত-৬০)) মানুষকে যাকাত দিতে বলা হয়েছে।

এছাড়াও ইসলামে প্রতিবেশীদের প্রতি স্বদাচানর ও তাদের দুঃখ-কষ্টের সাথী(ভাগীদার) হতে বলা হয়েছে।

তৃতীয়ত, হজ্ব সবার জন্য ফরজ(অত্যাবশ্যকীয় করনীয় অর্থাৎ যা অবশ্যই পালন করতে হবে) নয়। এখানে উল্লেখ্য ইসলামে পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে দুটি(যাকাত এবং হজ্ব) সর্তসাপেক্ষ পালনীয় অর্থাৎ যাদের সামর্থ আছে শুধুমাত্র তাদের জন্য ফরজ।

চতুর্থত, অনেককেই দেখলাম কুরবানীর পশু জবাই করার ব্যাপারটাকে খুব নাটকীয় কায়দায় বর্ণানা করছেন। তাদের ভাষায় ‘পশুটাকে এইভাবে ধরে, ঐভাবে ফেলে, সেইভাবে হত্যা করলো। আহা…রে কি নিষ্ঠুরতা’ । আজকের এই একবিংশ শতাব্দিতে এসে পশুদের জন্য এধরনের পোষাকী প্রীত ‍দেখে মেজাজটা এমন খারাপ হয় যা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মত ভাষাজ্ঞান সৃষ্টিকর্তা আমাকে দেননি। যেখানে সারা বিশ্বে প্রতিদিন কয়েক কোটি পশু-প্রাণী জবাই বা হত্যা করা হচ্ছে শুধুমাত্র মানুষের খাবার তৈরী করার জন্য, সেখানে কুরবাণীর মত একটা অত্যাবশ্যকীয় করনীয়’র ক্ষেত্রে তাদের পেছনে কৃমির উৎপাত। মাঝখানে একদিন দেখলাম ভারতে কিছু পশুপ্রেমী লোক ঈদুল-আযহা’তে কুরবানী না করার জন্য রাস্তায় নেমে মিছিল করছে। কোই তারাতো অন্য কোন সময় পশুহত্যার বিরুদ্ধে কোন কথা বলেনি। তাহলে এখন তাদের সমস্যা কোথায়..?

আর যাদের পশুদের প্রতি এতই মায়া তারা কি সবাই এতটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারছেন যে, আপনারা কোন প্রকার পশু-প্রাণী ভক্ষণ করছেননা এবং ভবিষ্যতেও করবেননা। যদিও কেউ কারো সাথে চ্যালেঞ্জ করে পশু-প্রাণী ভক্ষণ করা বন্ধ করে দেন এবং একটা সময় ‍যদি আপনার দলে পৃথিবির সব লোক চলে আসে তাহলে হয়ত আর পশু-প্রাণী হত্যা করার দরকার হবেনা, কিন্তু শাক-সবজী যে খাবেন; যারা বৃক্ষ প্রেমী তারাও যদি আপনাদের মত প্রেম দেখায় তাহলে তো না খেয়ে সুখনা প্রীতের ছেকায় আপনার অবস্থা করুনতর হয়ে যাবে। এমনকি আপনার সৎকার করার ব্যবস্থাও করা যাবে না, কারন সে কাজেও তো কিছু না কিছু ধংশ করতে হবে!

 

উপরোক্ত বিষয়গুলোর বাইরে হজ্বের বিরুদ্ধে যদি কারও কোন যুক্তি থাকে তাহলে তাকে উদত্ব আহ্বান জানাচ্ছি, আপনি আমার লেখার নিচে মন্তব্য করতে পারেন। আপনি আপনার মন্ত্যের উত্তর দেব ইনশাআল্লাহ। আর যদি কেউ সরাসরি আমার সাথে চ্যাট করতে চান তাহলেও আপনাকে স্বাগতম। আপনার প্রত্যেকটি যুক্তি খন্ডাইয়া অনু থেকে পরামানুতে পৌছায়ে দেব ইনশাআল্লাহ। ‍

আমি জন্মসূত্রে একজন মুসলিম, যদিও বাস্তব জীবনে ইসলামের সকল আইন-কনূন আমি মেনে চলতে পারিনা। তার জন্য আমি অনুতপ্ত এবং প্রত্যাশা করি একসময় হয়ত আমার ধর্মের সকল নিয়ম-কানুন আমি মেনে চলতে পারবো। আমি ইসলাম ধর্মে শতভাগ বিশ্বাষ করি শুধুমাত্র সে জন্য নয়, একজন নিরপেক্ষ মানুষ হিসাবে আজকের বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করতে চেষ্টা করলাম।

এখন যারা হজ্বের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তাদের উদ্দেষ্যে বলছিঃ

যারা হজ্ব করতে যাচ্ছে তাদের বিপক্ষে তোমাদের ব্যপক অভিযোগ, কিন্তু তোমাদের কাছে আমার প্রশ্ন তুমি মামু তোমার পাশের বাড়ীর খবর কি কখনো নাও? যারা হজ্বে যাচ্ছে তাদের অর্থ-সম্পদ ব্যয় নিয়ে তোমাদের ব্যাপক মাথাব্যাথা। আর তোমরা যখন কাচা টাকা খরচ করে বিয়ার-মদ পান কর, কেসিনোতে যেয়ে উড়াও তখন তোমাদের বাড়ীর পাশের লোকগুলো খেয়েছে কিনা সে খবর কাকে দিয়ে আনাও? তোমাদেরকে আরও অনেক খারাপ ভাবে বলা যায়, কিন্তু এরচেয়ে ভালভাবে বলতে বলতে পারলামনা।

এখন শুধু একটা কথাই বলতে চায় আর তা হলো কারও বিপক্ষে যাওয়ার আগে নিজের পক্ষে যৌক্তিক যুক্তি খুজে বের করুন। কিছু বিপথগামী মানুষের অপকর্মের জন্য একটি বিশাল জনগোষ্ঠিকে খারাপ ভাবে ভাবার মত বোকামি করা থেকে বিরত থাকুন।

হয়ত আমার এই লেখাটি পড়ে প্রশ্ন করবেন যারা অবৈধ টাকা উপার্যন করে হজ্বে যাচ্ছে, তাদের ব্যাপারে আমি কিছুই লিখলামনা কেন? আজকের লেখাতে হজ্বের পক্ষেই লিখলাম। কার হজ্ব কবুল হবে, কারটা হবেনা সে বিচার করার দ্বায়িত্ব যিনি নিয়েছেন তিনিই করবেন।