ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

আমাদের বাসার গেটের সাথেই নারিকেল গাছটা ছিল। বিরাট লম্বা, ৩০/৪০ মিটার হবে। আর ডাবগুলো হতো একেকটা বিশাল আকারের। মাঝে মাঝে কোনরকম কারণ ছাড়াই কচি ডাব গাছ থেকে খসে পড়ত ধপ্ করে একেবারে রাস্তার উপরে। মানুষের গায়ে যে কখনো পড়েনি সেটাই ভাগ্য। আমি গাছটা কেটে ফেললাম। অনেক কষ্ট লেগেছে। ওর বেড়ে উঠা আর আমার বেড়ে উঠা একসাথেই। আমি থাকব কিন্তু ও থাকবে না- এটা মানা সত্যি কষ্টকর ছিল আমার জন্য।  কিন্তু আমি আমার আবেগের কারণে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারি না। মানুষের জীবনের চেয়ে দামী তো আর কিছুই হতে পারে না।

আশির দশকে মালয়েশিয়া থেকে প্রচুর ছেলে-মেয়ে এদেশে পড়তে আসত। আনুমান করা কষ্টকর নয়, তখনকার মালয়েশিয়ার অবকাঠামো বাংলাদেশ থেকে খারাপ ছিল। মাহাথির মুহাম্মদ প্রধানমন্ত্রী হয়ে এদিকটাই ব্যাপকভাবে নজর দেন। মালয়েশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষকরে ক্রান্তীয় বনভূমির দেশ। শত শত বছর ধরে এই বনভূমি গড়ে উঠেছে। বৈশ্বিক পরিবেশের উপর এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। উনি একে একে এই বনের গাছ কেটে বিদেশে কাঠ রপ্তানি করতে লাগলেন। এভাবে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা জোগাড় করতে থাকেন। ইংল্যান্ডের এক প্রাইমারী স্কুলের ছাত্র প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরের কাছে চিঠি লিখে এহেন গাছ কর্তন বন্ধ করতে আনুরোধ করে। মাহাথির তার চিঠির উত্তর দেন। তিনি লিখেন, তোমাকে দিয়ে যারা এই চিঠি লেখাচ্ছে তাদেরকে বলো আমার দেশের অনেক মানুষ এখনও না খেয়ে থাকে, থাকার জায়গা নেই। ওদেরকে খাবার দিক, বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিক, আমি আর গাছ কাটব না।

আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়য়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। কিছুদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের এক স্যারের বাসায় ছিলাম। বাসাটা রাজশাহী- নাটোর মহাসড়কের পাশে। আমরা ২ তলায় থাকতাম। এখন যেমন যশোর বেনাপোল রাস্তার ২ পাশে বড় বড় মেহগনি গাছ দেখা যায়, একই রকম ছিল তখন ওই রাস্তা। আমাদের বাসার সাথেই ছিল একটা গাছ। অনেক বছর বয়স হয়েছে বুঝাই যায়, বিশাল মহীরুহ। একদিন এই মেহগনি গাছের একটা ডাল ভেঙ্গে পড়ল রাস্তায় চলমান প্রাইভেট কারের উপরে। দুই জন স্পট ডেড। বিশালদেহী এই গাছের একটা ডালই প্রমাণ সাইজ গাছের সমান। ওটার নিচে পড়লে কোন গাড়ি আস্ত থাকার কথা না। এর কিছুদিন পরে এই রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ শুরু হলে এই গাছগুলো কেটে ফেলা হয়। অনেকগুলো গাছ ছিল, কালের সাক্ষী একেকটা। আমার কেবলই আফসোস হচ্ছিল, যদি আর কিছুদিন আগে গাছগুলো কাটা হতো তবে দুইটা জীবন বেঁচে যেত।

BENAPOLE-Jessore-Kolkata

যশোর-বেনাপোল রোডের গাছগুলোর জন্য মায়া লাগা স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে হাত জোড় করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভিক্ষা চাওয়া, এতখানি আবেগ দেখানো মনে হয় বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। ফেসবুকে দেখলাম কে যেন তাই করবেন বলেছেন। বাঙালি আবেগপ্রবণ জাতি, কি আর করা।

আলেন গিন্সবার্গ ১৯৭১ সনে “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” লিখেছিলেন। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সে সময় তার সাথে ছিলেন। হয়ত তিনি এইসব মেহগনি গাছের কোনটার নিচে বসেই লিখেছিলেন তার সাড়া জাগানো কবিতা। তাঁর হৃদয়ে আলোড়ন কিন্তু তুলেছিল মানুষই। মানুষের দুর্দশা, মানুষের প্রতি মানুষের পাশবিকতা, নিষ্ঠুরতা।

সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।