ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

জীবন আমাদের ভিষন প্রিয় একটা শব্দ আর জীবনের সাথে ওতপ্রত ভাবে জড়িয়ে আছে মৃত্যু। মৃত্যু শব্দটা খুব পরিচিত হলেও বেশ অপ্রিয় আর সেকারনেই বোধহয় মৃত্যু শব্দটার গভিরতা আমরা খুব কম সময়ই উপলব্ধি করতে পারি। প্রায় ২৬ বছরের জীবনে হয়ত ২৬ হাজারবার মৃত্যু শব্দটা বলেছি বা শুনেছি, কিন্তু মৃত্যুর ভয়াবহতা কতটা নির্মম তা কখনই অনুধাবন করতে পেরেছি বলে এখন মনে হয়না।

বাংলাদেশে জন্ম তাই হয়ত মৃত্যু শব্দটার সন্মুখীন একটু বেশিই হতে হয়। প্রতিদিন পত্রিকা খুললে বা টিভি সংবাদ দেখলেই একাধিক অপমৃত্যুর খবর আমরা জানতে পারি। বেশি হৃদয়বিদারক ঘটনা হলে হয়ত একটু হা-হুতাশ করি, কিন্তু সত্যিই কি মৃত্যুর অপূণর্তাকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি? আমার মনে হয় তা পারিনা। অন্য সবার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারছিনা তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে জানতে চাইলে, আমার বিনম্র উত্তর, আমি হয়ত মৃত্যু শব্দটার অপূণর্তার বিশালতাকে কিছুদিন আগেও অনুধাবন করতে পারিনি।

এই সামান্য প্রসস্তের জীবনে খুব আপন বলতে দাদাকে মারা যেতে দেখেছি, তখন আমার বয়স ছিল ১১। দাদা’র ১০ টা সন্তানের আহাযারী-আতর্নাদ দেখেছি, নিজেও কেদেঁছি, কিন্তু দাদা’র মৃত্যু আমাকে মৃত্যুর তাৎপর্ উপলব্ধিতে শতভাগ সহায়তা করেনি। আব্বা-চাচা-ফুফুদের আহাযারী-আতর্নাদ, গগনবিদারী চিৎকার, কিছুক্ষন পরপর মুর্া যাওয়া দেখে অনেক কষ্ট অনুভব করলেও দাদা’র চলেযাওয়ার শূণ্যতার বিশালতা পরিমাপ করবার মত মানষিক উচাচতায় তখনও আমি পৌছায়নি। দাদি আমার জন্মের অনেক আগেই মারা যাওয়ার কারনে সে ব্যাপারে কোন ধারনা নেই আর নানা মারা গিয়েছেন মায়ের বিয়েরও আগে। খুব আপনের মধ্যে সম্প্রতি হারিয়েছি মেঝ ফুফুকে, অনেক বছর ধরে অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলেন তাই বলেই হয়ত ফুফুর মৃত্যু অপ্রত্যাশিত ছিলনা, আর দেশের বাইরে থাকবার কারনে হয়ত ফুফুর মৃত্যুও আমার কাছে মৃত্যু শব্দটার তীব্রতা উপলব্ধি করবার জন্য যথেষ্ঠ ছিলনা।

কিন্তু এখন আমি মৃ্ত্যুকে বুঝি। অনেক ভাল করেই বুঝি, শুধু বুঝিইনা উপলব্ধিও করতে পারি মৃত্যু কতটা ভয়াবহ হতে পারে, কতটা নির্মম হতে পারে, কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, কতটা যন্ত্রনার হতে পারে, কতটা কষ্টের হতে পারে। বুঝি বলেই নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন করতে ইচ্ছা হয়, মৃত্যু কেন এমন হয়? একবার মারা গেলে সে আর কখনও ফিরে আসবেনা, কখনই না, কখখনই না।

বাংলাদেশ সময় জুন ৫, ২০১৫ রাত দুইটার পরে মায়ের ফোন! কথার শুরুতে জানতে চাইলাম কি ব্যাপার মা এত রাতে ফোন করেছ? মা বললো, ঘুম আসছেনা, তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা হল তাই ফোন করলাম। ১৫-২০ মিনিট কথা হলো, শেষ কথা বললাম মা এখন অনেক রাত হয়েছে ঘুমাও নাহলে শরীর খারাপ করবে। আর মা বলল তুমিও গোসল করে খেয়ে বিশ্রাম নাও।

মাত্র ৬ ঘন্টা পরে বাংলাদেশ সময় সকাল ৮:৩০ এর দিকে মা ব্রেইন স্ট্রোক করলো, প্রথমে সাতক্ষীরা হাসপাতাল পরে খুলনাতে নেওয়া হলো। মাঝখানে আমাকে জানানো হলো মা অসুস্থ, এখন হাসপাতালে, তখন নিউ ইয়র্ সময় রাত ১২ টা। কেবলমাত্র এশার নামাজ শেষ করে জায়নামাজের পাটিটা ভাজ করে টেবিলের উপর রেখে বিছানায় শুয়েছি, ফোনটা হাতে নিতেই দেখি বড়ভায়ের ফোন। ফোনব্যাক করেই শুনতে হল আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সংবাদটি। মা তখনও বেচে আছেন, সাতক্ষীরা থেকে খুলনা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ভাইজান যখন আমাকে মায়ের অসুস্থতার কথা বলছিলেন তখন ওর কান্নাভেজা কন্ঠই আমাকে অনেকবেশি অস্থির করে তুলেছিল। আমার কিছু করবার ছিলনা, কিন্তু কিছুই কি করতে পারবোনা? বিছানা ছেড়ে আবার জায়নামাজের পাটিটি বিছিয়ে শেজদায় গেলাম। জীবনে ছোট-বড় অনেক কিছুই আল্লাহর কাছে চেয়েছি, কিন্তু আমার জীবনে এতটা তীব্রভাবে কখনও কিছু চাইনি। কাঁদতে চাইনি, কিন্তু বুকের ভেতর আগ্নেগীরীর অগ্নীকুন্ডের ন্যায় কান্নাও কুন্ডলী পাকিয়ে বেরিয়ে আসছিল। মা তখনও আমাদের মাঝে আছেন। আল্লাহর কাছে একটাই প্রাথর্না, আল্লাহ একটাবার মা’র সাথে কথা বলবার সুযোগ দাও, মা’র একটাই ইচ্ছা ছিল তা পুরন করবার সুযোগ দাও, কিন্তু বিধাতার হাতে সময়ের এতটাই অভাব যে, মায়ের ইচ্ছা পুরন, মায়ের কাছথেকে মাফ চাওয়া তো দূরের কথা জীবিত মায়ের মূখটাও একবার দেখবার সুযোগ ‍দিলেননা। বাংলাদেশ সময় জুন ৬, ২০১৫ ভোর ৩:৩০ এর দিকে মা মারা গেলেন। আমি তখন নিউ ইয়র্ এয়ারপোর্রদিকে বাংলাদেশের প্লেন ধরবার জন্য দৌড়াচ্ছি। একমাত্র বড়ভাই আর মায়ের পেটের না হলেও আপন ছোটভাই শিমুল, ওরা আমাকে বলছিল অবস্থার উন্নতি হচ্ছেনা, কিন্তু বেচে আছেন। মিথ্যা বলছিল, হয়ত ওদের জায়গায় আমি থাকলে আমিও মিথ্যাই বলতাম। প্রায় ২৪ ঘন্টার প্লেনজার্রপর মাতৃভুমিকে স্পর্ করতে পারলেও মাকে হারিয়ে ফেললাম চিরতরে। প্রায় ৩০ ঘন্টা শুধু আমার জন্য অপেক্ষা! আমার মাকে বাড়ীর উঠানে শুইয়ে রাখা হয়েছে। মা’র একমাত্র ইচ্ছা ছিল হজ্ব করবার, যে ইচ্ছা আমি পুরন করতে পারিনি। ২/৩ বছর আঘে নানি হজ্বকরে ফিরে এসেছেন। যারা হজ্ব করে ফিরে আসেন ওনারা নিজেদের কাফনের জন্য একটা করে কাপড় আনেন, নানি নিজের জন্য যে কাপড়টি এনেছিলেন সেটি দিয়েই মাকে মোড়ানো হয়েছে। মায়ের নিথর-নিঃস্তব্ধ শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছিত দীঘর্কাল, কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই শুনতে পেলাম আস-পাস থেকে বলতে শুরু করলো এবার চল ধীরে ধীরে ওনাকে নেওয়া যাক। আমার মাকে এখন দাফন করতে হবে। আর কখনই মাকে দেখতে পাবোনা। মা আর কোনদিন আসবেনা। কিছুই রান্না করবেনা। কোন পিঠা বানাবেনা। সবসময় ভাল-ভাল কাজ করতে বলবেনা। সারা জীবন সৎ থেকে মানুষের উপকারে তাদের পাশে দাড়াতে বলবেনা। মা আর কোনদিন আমাকে বকবেনা। মা আর কখনই আসবেনা, কখনই না। এটা কিভাবে সম্ভব? মা কখনই আসবেনা। ভাইজান-আফা-আব্বা-নানি-মামা-খালা-চাচা-ফুফু, আত্নীয়-সজন সবাই হাউমাউ করে কাঁদছে। আমি মায়ের মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছি, কাঁদতেও পারছিনা, কিছু বলতেও পারছিনা। মনেহচ্ছে শরীরের সকল অঙ্গ-প্রতঙ্গ নিস্তেজ হয়ে আসছে, হৃদয়স্পন্দন থেমে ‍যাচ্ছে। কেউ কেউ আমাকে বলছে তুমি কিছু বল, একটু কাঁদো। কিন্তু আমি কি বলবো? নিজের শরীর থেকে ১৮ বার মুমুর্ রুগীর জরুরী প্রয়োজনে রক্ত দিয়েছি, মায়ের উপদেশ আর নিদের্শনা অনুযায়ী সব সময় চেষ্টা করেছি মানুষের বিপদে পাশে দাড়াতে, সামর্ানুযায়ী সর্চ্চ সহযোগীতা করতে। আর সেই হতভাগ্য আমি আমার মায়ের জন্য কিছুই করতে পারলামনা, কিচ্ছুনা। আমার মত হতভাগার আর কিবা বলবার থাকতে পারে? কাঁদতেও পারছিনা। একমাত্র বোনটা আমার ছোটবেলা থেকেই সীমাহীন আদর-যত্নে বড় হয়েছে, যা বাঁঈনা করেছে তাই পুরন করতে হয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে ও একেবারেই দুর্ল হয়ে পড়েছে। শক্ত-সামর্ কম আবেগসম্পন্ন বড়ভায়ের হাতের উপর মৃত মায়ের নিথর দেহ অথছ আমাকে মিথ্যে শান্তনা দিয়েছে, তিনবার স্ট্রোক করার পর মাত্র ২মাস আগে আব্বা’র হার্ ২টা রিং লাগানো হয়েছে, আমি কাঁদলে ওদের বাচাবো কি করে? আর আমিতো আমার মায়ের বুঝমান ছেলে আমিকি হাউমাউ করে কাঁদতে পারি? মনেহচ্ছে বুকের ভেতরের লাল রক্তকনিকাগুলো যন্ত্রনার তীব্রতায় আড়ষ্ট হয়ে নীল অতিক্রম করে কালো হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমিতো হাউমাউ করে কাঁদতে পারিনা! আমার মা তো আমাকে সবাইকে শান্তনা দেবার জন্য রেখে গেছেন। ওমা? আমি তো তোমার ছোট ছেলে, আমাকে কেন এতটা বুঝতে হবে? আমি কেন হাউমাউ করে, চিৎকার করে কাঁদতে পারিনা? আমাকেই কেন সবাইকে শান্তনা দিতে হবে? আর তুমিওতো এখন আমাকে কোন আদেশ-নিশেধ বা নির্শ দিচ্ছোনা। আমি তো তোমার ছোট ছেলে মা! আর কতটা কষ্ট আমার এই ছোট্ট বুকের মধ্যে জমা করে রাখবো? কষ্টগুলো বারুদের মত দাউদাউ করে কোন শব্দছাড়াই শুধু জ্বলছে, আর তা নেভানোর জন্য আমার কাছে কিছুই অবশিষ্ট নেই মা। আমার কষ্টের কথা তো কারো সাথেই বলতে পারিনা। সবার কষ্টের সময় আমাকেই তাদের পাশে থাকতে হয়, এখনতো তুমিও নেই, এখন আমার কেউ নেই। আমার যন্ত্রনা শুধু আমাকেই জ্বালাচ্ছে। ওমা? তুমিকি আর কখনই কিছু বলবেনা? বাস্তবে না পারলেও স্বপ্নে তো আসতে পারো। আমি কি তোমার এতই দুর্াগা ছেলে যে, তুমি একবার স্বপ্নেও আসবেনা!

এটা কি করে সম্ভব? আমার মা নেই! আমার মা মারা গেছেন, আমার মা আর কখনই আমার সাথে কথা বলবেনা। আমার মা আমাকে নামাজ পড়তে বলবেনা, ভাল মানুষ হতে বলবেনা। আমার মা আমাকে সৎ থাকতে বলবেনা। আমার মা আমাকে বকবেনা। মায়ের কোলে আর কখনই মাথা রেখে শুতে পারবোনা। আমার মাকে আমি হজ্ব করাতে পারবোনা। আমার মা আর একবারের জন্যও আসবেনা। কেন আসবে না?

শুধু প্রশ্ন কেন বলব?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে মাঝে মাঝে মনে হয় গোটা পৃথিবিটাকে ভেঙ্গেচূড়ে চুরমার করেফেলি তারপরও কাংঙ্খিত উত্তরটা আমার দরকার, কিন্তু না, এই প্রশ্নের উত্তর বিধাতাও কোনদিন দিবেননা। উত্তর একটাই, মা আসবেনা, কখনই আসবেনা। এই না আসার নামই মৃত্যু। আমি এখন খুব ভালকরেই বুঝি মৃত্যু নামক শব্দটার ভয়াবহতা আর না আসার যন্ত্রনা।

মা তুমি স্বপ্নে হলেও এসো, কিছু বল আমাকে…